বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে যাবে—এমন ধারণা অনেকেরই। ফলে ভুলে যাওয়া, একই কথা বারবার বলা কিংবা পরিচিত কোনো শব্দ মনে করতে সময় লাগাকে অনেকে স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ হিসেবে দেখেন।
কিন্তু মস্তিষ্কের সুস্থতার যত্ন নেওয়ার সময় শুধু বার্ধক্য নয়, এর অনেক আগেই। মস্তিষ্কে বয়সজনিত কিছু পরিবর্তন প্রথম স্মৃতির সমস্যা চোখে পড়ার আগেই শুরু হতে পারে। তাই ৪০ ও ৫০-এর দশক থেকেই মস্তিষ্কের যত্নকে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যচর্চার অংশ করা গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ভারতের মণিপাল হাসপাতাল ও আন্নাসামি মুদালিয়ার জেনারেল হাসপাতালের কগনিটিভ নিউরোলজি ক্লিনিকের প্রধান ডা. রত্নাভল্লি এল্লাজোসিউলার মতে, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য আসলে পুরো শরীরের স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। হৃদ্যন্ত্র, রক্তনালি, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার ওপরও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নির্ভর করে।
কগনিটিভ রিজার্ভ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’। সহজভাবে বললে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শেখা, মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্নায়বিক নেটওয়ার্ককে সক্রিয় ও নমনীয় রাখার সক্ষমতাকেই এর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়।
নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক কর্মকাণ্ড মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য উপকারী হতে পারে। নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, নতুন দক্ষতা অর্জন, সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখার মতো কর্মকাণ্ড মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে।
কীভাবে এখন থেকেই মস্তিষ্কের যত্ন নেবেন?
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরামর্শ দেওয়া হয়। হাঁটা, সাইক্লিং বা পছন্দের অন্য ব্যায়ামও হতে পারে। শারীরিক সক্রিয়তা মস্তিষ্ক ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন: বিশেষ করে মধ্য বয়সে উচ্চ রক্তচাপ পরবর্তী জীবনে জ্ঞানীয় অবনতির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
পর্যাপ্ত ঘুমান: ঘুম স্মৃতি, শেখা, মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের মতো মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
মস্তিষ্ককে নতুন কাজে ব্যস্ত রাখুন: নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, বই পড়া, নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন বা নতুন ধরনের কাজ শেখা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার সুযোগ তৈরি করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ‘ব্রেন গেম’ ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করবে—এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকুন: পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি মস্তিষ্কের সক্রিয়তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বকে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
খাদ্যাভ্যাসে নজর দিন: শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, মাছসহ পুষ্টিকর খাবারকে খাদ্যতালিকায় রাখা এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যও উপকৃত হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, ভুলে যাওয়া বা মনোযোগ কমে যাওয়া সবসময় ডিমেনশিয়ার লক্ষণ নয়। তবে স্মৃতির সমস্যা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, একই প্রশ্ন বারবার করা, পরিচিত জিনিসের নাম মনে করতে সমস্যা হওয়া, দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা বা পরিচিত জায়গায় বিভ্রান্ত হওয়ার মতো বিষয় দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এসব সমস্যার পেছনে চিকিৎসাযোগ্য কারণও থাকতে পারে।
মস্তিষ্কের যত্ন তাই শুধু বয়সের শেষভাগের বিষয় নয়। বরং ৪০-এর আগেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ৪০-৫০-এর দশকে সেগুলো ধরে রাখা ভবিষ্যতের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হতে পারে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি