নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে অনুপস্থিত থাকার হার অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অপমান, ভয়, হুমকি ও সহপাঠীদের নির্যাতন একটি শিশুর শিক্ষাজীবনকে কীভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, তারই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে।
স্কুলে যাওয়ার কথা শুনলে একটি শিশুর চোখেমুখে আনন্দ ফুটে ওঠার কথা। সেখানে থাকবে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর উচ্ছ্বাস, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, খেলাধুলা আর স্বপ্ন দেখার সুযোগ। কিন্তু কোনো কোনো শিশুর কাছে স্কুল মানেই আতঙ্ক। শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই বিদ্রূপের শিকার হতে হবে, সহপাঠীরা হাসাহাসি করবে, কেউ ধাক্কা দেবে কিংবা অপমানজনক নামে ডাকবে—এমন আশঙ্কায় স্কুলে যাওয়ার আগ্রহই হারিয়ে ফেলে তারা। কারও কাছে প্রতিদিনের স্কুলযাত্রা হয়ে ওঠে মানসিক চাপ আর অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতা।
এই পরিস্থিতির নাম বুলিং বা সহপাঠীদের দ্বারা ধারাবাহিকভাবে হয়রানি ও নিপীড়ন। বিষয়টি অনেকের কাছে নিছক দুষ্টুমি, মজা কিংবা শিশুদের পারস্পরিক খুনসুটি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যে আচরণ একটি শিশুকে ভয় পাইয়ে দেয়, অপমানিত করে কিংবা অন্যদের সামনে হেয় করে, তার প্রভাব মোটেও হালকা নয়। এই আচরণ শিশুটির আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে, পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে এবং একসময় তাকে স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
বুলিংয়ের শিকার হলে স্কুলে অনুপস্থিতির ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি
OECD-এর PISA 2015 তথ্য অনুযায়ী, আগের দুই সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চার দিন স্কুলে অনুপস্থিত ছিল নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার ৯.২ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৪.১ শতাংশ। অর্থাৎ, দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান ৫.১ শতাংশ পয়েন্ট; নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার প্রায় ২.২৪ গুণ।
এই পরিসংখ্যান শুধু স্কুল কামাইয়ের হিসাব নয়। এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়, অপমান, একাকিত্ব এবং নিরাপদ পরিবেশে শেখার সুযোগ হারানোর অভিজ্ঞতা। স্কুলে যাওয়ার কথা ভেবেই যদি একটি শিশুর মনে আতঙ্ক তৈরি হয়, তাহলে তার শিক্ষার অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত থাকছে—সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: এই তথ্য বুলিং ও স্কুলে অনুপস্থিতির মধ্যে সম্পর্ক দেখায়; শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বলা যায় না যে প্রতিটি অনুপস্থিতির একমাত্র কারণ বুলিং। তবু নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপস্থিতির এত বড় ব্যবধান উদ্বেগজনক।
যে আচরণকে ‘মজা’ বলা হয়, সেটিই হতে পারে নির্যাতন
বুলিং সব সময় শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে ঘটে না। কাউকে বারবার অপমান করা, চেহারা বা শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রূপ করা, পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করা, দল থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া, হুমকি দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক ছবি ও মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়াও বুলিংয়ের অংশ হতে পারে।
অনেক সময় এসব আচরণ প্রকাশ্যে ঘটে, আবার কখনো শিক্ষক বা অভিভাবকদের আড়ালে। ভুক্তভোগী শিশুটি হয়তো প্রতিবাদ করতে পারে না। সে ভয় পায়, অভিযোগ করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কখনো মনে করে, কেউ তার কথা বিশ্বাস করবে না। আবার কখনো নিজের অপমানের কথা পরিবারকে জানাতেও লজ্জা পায়।
এভাবেই নীরবে চলতে থাকে নির্যাতন। আশপাশের মানুষ ঘটনাটিকে তুচ্ছ মনে করলেও শিশুটির কাছে সেটি হয়ে উঠতে পারে প্রতিদিনের দুশ্চিন্তার কারণ।
বুলিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অনেক ক্ষেত্রে বারবার ঘটে এবং ভুক্তভোগী শিশুটি নিজেকে অসহায় মনে করে। তাই শিশুদের স্বাভাবিক মতবিরোধ বা একবারের ঝগড়ার সঙ্গে ধারাবাহিক হয়রানিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। পরিস্থিতির ধরন বুঝে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্কুলে অনুপস্থিতির আড়ালে থাকতে পারে গভীর সংকট
একটি শিশু হঠাৎ স্কুলে যেতে না চাইলে অভিভাবকেরা অনেক সময় ধরে নেন, সে পড়াশোনায় অমনোযোগী, অলস কিংবা স্কুল ফাঁকি দেওয়ার অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু শিশুটির আচরণের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
স্কুলে যাওয়ার আগে পেটব্যথা বা মাথাব্যথার অভিযোগ করা, ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, বন্ধুদের এড়িয়ে চলা, স্কুলের কথা উঠলে অস্বস্তি প্রকাশ করা কিংবা পড়াশোনার ফলাফলে আকস্মিক অবনতি—এসব পরিবর্তন কখনো কখনো মানসিক চাপের ইঙ্গিত হতে পারে। অবশ্য এসব লক্ষণের অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই অনুমান করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিশুটির সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া উচিত।
তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিজেকে বাইরের মানুষ বা বিচ্ছিন্ন মনে করার হারও অনেক বেশি। অর্থাৎ, শিশুটি শুধু নির্যাতনের শিকারই হচ্ছে না; সে যে পরিবেশে শেখার কথা, সেখানেই নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে করতে পারে।
একটি শিশুর জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে—যে স্কুল তাকে জ্ঞান, বন্ধুত্ব ও আত্মবিশ্বাস দেওয়ার কথা, সেই স্কুলেই সে যদি নিজেকে অনিরাপদ ও একা মনে করে!
