ফ্রেন্ডশিপ ডেঃ জানা-অজানা

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬

ফ্রেন্ডশিপ ডেঃ জানা-অজানা

“পুরো পৃথিবী এক দিকে আর আমি অন্য দিক,

সবাই বলে করছো ভূল, আর তোরা বলিস ঠিক।

তোরা ছিলি, তোরা আছিস, জানি তোরাই থাকবি’

বন্ধু বোঝে আমাকে, বন্ধু আছে আর কি লাগে?”


সংগীতপ্রেমীদের কাছে এই গানটি শুধু একটি গান নয়, বরং বন্ধুত্বের এক নিখাদ অনুভূতি। মাত্র কয়েকটি লাইনে যেন ধরা পড়েছে বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা। পৃথিবীর সবাই যখন ভুল বোঝে, তখন একজন সত্যিকারের বন্ধু বিনা দ্বিধায় পাশে দাঁড়ায়। যখন চারপাশে সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন সেই বন্ধুই বলে, ‘আমি আছি।’ হয়তো এ কারণেই বলা হয়, বন্ধু রক্তের সম্পর্কে তৈরি হয়না, তৈরি হয় বিশ্বাস, আস্থা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।


বন্ধুরা নানা ধরনের ও নানা প্রেক্ষাপটের হতে পারে। তারা হতে পারে ছোটবেলার কোনো পরিচিত মানুষ, স্কুলের সহপাঠী, কিংবা কর্মক্ষেত্র বা অন্য বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া কেউ। তারা হয়তো অন্য কোন দেশে দূরে থাকে অথবা অনলাইনে গড়ে ওঠা ভার্চুয়াল বন্ধু। যে ধরনের হোক না কেন বা যেমনভাবেই পরিচয় হোক না কেন, সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্ব এবং এর তাৎপর্যও পরিবর্তিত হতে থাকে। একসময় সহপাঠী ও পাড়ার বন্ধুদের সাথে আমরা মিলেমিশে জগতকে জেনেছি ও বুঝেছি। একে অপরের সাথে নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছি। সময়ের পরিক্রমায় জীবনের পথ আলাদা হয়ে যায় এবং আমাদের সামাজিক পরিমন্ডলে নতুন নতুন বন্ধুর আগমন ঘটে। এভাবেই আমাদের জগত প্রসারিত হয় এবং আমাদের জীবনধারা বা সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে।


একসাথে কোনো কাজ করা কিংবা কেবল একে অপরের সাথে কথা বলা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক বিশেষ বন্ধন তাদের সাথে আমাদের থাকে। কঠিন সময়ে পাশে থাকা এবং আনন্দের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য বন্ধুরা অপরিহার্য। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ বন্ধুত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একাকীত্ব কমাতে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং কঠিন সিদ্ধান্তে নেওয়ার সময় মানসিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।


প্রতি বছর ফ্রেন্ডশিপ ডে এলেই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, আসল ফ্রেন্ডশিপ ডে কোনটি? ৩০ জুলাই নাকি আগস্টের প্রথম রবিবার? মজার বিষয় হলো, দুটি তারিখই সঠিক। তবে তাদের ইতিহাস ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস এর ইতিহাস বেশ আকর্ষনীয়। ব্যবসায়ী উদ্যোগ থেকে শুরু করে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, কয়েকটি ধাপে এই দিনের সূচনা ঘটেছিল।


হলমার্ক কার্ডস এর প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল সর্বপ্রথম আগস্টের প্রথম রবিবারে বন্ধু দিবস উদযাপনের প্রস্তাব দেন। এই দিনটিতে মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠানোর মাধ্যমে নিজেদের বন্ধুত্ব উদযাপন করত। তবে বাণিজ্যিক কৌশল মনে করে মানুষ শুরুতে এটি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেনি। এই উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে শুভেচ্ছা কার্ডের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই প্রথাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।


পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে প্যারাগুয়েতে আর্টেমিও ব্রাচো তাঁর বন্ধুদের সাথে এক নৈশভোজে বৈশ্বিক বন্ধুত্বের ধারণা উত্থাপন করেন। এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা পায় ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড’। তারা ৩০ জুলাই বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস উদযাপনের সামাজিক আন্দোলন শুরু করে।


১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের তখনকার মহাসচিব কফি আনানের স্ত্রী নান আনান কার্টুন চরিত্র ‘উইনি দ্য পুহ’ কে বিশ্বের অফিশিয়াল ফ্রেন্ডশিপ অ্যাম্বাসেডর বা বন্ধুত্বের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাই তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর মূল বার্তা ছিলো- বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈশ্বিক শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা।


তবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন তারিখেও এটি উদযাপন করতে দেখা যায়। যেমন- আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও স্পেনে ২০ জুলাই ফ্রেন্ডস ডে পালন করা হয়। আবার বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশে আগস্টের প্রথম রোবাবার বন্ধু দিবস উদযাপনের জনপ্রিয় সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।


বিশ্বের যেখানেই, যেসময়েই এটি পালিত হোক না কেন, উদযাপনের ধরন, এর মূল সুর বা উদ্দেশ্য একই। বন্ধুত্ব দিবস হলো সেই বিশেষ উপলক্ষ, যখন আমরা একটু থেমে সেই মানুষগুলোকে উদযাপন করতে পারি যারা আমাদের জীবনকে আরও সুন্দর ও সহজ করে তোলে। ফ্রেন্ডশিপ ডে বেশ কয়েকভাবে উদযাপন করা যেতে পারে-

 

১. বন্ধুত্বের সহজ প্রতীক ও সবচেয়ে পুরাতন ঐতিহ্য হিসেবে ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড পরানো।


২. পুনর্মিলনীর আয়োজন করা। পুরোনো নতুন সব বন্ধুদের একত্রিত করে কোথাও খাওয়া বা পুরোনো স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে আড্ডার ব্যবস্থা করা।


৩. এমন অনেক কথা আছে যা সচরাচর মুখে বলা হয়ে উঠে না। এমন আন্তরিক বার্তা সহকারে কার্ড দেয়া যেতে পারে। যেটি যেকোন উপহারের চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে।


৪. সম্ভব হলে সবাই মিলে একটি শর্ট ট্রিপ দিয়ে আসতে পারেন। তা হতে পারে কোনো রোড ট্রিপ, হাইকিং কিংবা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের কোন প্রিয় জায়গা।


৫. যারা দূরে থাকে তাদের জন্য গিফট কার্ড পাঠাতে পারেন।


৬. আর কোনকিছু না হলেও একটি মেসেজ বা কল দিন। একটি ছোট্ট বার্তা, একটি ফোনকল; হয়তো এটাই আপনার বন্ধুর পুরো দিনটিকে সুন্দর করে দিতে পারে।


লেখা- শায়লা জাহান

sidebar ad