কে-পপ ব্যান্ড ‌'বিগ ওশান'র প্রত্যেকেই শ্রবণপ্রতিবন্ধী, তাদের স্বতন্ত্র পরিবেশনাশৈলীতে মুগ্ধতা

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গান, নাচ আর ইশারা ভাষার মেলবন্ধনে মঞ্চ মাতাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ দল বিগ ওশান। তিন সদস্যের প্রত্যেকেই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তবে নিজেদের পরিচয় কেবল এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তাঁরা। সংগীতের নিজস্ব ভাষায় দর্শকের হৃদয় জয় করাই তাঁদের লক্ষ্য।



মঞ্চজুড়ে আলো ঝলমল করছে। দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর চারপাশ। ছন্দের তালে তালে এগিয়ে চলছে নাচ, গানের সঙ্গে মিলছে হাতের ইশারা। প্রচলিত কে-পপ পরিবেশনার সঙ্গে এই দৃশ্যের পার্থক্য স্পষ্ট। কারণ, মঞ্চে যাঁরা পারফর্ম করছেন, সেই তিন শিল্পীর প্রত্যেকেই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তাঁদের দলটির নাম বিগ ওশান।



দক্ষিণ কোরিয়ার এই কে-পপ দল সংগীত পরিবেশনার প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে। গান, নাচ ও ইশারা ভাষার সমন্বয়ে নিজেদের জন্য তৈরি করেছে স্বতন্ত্র পরিবেশনাশৈলী। শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা তাঁদের সংগীতচর্চার পথে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করলেও সেই বাস্তবতার মধ্যেই তাঁরা খুঁজে নিয়েছেন নিজেদের প্রকাশের পথ।



ছন্দের সঙ্গে ভিন্ন এক যাত্রা


কে-পপের জগৎ মানেই নিখুঁত কোরিওগ্রাফি, মঞ্চের দাপট, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর সংগীতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশনা। এই জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে হলে প্রয়োজন প্রতিভা, কঠোর অনুশীলন এবং দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা। বিগ ওশানের সদস্যরাও সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন, তবে তাঁদের পরিবেশনায় যুক্ত হয়েছে বাড়তি একটি মাত্রা—ইশারা ভাষার সৃজনশীল ব্যবহার।


শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিল্পীদের জন্য সংগীতের ছন্দ ও তাল অনুসরণ করার অভিজ্ঞতা শ্রবণক্ষম শিল্পীদের মতো নয়। তাই পরিবেশনার প্রস্তুতি ও মঞ্চে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রয়োজন হয় উপযোগী কৌশল ও অনুশীলন। বিগ ওশানের পরিবেশনায় নাচ ও ইশারা ভাষার সমন্বয় সেই প্রচেষ্টারই একটি প্রকাশ।



তাঁদের পরিবেশনা দর্শকদের সামনে সংগীত উপভোগের আরেকটি ধরন তুলে ধরে। এখানে হাতের ইশারা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং শিল্পীসত্তা প্রকাশেরও একটি অংশ। নাচ, শারীরিক অভিব্যক্তি ও মঞ্চের উপস্থাপনা মিলিয়ে তৈরি হয় তাঁদের নিজস্ব শৈলী।



আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিগ ওশান


২০২৪ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে আলোচনায় এসেছে বিগ ওশান। নিজেদের পরিবেশনার স্বাতন্ত্র্য দিয়ে দলটি দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংগীতজগৎ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের পরিচিত করে তোলার যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র সফর তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


গত ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে কনসার্টের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করে দলটি। আটটি শহর ঘিরে আয়োজিত এই সফরের প্রথম কনসার্টের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এই সাড়া দলটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।


একটি আন্তর্জাতিক সংগীতবাজারে নিজেদের জায়গা করে নেওয়া যেকোনো নতুন দলের জন্যই চ্যালেঞ্জের। তার ওপর বিগ ওশানের পরিবেশনার ধরন প্রচলিত কে-পপের চেয়ে আলাদা। ফলে তাদের সামনে যেমন নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে, তেমনি নিজেদের সংগীত ও মঞ্চ পরিবেশনার স্বকীয়তা তুলে ধরারও সুযোগ রয়েছে।



পরিচয়ের চেয়ে বড় সংগীত


বিগ ওশানের সদস্যদের গল্পে শ্রবণপ্রতিবন্ধকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁদের আকাঙ্ক্ষা শুধু এই পরিচয়ের কারণে দর্শকদের মনোযোগ পাওয়া নয়। তাঁরা চান, মানুষ তাঁদের চিনুক নিজেদের গান, নাচ ও পরিবেশনার জন্য।


এই প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কোনো শিল্পীর শারীরিক সীমাবদ্ধতা বা ব্যক্তিগত বাস্তবতা তাঁর পরিচয়ের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই যেন তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়—বিগ ওশানের অবস্থানকে এভাবেও দেখা যায়।


শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিল্পীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি তাঁদের পরিবেশনা সংগীতের বহুমাত্রিকতাও সামনে আনে। সংগীতকে অনুভব ও প্রকাশ করার ধরন যে একটিমাত্র পথে সীমাবদ্ধ নয়, বিগ ওশানের পরিবেশনা তারই উদাহরণ।


তবে তাঁদের শিল্পীসত্তাকে কেবল অনুপ্রেরণার গল্প হিসেবে দেখলে সংগীতের নিজস্ব মূল্যায়ন আড়ালে পড়ে যেতে পারে। অন্য যেকোনো শিল্পীর মতো বিগ ওশানের গান, নাচ, কোরিওগ্রাফি এবং মঞ্চে দর্শকদের সঙ্গে তাঁদের সংযোগও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।



নতুন সম্ভাবনার দিকে


বিশ্বজুড়ে কে-পপের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংগীতধারায় যুক্ত হচ্ছে নানা ধরনের শিল্পী ও পরিবেশনা। এই প্রেক্ষাপটে বিগ ওশানের যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, সংগীতের জগতে সৃজনশীলতার জন্য প্রচলিত ছকের বাইরে ভাবার সুযোগ সব সময়ই রয়েছে।


তাঁদের সামনে পথচলার আরও অনেক ধাপ বাকি। আন্তর্জাতিক দর্শকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, নিজেদের পরিবেশনাকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং সংগীতজগতে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করা—সবই তাঁদের ভবিষ্যৎ যাত্রার অংশ।


বিগ ওশানের গল্প তাই শুধু তিনজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিল্পীর মঞ্চে উঠে আসার গল্প নয়। এটি নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি খুঁজে নেওয়া, প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কাজ করা এবং শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের গল্পও।


মঞ্চে যখন গান, নাচ আর ইশারা ভাষা একসঙ্গে মিশে যায়, তখন বিগ ওশান যেন একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—শিল্পের ভাষা প্রকাশের পথ খুঁজে নিতে পারে নানা উপায়ে। আর শেষ পর্যন্ত দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই শিল্পের নিজস্ব শক্তি।

sidebar ad