নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষজনিত হত্যাকাণ্ডের (Gender-Based Violence and Femicide—GBVF) সবচেয়ে চরম রূপ। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উচ্চহারের কারণে দক্ষিণ আফ্রিয়াকে বিশ্বের অন্যতম উচ্চ ফেমিসাইড-হারের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। অথচ তাঁদের একটি বড় অংশ নিয়মিত সহিংসতা, নির্যাতন কিংবা হত্যার ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটান।
প্রতি তিন নারীর একজনের বেশি সহিংসতার শিকার
হিউম্যান সায়েন্সেস রিসার্চ কাউন্সিলের ২০২২ সালের Gender-Based Violence Survey অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৩ শতাংশেরও বেশি নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আর প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানকে দেশের মোট নারী জনসংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বিষয়টির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭৩ লাখ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় ২১ লাখ নারী যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন।
অর্থাৎ, সহিংসতা দক্ষিণ আফ্রিকার নারীদের জীবনে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট।
সম্পর্কের মধ্যেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই
দক্ষিণ আফ্রিকার মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষণাতেও দেশটিতে ফেমিসাইডের উচ্চহার উঠে এসেছে। বিশেষ করে স্বামী, প্রেমিক কিংবা সাবেক সঙ্গীর হাতে নারীদের হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনে প্রায়ই দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন, হুমকি, ভয় দেখানো কিংবা যৌন সহিংসতার ইতিহাস থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সম্পর্কে নারীটির ক্ষমতা কম কিংবা তাঁর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদ সীমিত। ফলে নির্যাতন থেকে বেরিয়ে আসা বা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
নারীদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং তাঁদের মধ্যে দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্য। অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীলতা অনেক নারীকে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
সহিংসতার পেছনে যে বৈষম্য
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমাজের দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও ক্ষমতার অসম সম্পর্ক।
নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য, নারী-পুরুষের মধ্যে অসম ক্ষমতার সম্পর্ক, প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ধারণা এবং ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি—সবকিছু মিলেই সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সহিংসতা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন নারী, যুব ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক মন্ত্রী সিন্দিসিওয়ে চিকুঙ্গা এক বক্তব্যে বলেন, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও ফেমিসাইডের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ; এসব সংখ্যা আসলে ভেঙে যাওয়া জীবন, থেমে যাওয়া স্বপ্ন এবং অন্ধকার হয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
২০২০ সালে নেওয়া হলো জাতীয় কৌশল
জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষজনিত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২০ সালে National Strategic Plan গ্রহণ করে। এটি পুরো সমাজকে সম্পৃক্ত করে সহিংসতা প্রতিরোধের একটি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনা ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ;
সহিংসতার ঘটনায় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কার্যকর ভূমিকা জোরদার করা;
সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা, সেবা ও পুনর্বাসন;
ভুক্তভোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা;
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো;
সহিংসতার মূল কারণ মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন তৈরি করা।
অর্থাৎ, শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াই নয়; সহিংসতা যাতে ঘটেই না, সেই পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইন ও নীতিগত সংস্কার
নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ আফ্রিকা বিভিন্ন আইনগত সংস্কারও করেছে। এর মধ্যে রয়েছে Domestic Violence Act, Sexual Offences Act এবং National Council on Gender-Based Violence Act।
আঞ্চলিক পর্যায়েও দেশটি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নের African Union Convention on Ending Violence Against Women and Girls (AUCEVAWG) তৈরির প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই কনভেনশনের লক্ষ্য হলো আফ্রিকার দেশগুলোতে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষায় একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করা।
পুরুষদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের দায়িত্ব শুধু নারী, পরিবার বা রাষ্ট্রের নয়। সমাজের পুরুষদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী চিকুঙ্গা পুরুষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যারা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা করেন তারা যেন এই আচরণ বন্ধ করার অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ক্ষতিকর সামাজিক ধারণা ও ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’র বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
কারণ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করা, যেখানে নারীর প্রতি সম্মান, সমতা ও মানবিক মর্যাদা সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি হবে।
নিরাপদ সমাজ কি সম্ভব?
দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, পরিবার এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তাও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সব অংশীজন ও নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে এমন একটি দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ে তোলাই লক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি নারী ও কন্যাশিশু ভয় ও সহিংসতা থেকে মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করতে পারবেন।
এটি শুধু একটি স্বপ্ন নয়—নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎ তৈরির দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি মানুষের।
সূত্র: https://www.gov.za/