এসএমই–কে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে আনা: নীতিগত সংস্কার ও এফবিসিসিআইয়ের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া সম্ভাবনা অপূর্ণই থাকবে

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এসএমই–কে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে আনা: নীতিগত সংস্কার ও এফবিসিসিআইয়ের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া সম্ভাবনা অপূর্ণই থাকবে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাত একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে এই খাত থেকে এবং দেশের বৃহৎ কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবুও বাস্তবতা হলোবাংলাদেশের অধিকাংশ এসএমই এখনো গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের মূলধারায় যুক্ত হতে পারেনি। এই সীমাবদ্ধতার মূল কারণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার অভাব নয়; বরং একটি সমন্বিত, বাস্তবমুখী ও এসএমই-বান্ধব নীতিগত কাঠামোর ঘাটতি।


প্রথম ও সবচেয়ে বড় বাধা হলো কমপ্লায়েন্স ও সার্টিফিকেশনএ প্রবেশাধিকার। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য আইএসও, হ্যাসাপ, বিসিএসআই, সেডেক্সএর মতো মান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত সার্টিফিকেশন অপরিহার্য। কিন্তু অধিকাংশ এসএমই উদ্যোক্তা জানেন নাকোন সার্টিফিকেশন তাদের জন্য প্রযোজ্য, কোথায় আবেদন করতে হবে কিংবা কীভাবে কম খরচে তা অর্জন করা সম্ভব। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর কোনো ওয়ান-স্টপ কমপ্লায়েন্স সাপোর্ট ডেস্ক না থাকায় উদ্যোক্তারা পরামর্শদাতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা অনেক সময় ব্যয়বহুল ও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।

 

দ্বিতীয়ত, এক্সপোর্ট প্রসেস ও কাস্টমস সিস্টেমের জটিলতা এসএমইদের জন্য বড় প্রতিবন্ধক। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো আলাদা লিগ্যাল বা এক্সপোর্ট টিম এসএমইদের নেই। অথচ একই নিয়ম, একই ডকুমেন্টেশন এবং একই সময়সীমা তাদেরও মানতে হয়। নীতিগতভাবে এসএমইদের জন্য একটি সিমপ্লিফায়েড এক্সপোর্ট রেজিম, ফাস্ট-ট্র্যাক ক্লিয়ারেন্স এবং বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

 

তৃতীয় বড় সমস্যা হলো ফাইন্যান্সিং ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে যুক্ত হতে হলে কাঁচামাল সংগ্রহ, মান উন্নয়ন, প্যাকেজিং ও লজিস্টিকসে আগাম বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকিং খাত এখনো এসএমইকে হাই রিস্ক হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে স্বল্পসুদে ঋণ বা পর্যাপ্ত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি কার্যকর এক্সপোর্ট-অরিয়েন্টেড এসএমই ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম, যেখানে সরকার ঝুঁকির অংশীদার হবে এবং ব্যাংকগুলো এসএমইকে ঋণ দিতে উৎসাহ পাবে।

 

চতুর্থত, মার্কেট অ্যাকসেস ও বায়ার কানেক্টিভিটির ঘাটতি। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও দেশীয় এসএমইদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির মতো কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম এখনো নেই। ট্রেড ফেয়ার অংশগ্রহণ ব্যয়বহুল ও শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা ও গ্রামীণ উদ্যোক্তারা সেখানে পৌঁছাতে পারেন না। প্রয়োজন একটি ডিজিটাল বিটুবি প্ল্যাটফর্ম, সেক্টরভিত্তিক ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট এবং বিদেশি বায়ার মিশনের সঙ্গে এসএমইদের সরাসরি সংযোগ।

 

এই প্রেক্ষাপটে এফবিসিসিআইএর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে এফবিসিসিআই চাইলে এসএমইকে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে যুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। এফবিসিসিআইয়ের অধীনে একটি এসএমই গ্লোবাল রেডিনেস সেল গঠন করে কমপ্লায়েন্স, সার্টিফিকেশন ও এক্সপোর্ট প্রসেসে হাতে-কলমে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চেম্বার ও বিদেশি ট্রেড বডির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বায়ারসেলার ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম চালু করা সম্ভব।

 

এ ছাড়া সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এসএমই-বান্ধব নীতি সংস্কারের পক্ষে জোরালো অ্যাডভোকেসি, ব্যাংকিং খাতে গ্যারান্টি স্কিম বাস্তবায়নে মধ্যস্থতা এবং আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ারে এসএমইদের জন্য বিশেষ কোটাভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এফবিসিসিআইয়ের বাস্তব করণীয় হতে পারে। জেলা ও আঞ্চলিক চেম্বারের মাধ্যমে ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই উন্নয়ন কার্যক্রমও সংগঠনটির নেতৃত্বে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাইন্ডসেট ও নীতির সমন্বয়। এসএমইকে কেবল দেশীয় বাজারের খেলোয়াড় হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। পলিসি মেকিং, ব্যাংকিং, কাস্টমস ও ট্রেড প্রোমোশনসব জায়গায় এসএমইকে আলাদা গুরুত্ব না দিলে এসএমইবান্ধব গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।

 

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, তবে এসএমইকে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রে আনা এখন আর বিকল্প নয়এটি রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং এফবিসিসিআইয়ের জন্য একটি নীতিগত বাধ্যবাধকতা।

লেখাঃ 
সাবিনা ইয়াসমীন
        ম্যানেজিং ডিরেক্টর
        প্রচিত আই এম সি লিমিটেড

sidebar ad