প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে যৌন সহিংসতার ধরণ

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সরাসরি শরীর স্পর্শ না করেও কি কেউ আপনার যৌন নিরাপত্তা লঙ্ঘন করতে পারে?  উত্তর—হ্যাঁ। সাধারণত যৌন সহিংসতা বলতে আমরা বুঝি অবাঞ্ছিত স্পর্শ বা যৌন নিপীড়ন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অঙ্গভঙ্গি, কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব কিংবা ধর্ষণের মতো ঘটনা। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যৌন সহিংসতার ধরনেও বদল এসেছে। এখন সব সময় কাউকে সরাসরি স্পর্শ করার প্রয়োজন হয় না; কখনো একটি স্মার্টফোন, একটি ছবি কিংবা কয়েকটি বার্তাও হয়ে উঠতে পারে হয়রানি, অপমান ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। 


আপনার সম্মতি ছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন ছবি বা বার্তা পাঠানো, বারবার প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও ডেট বা যৌন মিলনের জন্য অনুরোধ করা, সম্মতি ছাড়া যৌন মিলনের সময় ভিডিও করা, যৌন ছবি অনলাইনে বা অন্যদের সাথে শেয়ার করা—এইসব কিছুও হতে পারে যৌন সহিংসতার অংশ।


সম্প্রতি আইসল্যান্ডের নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা এই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স’-এ টানা ১৭ বছর ধরে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসল্যান্ড বিশ্বের একমাত্র দেশ যা তাদের লিঙ্গ বৈষম্যের ৯৩% সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পেরেছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে সমতাভিত্তিক দেশেও দেখা গিয়েছে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার ভয়ংকর নতুন রূপ। 


হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং ইউনিভার্সিটি অব আইসল্যান্ডের যৌথ গবেষণা অনুসারে, আইসল্যান্ডের এক-তৃতীয়াংশের (৩৪.৫%) বেশি নারী প্রযুক্তি-সহায়তায় যৌন সহিংসতা (টিএফএসভি) বা অন্যান্য জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণের শিকার হয়েছেন এবং কম বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। আইসল্যান্ডের এই উদ্বেগজনক চিত্র তাই নতুন করে ভাবাচ্ছে গবেষকদেরও।


প্রতি তিনজনের একজনের অভিজ্ঞতা


নারীদের প্রতি সহিংসতা নিয়ে গবেষণাটি ২০২৬ সালের ১৫ই অক্টোবর জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেন (JAMA Network Open) -এ প্রকাশিত হয়েছিল। এর সহ-লেখকদের মধ্যে ছিলেন হার্ভার্ড চ্যান স্কুলের এপিডেমিওলজি বিভাগের সহযোগী অড্রে মার্চল্যান্ড ও রেবেকা লন ; এপিডেমিওলজির অ্যাডজাঙ্কট অধ্যাপক উনুর ভালদিমার্সদোত্তির ; এবং সাইকিয়াট্রিক এপিডেমিওলজির অধ্যাপক কারেস্তান কোয়েনেন।


কাগজে-কলমে আইসল্যান্ড নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নে শীর্ষে থাকলেও, বাস্তবে দেশটির প্রায় ৪০% নারী তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সমতার উচ্চ হারের সাথে সহিংসতার এই উচ্চ হারের বৈপরীত্যকে গবেষকরা "নর্ডিক প্যারাডক্স" ( Nordic Paradox) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই দ্বিমুখী আচরণের মূল কারণ খুঁজে বের করার জন্যই গবেষণাগুলো করা হয়েছে।


শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে তরুণ প্রজন্মের নারীরা প্রথাগত সহিংসতার বাইরেও নতুন ধরণের প্রযুক্তি-ভিত্তিক যৌন সহিংসতা (TFSV) -এর মুখোমুখি হচ্ছেন। কিন্তু গবেষণার লেখকদের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা বোঝার মতো তথ্য-উপাত্তের অভাব রয়েছে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য এবং এই আধুনিক রূপগুলো চিহ্নিত করার জন্য গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। 


গবেষকরা আইসল্যান্ডের ১৮ থেকে ৬৯ বছর বয়সী সমস্ত আইসল্যান্ডীয়-ভাষী মহিলাদের অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ২০২৪ সালে, ১৬,০৯৮ জন মহিলা (৫৩%) একটি ফলো-আপ সমীক্ষা সম্পন্ন করেন। টিএফএসভি বা অন্যান্য জবরদস্তিমূলক যৌন কার্যকলাপ সম্পর্কিত ডেটা অনুপস্থিত থাকায় ১৭৪০ জন অংশগ্রহণকারীকে বাদ দেওয়ার পর, ১৪,৩৫৮ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, তারা কখনও আটটি নির্দিষ্ট ধরনের যৌন সহিংসতা (TFSV) বা অন্যান্য জবরদস্তিমূলক যৌন কার্যকলাপের শিকার হয়েছেন কিনা। তারা দেখতে পান যে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৪.৫% জীবনের কোনো এক সময়ে অন্তত এক ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ, প্রতি তিনজনের একজনেরও বেশি। 


এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে অংশগ্রহণকারী নারীদের সবাই ধর্ষণ বা একই ধরনের অপরাধের শিকার হয়েছেন। গবেষণায় যৌন ছবি বা বার্তার মাধ্যমে হয়রানি, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছবি পাঠানোর চাপ, বারবার প্রত্যাখ্যানের পরও যৌন সম্পর্কের অনুরোধ এবং সম্মতি ছাড়া যৌন আচরণের মতো একাধিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।


গবেষণায় আরো দেখা গেছে, কম বয়সী নারীদের মধ্যে এর ব্যাপকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল: ২৩ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অবাঞ্ছিত যৌন ছবি বা এই ধরনের ছবির জন্য অনুরোধ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও ডেট বা যৌন মিলনের জন্য ক্রমাগত অনুরোধের কথা জানিয়েছেন।


গবেষণাপ্রাপ্ত তথ্য এটিই প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্য করে পাঠানো বার্তা বা ছবিগুলো কেবল 'ভার্চুয়াল স্ক্রিনের কিছু লেখা' নয়, বরং এগুলো ভুক্তভোগীর মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।


যৌন সহিংসতা যখন স্ক্রিনের ওপারে


এই এক বাক্যই বর্তমান ডিজিটাল যুগের অন্যতম একটি রূঢ় এবং নির্মম বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। শারীরিক সহিংসতার দাগ চোখে দেখা যায়, কিন্তু ডিজিটাল বা অনলাইন যৌন সহিংসতার মানসিক ক্ষত থাকে অদৃশ্য। বাস্তব জীবনে মানুষের যে ব্যক্তিগত একটি সীমানা থাকে, ডিজিটাল মাধ্যমেও যে ঠিক একই রকম সীমানা ও অধিকার রয়েছে, তা অনেকেই মানতে চান না। যার দরুন সাইবার-ফ্ল্যাশিং, অনলাইন স্টকিং হয়েই যাচ্ছে। 


গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ২৪.৯ শতাংশ জীবনের কোনো এক সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন ছবি বা বার্তা পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আবার ১৮.৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যৌন ছবি পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে এবং বারবার প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও ১৫.৮ শতাংশ ডেট বা যৌন মিলনের জন্য ক্রমাগত অনুরোধ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।


অনেক সময় সমাজ বা অপরাধীরা মনে করে, "এটা তো জাস্ট একটা মেসেজ/ছবি, এতে আর কী আসে যায়!" কিন্তু সত্য হলো, সম্মতি (Consent) ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে যেকোনো ধরণের যৌন উত্তেজক ইঙ্গিত দেওয়া সরাসরি একজন মানুষের ব্যক্তিগত সীমানা এবং স্বাধীনতার লঙ্ঘন।


সম্মতি ছাড়া কনডম খুলে ফেলা: স্টেলথিং কী?


যৌন সহিংসতার আরেকটি আলোচিত ধরন হলো স্টেলথিং (Stealthing)। শব্দটি অনেকের কাছে অপরিচিত হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যৌন সম্মতির একটি মৌলিক প্রশ্ন। স্টেলথিং' (Stealthing) হলো যৌন মিলনের সময় সঙ্গীর অজান্তে বা তার সম্মতি ছাড়া গোপনে কনডম খুলে ফেলা বা তা ক্ষতিগ্রস্ত করা


ধরা যাক, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক এই শর্তে যৌন মিলনে সম্মত হন যে তারা কনডম বা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করবেন, কিন্তু মিলনের মাঝপথে অন্য পক্ষ যদি না জানিয়ে বা লুকিয়ে সেটি সরিয়ে ফেলে, তবে সেই কাজটিকে 'স্টেলথিং' বা নন-কনসেনসুয়াল কনডম রিমুভাল (Non-consensual condom removal) বলা হয়। 


এখন হয়তো মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, এটি কেন সরাসরি যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণ? কেউ যৌন সম্পর্কে সম্মতি দিয়েছেন মানেই সেই সম্পর্কের প্রতিটি আচরণে তাঁর সম্মতি রয়েছে, এমন নয়। সম্মতি নির্দিষ্ট হতে পারে, শর্তসাপেক্ষ হতে পারে এবং যেকোনো সময় প্রত্যাহারও করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তি যদি 'কনডমসহ' যৌন মিলনে রাজি হন, তার মানে এই নয় যে তিনি 'কনডম ছাড়া' মিলনেও রাজি হয়েছেন। কনডম সরিয়ে ফেলার মুহূর্তেই পূর্বের সম্মতি বাতিল হয়ে যায় এবং পুরো বিষয়টি যৌন নিপীড়ন (Sexual Assault) বা ধর্ষণে রূপান্তরিত হয়। 


এ ধরনের আচরণ অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় ২৩ থেকে ৩৪ বছর অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ১৫.২ শতাংশই তাদের জীবনে অন্তত একবার স্টেলথিং বা সম্মতি ছাড়া পার্টনার কর্তৃক গোপনে কনডম খুলে ফেলার শিকার হয়েছেন। আর সব বয়সী নারীদের (২৩ থেকে ৭৪ বছর) গড় হিসাব করলে দেখা যায়, আইসল্যান্ডের মোট নারীর প্রায় ৬ শতাংশ তাদের জীবনে স্টেলথিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এটি তাঁদের জীবদ্দশার অভিজ্ঞতার হার; এক বছরে ঘটে যাওয়া ঘটনার সংখ্যা নয়। এই পরিসংখ্যান থেকে আইসল্যান্ডে বর্তমানে স্টেলথিংয়ের ঘটনা বাড়ছে কি না, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যায় না।



যৌন সম্পর্কের মধ্যেও কি সহিংসতা থাকতে পারে?


যৌন সহিংসতা নিয়ে আলোচনায় একটি ভুল ধারণা প্রায়ই সামনে আসে, দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে কিংবা তাঁরা যৌন সম্পর্কে সম্মত হয়েছেন, তাই সেখানে ঘটে যাওয়া সব আচরণই বুঝি গ্রহণযোগ্য।


বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন


একটি আপাতসম্মতিমূলক যৌন সম্পর্কের মধ্যেও স্টেলথিং এবং শ্বাসরোধের মতো চরম সহিংসতামূলক আচরণ থাকতে পারে। যৌন সম্পর্কের সময় সঙ্গীর সম্মতি ছাড়া গলা চেপে ধরা বা শ্বাসরোধ করা (Non-consensual Choking/Strangulation) কেবল একটি সহিংস আচরণ নয়, এটি একটি অত্যন্ত মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ এবং এ ধরনের আচরণে মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হওয়া, রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সহ ভুক্তভোগীর অন্যান্য গুরুতর শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা থাকে।


আইসল্যান্ড এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে, তরুণ প্রজন্মের নারীদের মধ্যে সম্মতিমূলক সম্পর্কের আড়ালে এই ধরণের চরম ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে উদ্বেগজনকভাবে, বয়স্ক নারীদের তুলনায় তরুণী নারীদের (২৩-৩৪ বছর বয়সী) মধ্যে যৌনমিলনের সময় সম্মতিহীন শ্বাসরোধ বা দমবন্ধ হওয়ার ঘটনা তিনগুণ বেশি ছিল (১৫% বনাম <৫%)। লেখকরা উল্লেখ করেছেন, “উভয়মান প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, যৌনমিলনের সময় শ্বাসরোধ এবং দমবন্ধ হওয়ার ঘটনা স্নায়বিক ও জ্ঞানীয় সমস্যার মতো স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হতে পারে।”