ক্ষতি শুধু উপস্থিতির খাতায় সীমাবদ্ধ নয়
স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে শিশু পাঠদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারায়। কোনো অধ্যায় বুঝতে অসুবিধা হতে পারে, পরীক্ষার প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে, শ্রেণিকক্ষের আলোচনা ও দলগত কাজে অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে। অনুপস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শেখার ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক চাপ। বুলিংয়ের শিকার শিশু অন্যদের সামনে কথা বলতে ভয় পেতে পারে, নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে পারে কিংবা নতুন বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় ভুগতে পারে। কারও ক্ষেত্রে একাকিত্ব ও উদ্বেগ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা শিশুটির আত্মমর্যাদা ও স্কুলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সব শিশুর প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ চুপ করে থাকে, কেউ আবার স্কুল এড়িয়ে চলতে শুরু করে। কিন্তু কোনো শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখা গেলে সেটিকে নিছক অবাধ্যতা বলে উড়িয়ে না দিয়ে তার অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
দায় এড়াতে পারে না স্কুল ও অভিভাবক
বুলিং বন্ধের দায়িত্ব শুধু নির্যাতনকারী শিশুকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্কুলে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী অপমান, ভয়ভীতি বা সহিংসতার শিকার হলে নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারে এবং তার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।
শিক্ষকদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সহপাঠীদের সামনে কাউকে অপমান করা, দলবদ্ধভাবে উপহাস করা কিংবা কোনো শিক্ষার্থীকে ধারাবাহিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগকারী শিশুর পরিচয় ও নিরাপত্তা যথাসম্ভব সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং প্রতিশোধমূলক আচরণের ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
একই সঙ্গে শিশুদের শেখাতে হবে, কাউকে ছোট করা, ভয় দেখানো কিংবা অন্যের দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়। যারা বুলিংয়ের ঘটনা প্রত্যক্ষ করে, তাদেরও নিরাপদ উপায়ে সহায়তা চাওয়া এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব বোঝাতে হবে।
অভিভাবকদেরও সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত খোলামেলা কথা বলা প্রয়োজন। শিশু অভিযোগ করলে প্রথমেই তাকে দোষারোপ করা বা ‘এতটুকু ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কী আছে’ বলা উচিত নয়। বরং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, সে নিরাপদ বোধ করছে কি না জানতে হবে এবং প্রয়োজন হলে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি আচরণ পরিবর্তন, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং দ্বন্দ্ব সমাধানের দক্ষতা শেখানোও গুরুত্বপূর্ণ। তবে গুরুতর বা পুনরাবৃত্ত নির্যাতনের ক্ষেত্রে শুধু বোঝানোই যথেষ্ট নয়; যথাযথ তদন্ত, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের স্কুলগুলোতেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সহপাঠীদের আচরণ, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সচেতনতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে তার কারণ অনুসন্ধানের সময় পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা ও যাতায়াতের অসুবিধার পাশাপাশি বুলিংয়ের সম্ভাবনাও যাচাই করা দরকার।
শিশুদের নিরাপদে শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই স্কুলে বুলিং প্রতিরোধের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্কুল হবে শেখার জায়গা, ভয়ের নয়
একটি শিশুর স্কুলে অনুপস্থিতির পেছনে কখনো থাকে অসুস্থতা, কখনো আর্থিক সংকট, আবার কখনো লুকিয়ে থাকে ভয় ও অপমানের অভিজ্ঞতা। সেই অনুপস্থিতিকে শুধু উপস্থিতির খাতায় একটি দাগ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। বুলিং প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ হলো সমস্যাটিকে স্বীকার করা, ভুক্তভোগী শিশুর কথা শোনা এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো শিশুকে যেন স্কুলে যাওয়ার আগে ভয় নিয়ে ভাবতে না হয়, সহপাঠীদের সামনে অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে না হয়—এ দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবার।