একটি কন্যাশিশু যে ঘরে জন্ম নেয়, সেই ঘরটিতেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। তার হাসি, কান্না সেই ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকে। তারপর একদিন বিয়ের সাজ সেজে প্রিয় ঘরটি ছেড়ে বিদায় নেয়। সবাই বলে, ‘এখন থেকে ওই বাড়িই তোমার ঘর।’ মেয়েটিও তা বিশ্বাস করে। নিজের সবটুকু দিয়ে নতুন সংসারকে আপন করে নেয়।
দেয়ালের রঙে, রান্নাঘরের গন্ধে, সন্তানের হাসিতে, স্বামীর স্বপ্নে—নিঃশব্দে নিজেকে মিশিয়ে দেয়। সে শুধু একটি বাড়িতে থাকে না, একটি ঘর গড়ে তোলে।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে যদি সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন প্রথম প্রশ্নই ওঠে—এবার কোথায় যাবে?
যে ঘরকে নিজের ভেবেছিল, সেটি আর তার থাকে না। আবার বাবার বাড়িতে ফিরে এলেও সেই ঘরটিও আগের মতো থাকে না। সেখানে ভালোবাসা থাকে, কিন্তু আগের সেই নির্ভার অধিকারটি অনেক সময় আর থাকে না। মেয়েটি যেন দুই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ মানুষ।
বিচ্ছেদ নারী-পুরুষ—উভয়ের জীবনেই কষ্ট বয়ে আনে। কিন্তু বাস্তবতায় বহু সমাজে পুরুষকে নিজের ঠিকানা বদলাতে হয় না। অথচ একজন নারীকে নতুন করে গড়ে তুলতে হয় তার জীবন, পরিচয়, নিরাপত্তা—সবকিছু। তাই অনেক নারীর কাছে বিচ্ছেদ শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, বরং আবারও একটি ঘর হারানোর গল্প।
তবে এই গল্পের শেষটা হাহাকারের হওয়া উচিত নয়। একজন নারীর পরিচয় কোনো একটি বাড়ির চার দেয়ালে আটকে থাকতে পারে না। তাঁর সাহস, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতাই একসময় তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।
কারণ, সত্যিকারের ঘর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়। সত্যিকারের ঘর হলো সেই জায়গা, যেখানে একজন মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, নিরাপদে স্বপ্ন দেখতে পারে, আর নিজের পরিচয় হারাতে হয় না।
তাই প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে কোনো নারীকে আর বলতে না হয়—
‘আমি আবার ঘরহারা হলাম।’
*ইসরাত জাহান ইনা
ঢাকা/আরএস