ভাবুন তো, একটি শিশু রাস্তায় দেখা অপরিচিত মানুষকেও খুব সহজে আপন করে নিচ্ছে। কারো সঙ্গে কথা বলতে তার দ্বিধা নেই, নতুন মানুষের সঙ্গে মিশতেও ভয় নেই। বরং অন্যদের প্রতি তার আগ্রহ যেন একটু বেশিই। প্রথম দেখায় যে কেউ হয়তো বলবে, “বাহ, কী মিশুক!”
কিন্তু কখনো কখনো এই অতিরিক্ত মিশুক, প্রাণবন্ত ও বন্ধুপরায়ণতার পেছনে
যদি থাকে একটি বিরল জেনেটিক পরিবর্তন?
'উইলিয়াম সিনড্রোম' আক্রান্ত অনেক মানুষের মধ্যেই এমন বৈশিষ্ট্য দেখা
যায়। তবে গল্পটি শুধু তাদের হাসিখুশি ও বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের নয়। এই সুন্দর ব্যক্তিত্বের
আড়ালে থাকে নানা শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু শিশুদের বিষয় নয়। উইলিয়াম সিনড্রোম
নিয়ে জন্ম নেওয়া একজন শিশু বড় হয়ে কিশোর, তরুণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক হন; জেনেটিক পরিবর্তনটি
সারা জীবনই থেকে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার ধরন ও প্রয়োজন বদলাতে পারে, তাই
চিকিৎসা ও সহায়তাও জীবনভর প্রয়োজন হতে পারে।
উইলিয়ামস সিনড্রোম কি?
উইলিয়ামস সিনড্রোম একটি বিরল নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে
প্রায়শই 'উইলিয়ামস-বিউরেন সিনড্রোম' (Williams-Beuren syndrome) বলা হয়। নিউজিল্যান্ডের
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জে. সি. পি. উইলিয়ামস ১৯৬১ সালে এবং জার্মানির শিশু বিশেষজ্ঞ
ডা. এ. জে. বিউরেন ১৯৬২ সালে স্বাধীনভাবে এই সিনড্রোমের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম শনাক্ত
করেন। তাদের দুজনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই যৌথ নামকরণ করা হয়েছে।
এটি কোনো সংক্রমণ বা সাধারণ অসুখ নয়; বরং ক্রোমোজোম ৭-এর একটি নির্দিষ্ট
অংশের জিনগত বিলোপের (deletion) কারণে ঘটে। এই বিলোপটি সাধারণত 7q11.23 অঞ্চলে ঘটে
এবং এতে প্রায় ২৬-২৮টি জিন অনুপস্থিত থাকে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো ইলাস্টিন
জিন। এই ইলাস্টিন এমন একটি প্রোটিন, যা রক্তনালি ও শরীরের বিভিন্ন টিস্যুকে নমনীয় রাখতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উইলিয়ামস সিনড্রোম আনুমানিক প্রতি ৭,৫০০ থেকে ১৮,০০০ জনে ১ জনকে আক্রান্ত করে। যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ জন রয়েছেন।
কারণ ও জিনগত ভিত্তি
উইলিয়াম সিনড্রোম সাধারণত বংশগতভাবে সঞ্চারিত হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই
এটি একটি ডি নভো (de novo) মিউটেশন, অর্থাৎ এটি স্পার্ম বা ডিম্বাণু গঠনের সময় এলোমেলোভাবে
ঘটে যায়। খুব কম ক্ষেত্রে (প্রায় ১%) এটি আক্রান্ত পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে
সঞ্চারিত হতে পারে।
উইলিয়ামস সিনড্রোমে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সন্তান হলে, প্রতিটি গর্ভাবস্থায়
এটি সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। তাই এই সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রজনন সংক্রান্ত
বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাইতে পারেন, যার মধ্যে গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা অথবা প্রি-ইমপ্ল্যান্টেশন
জেনেটিক টেস্টিং অন্তর্ভুক্ত থাকতে
পারে ।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য:
- উইলিয়ামস সিনড্রোমে আক্রান্ত ছোট শিশুদের মুখের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে, যার মধ্যে রয়েছে চওড়া কপাল, চোখের চারপাশে ফোলাভাব, চ্যাপ্টা নাকের ডগা, ফোলা গাল এবং ছোট চিবুক। এই কারণেই একে "এলফিন" বা পরীর মতো মুখ বলা হয়। আক্রান্ত অনেকেরই দাঁতের সমস্যা থাকে, যেমন দাঁত ছোট, ফাঁকা ফাঁকা, আঁকাবাঁকা বা অনুপস্থিত থাকা।
বড় শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত লম্বাটে মুখ, চওড়া মুখ এবং ভরাট
ঠোঁট থাকে।
- সুপ্রাভালভুলার অ্যাওর্টিক স্টেনোসিস (SVAS) নামক এক প্রকার হৃদরোগ উইলিয়ামস সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায়শই দেখা যায়। সুপ্রাভালভুলার অ্যাওর্টিক স্টেনোসিস হলো হৃৎপিণ্ড থেকে শরীরের বাকি অংশে রক্ত বহনকারী বৃহৎ রক্তনালী ( অ্যাওর্টা ) সরু হয়ে যাওয়া। এই অবস্থার চিকিৎসা না করা হলে, অ্যাওর্টার এই সংকীর্ণতার কারণে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা এবং হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।
হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালীর অন্যান্য সমস্যা, যেমন উচ্চ রক্তচাপ ( হাইপারটেনশন ) এবং রক্তনালী শক্ত হয়ে যাওয়ার কথাও জানা
গেছে। উইলিয়ামস সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অ্যানাস্থেসিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে
জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে।
- রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, যা শিশুদের
মধ্যে খিঁচুনি এবং বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে।
- এছাড়াও আরো যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন বিকাশে দেরি, সাধারণত মৃদু মাত্রার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা
বা শেখার সমস্যা, মনোযোগের সমস্যা বা এডিএইচডি (ADHD), খাওয়ানোতে সমস্যা, হাইপারকিউসিস
(শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা), পেশীর দুর্বলতা, জয়েন্টের শিথিলতা এবং কিডনির
সমস্যাও দেখা দেয়।
উইলিয়ামস সিনড্রোমে আক্রান্ত প্রায় ৯০% ব্যক্তি শ্রবণ অতিসংবেদনশীলতা
অনুভব করেন । শব্দের প্রতি
এই অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা অনেকের জন্য দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তির কারণ হতে পারে। হঠাৎ
জোরে শব্দ, মেশিনের আওয়াজ বা ভিড়ের পরিবেশ তাদের জন্য অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি বিরক্তিকর
হতে পারে।
এত বন্ধুত্বপূর্ণ কেন?
উইলিয়াম সিনড্রোমের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর আচরণগত
ধরন। এই সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্যতম প্রধান এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের
অত্যধিক বন্ধুত্বপূর্ণ ও সামাজিক আচরণ (Hypersociability)। তারা সাধারণত অত্যন্ত বহির্মুখী,
মিশুক এবং পরোপকারী স্বভাবের হয়ে থাকে।অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও সহজে কথা বলা বা তাদের
খুব দ্রুত বিশ্বাস করার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোনো
ভয় বা সংকোচ থাকে না, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে "Social Fearlessness" বা সামাজিক
নির্ভীকতা নামে পরিচিত।
তাদের মধ্যে সহানুভূতিও প্রবল হতে পারে। কেউ দুঃখী বা আনন্দিত হলে তারা
খুব দ্রুত সেই আবেগ বুঝতে পারেন এবং নিজেরা তা গভীরভাবে অনুভব করেন। মানুষের মুখের
হাসিমুখের অভিব্যক্তি তাদের খুব বেশি আকৃষ্ট করে।
শুধু তাই নয়, বৌদ্ধিক বা শেখার
ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা (Intellectual disability) থাকলেও, এদের কথা বলার ক্ষমতা
বা মৌখিক দক্ষতা সাধারণত বেশ ভালো হয়। তারা খুব সুন্দর করে, বিনীতভাবে এবং আকর্ষণীয়
ভঙ্গিতে অন্যদের সাথে গল্প করতে পছন্দ করেন।
সংগীত যেন তাদের আলাদা এক জগৎ
এইসব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংগীত কেবল একটি বিনোদন নয়, বরং এটি তাদের আবেগ
প্রকাশ ও যোগাযোগের এক অনন্য জগৎ। এই দুর্লভ জেনেটিক কন্ডিশনে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তীব্র
বুদ্ধিবৃত্তিক বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সুর, তাল ও সংগীতের প্রতি এক অবিশ্বাস্য
টান এবং গভীর অনুভূতি প্রদর্শন করেন।
উইলিয়ামস সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের অনেক বাবা-মা এখানে একটি আকর্ষণীয়
কিন্তু সমস্যাজনক বৈপরীত্য লক্ষ্য করেন। তাদের
সন্তান হয়তো ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ড্রিল মেশিন বা বজ্রপাতের মতো শব্দ শুনে আতঙ্কিত
হয়, অথচ সঙ্গীতে সম্পূর্ণ মুগ্ধ হয়ে যায়। এই “শ্রবণগত বৈপরীত্য” ঘটে কারণ উইলিয়ামস
সিনড্রোমে আক্রান্ত মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে শব্দ প্রক্রিয়াকরণ করার জন্য গঠিত। যেখানে
তারা অতি সক্রিয় শ্রবণতন্ত্রের কারণে আকস্মিক বা যান্ত্রিক শব্দে ভীত হয়ে পড়ে, সেখানে
এই একই কান সংগীতের ছন্দে, সমস্ত ভয় ভুলে সেই সুরের মাঝে ডুবে যায়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
উইলিয়াম সিনড্রোমের ক্ষেত্রে চিকিৎসক সাধারণত শিশুর শারীরিক বৈশিষ্ট্য,
বিকাশ, আচরণ এবং চিকিৎসা-ইতিহাস বিবেচনা করেন। লক্ষণ দেখলে ডাক্তাররা নিশ্চিত হওয়ার
জন্য নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন। সাধারণত ফ্লুরোসেন্স ইন সিটু
হাইব্রিডাইজেশন (FISH) পরীক্ষার মাধ্যমে ক্রোমোজোম ৭-এর নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিলোপ শনাক্ত
করা হয়। এছাড়াও মাইক্রোঅ্যারে বা মাল্টিপ্লেক্স লাইগেশন-ডিপেনডেন্ট প্রোব অ্যামপ্লিফিকেশন
(MLPA) পরীক্ষার মাধ্যমে জিনগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা যায়।
রোগ নির্ণয়ের পর শুধু জেনেটিক পরীক্ষা করেই থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। হৃদ্যন্ত্র,
রক্তচাপ, ক্যালসিয়ামের মাত্রা, কিডনি, শ্রবণ, দৃষ্টি, বিকাশ ও আচরণ—প্রয়োজন অনুযায়ী
এসব বিষয়ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
উইলিয়াম সিনড্রোমের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই, যা জেনেটিক পরিবর্তনটি
দূর করে দিতে পারে। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করা, জটিলতা প্রতিরোধ
করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে তোলা।
প্রাথমিক ধাপে শিশুদের জন্য কথা বলা এবং ভাষা শেখার সমস্যা দূর করতে স্পিচ
থেরাপি, পেশির দুর্বলতা এবং জয়েন্টের শক্ত ভাব দূর করে হাঁটাচলা ও শারীরিক গঠনে উন্নতি
আনয়নে ফিজিওথেরাপি এবং দৈনন্দিন কাজ (যেমন- খাওয়া, জামা পরা) নিজে নিজে করার দক্ষতা
বাড়াতে অকুপেশনাল থেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার জন্য নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন। গুরুতর ক্ষেত্রে
অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেশি থাকলে চিকিৎসকের
পরামর্শে কম ক্যালসিয়াম ও কম ভিটামিন ডি-যুক্ত বিশেষ ডায়েট চার্ট অনুসরণ করতে হয়।
এছাড়াও, উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ বা মনোযোগের অভাবের (ADHD) জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া
হয়।
স্কুলে এই শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাক্রম তৈরি করে তাদের শেখার ক্ষমতা
বাড়ানো যায়। অতিরিক্ত সামাজিকতা বা অপরিচিত মানুষের সাথে দ্রুত মিশে যাওয়ার প্রবণতা
নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
উইলিয়াম সিনড্রোমের মানুষকে শুধু 'অতিরিক্ত বন্ধুত্বপূর্ণ', 'সংগীতপ্রিয়'
কিংবা 'বিশেষ চেহারার' মানুষ হিসেবে দেখলে গল্পের বড় অংশটাই বাদ পড়ে যায়। কারও ভাষাগত
দক্ষতা ভালো হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ পরিচালনায় সমস্যা থাকতে পারে।
কেউ মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশতে পারে, কিন্তু সেই সরল বিশ্বাসই তাকে বিপদে ফেলতে
পারে। কেউ গান অসাধারণ ভালোবাসতে পারে, আবার তীব্র শব্দ অস্বস্তিতেও ভোগাতে পারে।
অর্থাৎ, উইলিয়াম সিনড্রোম কোনো মানুষের পুরো পরিচয় নয়—এটি তার জীবনের
একটি অংশ। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন স্কুল এবং পারিবারিক কার্যকলাপের গণ্ডি পেরিয়ে
প্রাপ্তবয়স্ক হন, তখন তারা প্রায়শই তীব্র একাকীত্ব অনুভব করেন, যা উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা
বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই প্রয়োজন সহানুভূতির পাশাপাশি সঠিক বোঝাপড়া। এটাই তাদের জীবনকে
অনেক বেশি স্বাভাবিক ও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র :
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (এনআইএইচ)।
মেডলাইনপ্লাস জেনেটিকস।
ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর রেয়ার ডিজঅর্ডারস (এনওআরডি)।
ঢাকা/টিএ