জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা, দীর্ঘ হচ্ছে তাপপ্রবাহের সময়কাল। কিন্তু অতিরিক্ত গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসবোত্তর নারী, নবজাতক এবং শিশুরা তীব্র গরমের কারণে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। অথচ এসব ঝুঁকির প্রভাব নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে নানা ঘাটতি। ফলে তাপপ্রবাহের কারণে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা অনেক সময় যথাযথভাবে বোঝা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণেও তাদের বিশেষ চাহিদা উপেক্ষিত থেকে যায়।
এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ‘Priority Indicators to Monitor the Impact of Heat Exposure on Maternal, Newborn and Child Health’ শীর্ষক নির্দেশিকাটি। স্বাস্থ্যসেবা ও তাপমাত্রাসংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালানো এবং আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেশগুলোকে সহায়তা করাই এই নির্দেশিকার উদ্দেশ্য।
নির্দেশিকায় নজরদারির জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. মা, নবজাতক ও শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
এ ক্ষেত্রে অকাল প্রসব (প্রিটার্ম বার্থ) এবং বহির্বিভাগে রোগীর উপস্থিতিকে প্রধান সূচক হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনা, কম জন্ম-ওজন, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যু এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতির মতো বিষয়ও পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
২. জনস্বাস্থ্য নজরদারি
তাপপ্রবাহের সময় মৃত্যুহার ও জরুরি বিভাগে রোগীর উপস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি। এসব তথ্য বয়স ও লিঙ্গভিত্তিকভাবে আলাদা করে দেখলে নারী, নবজাতক ও শিশুদের ওপর তাপের প্রভাব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। কারণ সামগ্রিক জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে অনেক সময় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ঝুঁকির চিত্র আড়ালে থেকে যায়।
৩. জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পর্যবেক্ষণ
জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মধ্যে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কবার্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে মা, নবজাতক ও শিশুদের প্রয়োজন কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৪. তাপমাত্রা ও তাপের তীব্রতা পরিমাপ
তাপের সংস্পর্শ পরিমাপের প্রধান সূচক হিসেবে বায়ুর তাপমাত্রাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় তথ্য সংগ্রহের সুযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকলে তাপের তীব্রতা বোঝার জন্য বিভিন্ন হিট ইনডেক্স বা তাপসূচক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও তাপমাত্রার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ জরুরি
শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না, সেগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করাও প্রয়োজন। নির্দেশিকায় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ও তাপমাত্রার তথ্য একই সময় ও ভৌগোলিক এলাকার ভিত্তিতে সমন্বয় করে বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাভাবিক পরিস্থিতির একটি ভিত্তিমাত্রা নির্ধারণ, প্রত্যাশিত ও বাস্তব পরিস্থিতির তুলনা এবং অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তার কারণ অনুসন্ধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে এ কাজ করতে গিয়ে অসম্পূর্ণ তথ্য, ঋতুভেদে স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিবর্তন এবং তাপের সংস্পর্শের পর স্বাস্থ্যগত প্রভাব দেখা দিতে সম্ভাব্য বিলম্বের মতো চ্যালেঞ্জও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগেই সুরক্ষিত হতে পারে মা ও শিশু
এই নির্দেশিকাটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, জনস্বাস্থ্য ও রোগ নজরদারি দল, আবহাওয়া অধিদপ্তর, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং গবেষকদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্য ও জলবায়ু খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং বিদ্যমান তথ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
তাপপ্রবাহের কারণে স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ কখন তৈরি হতে পারে, কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোথায় দ্রুত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয়ে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি আরও জোরদার করা সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে তাপপ্রবাহকে কেবল আবহাওয়াগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতকের সুস্থতা ও শিশুর বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করতে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, কার্যকর নজরদারি এবং আন্তখাতীয় সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। কারণ তীব্র গরমের পৃথিবীতে নারী, নবজাতক ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে তাদের ঝুঁকিকে আগে দৃশ্যমান করতে হবে।
সূত্র: ইউএনএফপিএ