অজান্তে ওষুধ বা মাদকদ্রব্য দেওয়া


যৌন সহিংসতার কিছু ঘটনা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। কারণ, সব সময় ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন না তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে। কাউকে তাঁর অজান্তে বা সম্মতি ছাড়া এমন কোনো ওষুধ কিংবা মাদকদ্রব্য দেওয়া হলে, যার প্রভাবে তিনি পরিস্থিতি বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে বা নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর যৌন নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।


যৌন সম্পর্ক বা ডেটিংয়ের প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যক্তির অজান্তে বা তার সম্মতি ছাড়া কোনো প্রকার ওষুধ, ঘুমের বড়ি বা মাদকদ্রব্য খাওয়ানো বা শরীরে প্রবেশ করানো একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরণের অপরাধকে "ড্রাগ-ফ্যাসিলিটেটেড সেক্সুয়াল অ্যাসাল্ট" (Drug-Facilitated Sexual Assault - DFSA) বা প্রচলিত ভাষায় "ডেট রেপ ড্রাগস" (Date Rape Drugs)-এর ব্যবহার বলা হয়।


গবেষণায় ২৩ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীদের ৩৩.৯ শতাংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে ওষুধ, অ্যালকোহল বা অন্য মাদকদ্রব্য পাওয়ার অভিজ্ঞতা বা সন্দেহের কথা জানিয়েছেন। আইসল্যান্ডসহ বিশ্বজুড়ে তরুণীদের ওপর করা সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে যে, এটি নারীদের নিরাপত্তার জন্য অন্যতম একটি বড় এবং নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও কেন জরুরি এই আলোচনা?


আইসল্যান্ডের মতো একটি শীর্ষ লিঙ্গ-সমতাভিত্তিক দেশের গবেষণায় যখন স্টেলথিং, সম্মতি ছাড়া শ্বাসরোধ বা অজান্তে মাদক প্রয়োগের মতো ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে, তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনাটি আরও অনেক বেশি জরুরি ও স্পর্শকাতর। আমাদের দেশে এই বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক স্তরে কথা না বলায় ভুক্তভোগী নারীরা এক অদৃশ্য ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।


বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সাথে উগ্র ও সহিংস পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা যুবসমাজের একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পর্নোগ্রাফিতে প্রদর্শিত সহিংস আচরণগুলোকে (যেমন শ্বাসরোধ বা আঘাত করা) বাস্তব জীবনে স্বাভাবিক মনে করে সঙ্গীর ওপর প্রয়োগ করার প্রবণতা শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা নিয়ে কোনো প্রকাশ্য আলোচনা হয় না।


এছাড়াও, আমাদের সমাজে এবং আইনি কাঠামোতে 'যৌন সম্মতি' বা 'কনসেন্ট' বিষয়টিকে এখনো সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত বা অনুধাবন করা হয় না। বৈবাহিক বা অবিবাহিত যেকোনো সম্পর্কেই একবার কোনো বিষয়ে সম্মতি দিলে বা সম্পর্কে জড়ালে, পার্টনার ধরে নেয় যে অপর পক্ষের শরীরের ওপর তার সম্পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে স্টেলথিং বা জোরপূর্বক শ্বাসরোধের মতো আচরণ যে অপরাধ, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।


তাই বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজন স্থানীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গবেষণা এবং যৌন হয়রানি ও সাইবার অপরাধসংক্রান্ত তথ্যের বিশ্লেষণ।


পাশাপাশি প্রয়োজন কয়েকটি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। যেমন, অনলাইনে কাউকে যৌন ছবি পাঠানো বা ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া যে সব সময় নিরীহ আচরণ নয়, তা বোঝা। পরিচিত বা প্রেমের সম্পর্কের মধ্যেও সম্মতি যে অপরিহার্য, তা স্বীকার করা। কারও ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে পাঠানো কিংবা প্রকাশ করা যে তাঁর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন, তা উপলব্ধি করা।


যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে তাকাতে শেখাচ্ছে আইসল্যান্ডের এই গবেষণা। সহিংসতা সব সময় দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন রেখে যায় না। কখনো তা ফোনের পর্দায় আসে আবার কখনো বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভেতরে ঘটে থাকে। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে যৌন হয়রানির প্রকাশভঙ্গিও। তাই যৌন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ধারণাটিও হতে হবে সময়োপযোগী।


sidebar ad