‘অবিবাহিত, ডিভোর্সি বা বিধবা নারীদের সামাজিকভাবে যেন কেউ হেনস্তা না করে’

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬

ফাতিমা জাহান, সোলো ট্রাভেলার
ফাতিমা জাহান, সোলো ট্রাভেলার

ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। ছিল রিটার্ন টিকিটও। গন্তব্য নেপাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিন নারীকে বাংলাদেশ থেকে নেপালে যেতে দেওয়া হয়নি। কারণ হিসেবে ইমিগ্রেশন পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁদের অবিবাহিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।


ঘটনাটি শুধু তিন নারীর ভ্রমণ আটকে দেওয়ার ঘটনা নয়; বরং একজন নারীর বৈবাহিক অবস্থাকে তাঁর চলাফেরা, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।


সোলো ট্রাভেলার ফাতিমা জাহানের ভাষায়, বিষয়টি প্রথমত অসম্মানজনক ও অসৌজন্যমূলক আচরণ। তাঁর প্রশ্ন—একজন নারী বিবাহিত কি না, সেটি কেন তাঁর বৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?


ফাতিমা জাহান বলেন, “বিবাহিত হওয়া বা না হওয়া দেশের সংবিধানে কাউকে অধিক বা কম সুবিধা দেয় না।” তাঁর মতে, কোনো নারী অবিবাহিত—এই পরিচয় কখনোই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা অযৌক্তিকভাবে হয়রানি করার কারণ হতে পারে না।


বৈবাহিক পরিচয় কেন ভ্রমণের শর্ত হবে?


একজন নাগরিক বিদেশ ভ্রমণ করবেন কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর পাসপোর্ট, ভিসা, প্রয়োজনীয় অনুমতি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিধিবিধান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে একজন নারী বিবাহিত কি না—এই ব্যক্তিগত পরিচয়কে যদি ভ্রমণের অনুমতি দেওয়ার অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা নারীর নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


ফাতিমা জাহানের অভিযোগ, ওই তিন নারীর কাছে রিটার্ন টিকিটসহ ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁদের যেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এমন আচরণ করেছেন, তাতে তাঁর “নীচু মানসিকতার” পরিচয় পাওয়া গেছে।


ঘটনার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হলেও যথাযথ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ ফাতেমার। তাঁর মতে, বিষয়টি জানার পরও যদি দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নীরব থাকেন কিংবা ঘটনাটিকে গুরুত্ব না দেন, তাহলে সেটিও দায়িত্বহীনতার পরিচয়।


সংবিধান কী বলে?


বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। আর ৩৬ অনুচ্ছেদে জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও পুনঃপ্রবেশের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে।


ফাতিমা জাহানের বক্তব্য, এসব অধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের আলাদা কোনো মানদণ্ড থাকার কথা নয়। ফলে কেবল একজন নারী অবিবাহিত—এই পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর বিদেশ ভ্রমণ আটকে দেওয়া হলে সেটি অবশ্যই প্রশ্ন তোলার মতো বিষয়।


তবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশন বিধি, আদালতের আদেশ বা অন্য কোনো বৈধ আইনি বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত আইনসঙ্গত ছিল কি না, তা নির্ধারণে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট বিধি পর্যালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু বৈবাহিক অবস্থা যদি একমাত্র বা অযৌক্তিক কারণ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুতর নাগরিক অধিকার প্রশ্ন তৈরি করে।


নারীর পরিচয় কী এখনো অন্যের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল?


বাংলাদেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেন, ব্যবসা করছেন, বিদেশে পড়তে যাচ্ছেন, একা ভ্রমণ করছেন। কেউ বিবাহিত, কেউ অবিবাহিত, কেউ ডিভোর্সি, কেউ বিধবা। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনযাপন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আলাদা। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় বৈবাহিক পরিচয় এখনো অনেক সময় একজন নারীর যোগ্যতা, নিরাপত্তা কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।


বিশেষ করে অবিবাহিত নারীকে একা ভ্রমণ করতে দেখলে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ কিংবা অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন—এসব প্রশ্নের সঙ্গে কখনো কখনো যুক্ত হয় আরও ব্যক্তিগত প্রশ্ন, যার সঙ্গে নাগরিক হিসেবে তাঁর বৈধ অধিকার পাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।


ফাতিমা জাহান মনে করেন, নারীদের সামাজিকভাবে পদে পদে অকারণে হেয় বা হয়রানির শিকার হতে হয়। তাঁদের চলার পথ এমনিতেই কণ্টকাকীর্ণ। অথচ সংবিধান ও আইন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নাগরিকের অধিকার স্বীকার করে।


তাঁর বক্তব্যে তাই শুধু একটি ঘটনার প্রতিবাদ নেই; আছে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের দাবি।


বিয়ে না করা কোনো অপরাধ নয়


একজন নারী বিয়ে করবেন কি না, কখন করবেন, আদৌ করবেন কি না—এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। একইভাবে বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামী হারানোর পর তাঁর জীবন থেমে যায় না। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অবিবাহিত, ডিভোর্সি কিংবা বিধবা নারীদের এখনও নানা ধরনের প্রশ্ন, কটূক্তি, সন্দেহ ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়।


ফাতিমা জাহানের মতে, এ জায়গায় শুধু সামাজিক সচেতনতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর আইনি সুরক্ষাও। তাঁর দাবি, “নতুন আইন তৈরি করতে হবে, যাতে অবিবাহিত, ডিভোর্সি বা বিধবা নারীদের সামাজিকভাবে যেন কেউ হেনস্তা না করে।”


এই বক্তব্যের ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—একজন নারীর সামাজিক পরিচয় কি তাঁর নাগরিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে?


উত্তরটি হওয়ার কথা—না।


একজন নারী বিবাহিত কি না, তাঁর ভ্রমণপথ, পেশা, শিক্ষা, নাগরিক অধিকার কিংবা মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, যেখানে নারীকে প্রথমে একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে দেখা হবে; তাঁর বৈবাহিক পরিচয় দিয়ে তাঁর অধিকারকে মাপা হবে না।


তিন নারীর নেপালযাত্রা আটকে দেওয়ার অভিযোগ তাই কেবল একটি ভ্রমণের ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামনে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নটি দাঁড় করিয়ে দেয়—নারী কি নিজের জীবন ও চলার পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো স্বাধীন, নাকি তাঁর সিদ্ধান্তের বৈধতা নির্ধারণ করবে তাঁর বৈবাহিক পরিচয়?

sidebar ad