সহপাঠীদের হাতে নিয়মিত বুলিং বা নিপীড়নের শিকার হওয়া শুধু সাময়িক কষ্টের বিষয় নয়; এটি শিশুর স্কুলজীবনে আপনত্বের অনুভূতি, মানসিক সুস্থতা ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ইউনেস্কোর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিজেকে বহিরাগত বা সবার থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হওয়ার হার অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
বিশ্বে স্কুলে নিজেকে বহিরাগত বা বিচ্ছিন্ন মনে করা শিক্ষার্থীর হার, ৪২.৪%| নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার ১৪.৯% নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার নয়|
নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার প্রতি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪২ জন স্কুলে নিজেকে একা বা অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করার কথা জানিয়েছেন। তুলনায়, বুলিংয়ের শিকার নন এমন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি প্রায় ১৫ জন। অর্থাৎ, দুই দলের মধ্যে ব্যবধান ২৭.৫ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে এই পরিসংখ্যান বুলিং ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তুলে ধরে; শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় না যে প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে বুলিংই একমাত্র কারণ।
বুলিংয়ের প্রভাব শুধু মন খারাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়
স্কুলে বুলিং বলতে সাধারণত কোনো শিক্ষার্থীকে বারবার অপমান করা, ভয় দেখানো, শারীরিকভাবে আঘাত করা, নিয়ে ঠাট্টা করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দল থেকে বাদ দেওয়ার মতো আচরণ বোঝায়। অনলাইনেও অপমানজনক বার্তা, ছবি বা গুজব ছড়িয়ে একই ধরনের নিপীড়ন চালানো হতে পারে।
বুলিংয়ের ক্ষতি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। যে শিশুটি প্রতিদিন সহপাঠীদের উপহাসের শিকার হচ্ছে, সে হয়তো মুখে কিছু বলছে না; কিন্তু মনে মনে স্কুলকে অনিরাপদ জায়গা হিসেবে ভাবতে শুরু করতে পারে। সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে ভয় পাওয়া, দলীয় কাজে অংশ নিতে অনীহা, নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ এবং স্কুলে যেতে অস্বস্তি—এসব আচরণ তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা বেশি এবং তাদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর পড়াশোনা বন্ধ করার প্রত্যাশা জানিয়েছে।
কেন শিশুর মনে তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি?
শৈশব ও কৈশোরে বন্ধুত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক শিশুর সামাজিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সময়ে বারবার অপমানিত বা প্রত্যাখ্যাত হলে কোনো শিশু ভাবতে পারে, অন্যরা তাকে পছন্দ করে না কিংবা সে এই দলের অংশ হওয়ার যোগ্য নয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনটি সমস্যা তৈরি হতে পারে:
- আত্মবিশ্বাসে আঘাত: বারবার অপমানিত হওয়ার ফলে শিশু নিজের চেহারা, সামর্থ্য বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
- সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া: নতুন বন্ধু তৈরি করা বা শ্রেণিকক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে ভয় ও দ্বিধা বাড়তে পারে।
- পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া: সহপাঠীদের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ শিশুর শেখার আগ্রহ ও স্কুলে স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে সব শিশু একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। পরিবারের সহায়তা, শিক্ষকদের ভূমিকা, বন্ধুত্ব এবং স্কুলের পরিবেশের ওপরও তাদের অভিজ্ঞতা নির্ভর করতে পারে।
প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
বুলিং বন্ধ করার দায়িত্ব শুধু নিপীড়নের শিকার শিশুর নয়। বরং পরিবার, শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং সহপাঠী—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পরিবারের করণীয়: শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। সে বুলিংয়ের কথা জানালে তাকে দোষারোপ করা বা ‘এত ছোট বিষয় নিয়ে মন খারাপ করছ কেন’ বলা উচিত নয়। বরং কী ঘটেছে, কতবার ঘটেছে এবং সে নিরাপদ বোধ করছে কি না, তা জানতে হবে।
শিক্ষকদের করণীয়: অপমান, হুমকি, শারীরিক আক্রমণ ও ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে একঘরে করার ঘটনাকে নিছক দুষ্টুমি হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
স্কুল কর্তৃপক্ষের করণীয়: বুলিং প্রতিরোধে স্পষ্ট নীতিমালা, গোপনে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ঘটনার পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ থাকা দরকার। শুধু শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
বুলিংকে ছোটখাটো দুষ্টুমি বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ, যেখানে তার কথা শোনা হবে, তার মর্যাদা রক্ষা করা হবে এবং সে অনুভব করবে—এই স্কুলে তারও জায়গা আছে।