‘কথা শুনছে না’, ‘একটু কিছু বললেই রেগে যাচ্ছে’, ‘মোবাইল নিতে চাইলে চিৎকার করছে’, ‘সামান্য বিষয়েও জেদ করছে’—এমন অভিযোগ এখন অনেক বাবা-মায়ের মুখেই শোনা যায়। অনেকের মনে প্রশ্ন, আগের তুলনায় এখনকার শিশুরা কি সত্যিই বেশি রাগী?
বিষয়টি এতটা সরল নয়। শিশুর রাগকে শুধু ‘বদমেজাজ’ বা ‘অবাধ্যতা’ হিসেবে দেখলে সমস্যার আসল জায়গাটি ধরা পড়ে না। অনেক সময় রাগ হচ্ছে শিশুর অপ্রকাশিত কষ্ট, হতাশা, ভয়, ক্লান্তি কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের ভাষা।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা UNICEF বলছে, শিশুরা সবসময় নিজেদের অনুভূতি বা চাপের কারণ স্পষ্টভাবে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে তারা বিরক্তি, রাগ, কান্না বা আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।
প্রথমেই মনে রাখা দরকার—রাগ একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। শিশুরাও রাগ করবে, হতাশ হবে, জেদ করবে। সমস্যা তখনই, যখন রাগ এত ঘন ঘন বা তীব্র হয়ে ওঠে যে তা শিশুর পড়াশোনা, ঘুম, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে শুরু করে।
বিশেষ করে ছোট শিশুরা এখনো আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা পুরোপুরি অর্জন করে না। তারা কী চাইছে, কেন কষ্ট পেয়েছে কিংবা কেন হতাশ—এসব বোঝানোর ভাষা তাদের নাও থাকতে পারে। তাই অনেক সময় কান্না, চিৎকার হয়ে ওঠে তাদের যোগাযোগের মাধ্যম।
১. শিশুর ওপর বাড়ছে মানসিক চাপ: স্কুলের পড়াশোনা, পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, পারিবারিক পরিবর্তন—সবকিছুই শিশুর জন্য চাপের কারণ হতে পারে। UNICEF-এর মতে, পরিবারে টানাপোড়েন, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, বাসা বা স্কুল পরিবর্তন, আর্থিক সমস্যা, বন্ধুত্বের সমস্যা এবং অনিরাপদ পরিবেশ শিশুর স্ট্রেস বাড়াতে পারে। এই স্ট্রেসের একটি প্রকাশ হতে পারে রাগ ও আচরণগত পরিবর্তন।
২. মোবাইল-স্ক্রিন কি রাগ বাড়াচ্ছে: এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। ‘মোবাইল ব্যবহার করলেই শিশু রাগী হয়ে যায়’—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। কিন্তু অতিরিক্ত বা অনুপযুক্ত ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক যোগাযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।
American Academy of Pediatrics-এর HealthyChildren.org বলছে, ছোট শিশুরা এখনো রাগ, হতাশা ও অপেক্ষা করার মতো অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে। তাই দীর্ঘ সময় ডিজিটাল মিডিয়ায় থাকার পর স্ক্রিন বন্ধ করতে বললে তাদের মধ্যে বিরক্তি, রাগ দেখা দিতে পারে।
AAP-এর সাম্প্রতিক নীতিগত ব্যাখ্যাতেও অনুপযুক্ত ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহারের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর ঘুম, কম শারীরিক কর্মকাণ্ড, পরিবারের সঙ্গে কম সময় এবং ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি angry outbursts-এর মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘মোবাইল’ নয়; বরং মোবাইলের কারণে শিশুর ঘুম, খেলাধুলা, বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ ও পারিবারিক সময় কমে যাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ঘুম কম হলে মেজাজও খিটখিটে হয়: একটি ক্লান্ত শিশু সবসময় ঘুমঘুম দেখাবে—এমন নয়। কখনো সে অস্বাভাবিক চঞ্চল, বিরক্ত বা রাগীও হয়ে উঠতে পারে। UNICEF ৬–১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য সাধারণভাবে ৯–১২ ঘণ্টা এবং কিশোরদের জন্য ৮–১০ ঘণ্টা ঘুমের কথা উল্লেখ করেছে। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর স্ট্রেস মোকাবিলা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাতে দেরি করে মোবাইল দেখা, অনিয়মিত ঘুম বা ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর আচরণে প্রভাব ফেলছে কি না, বাবা-মাকে সেটিও দেখতে হবে।
৪. বাবা-মায়ের আচরণও শিশুর আয়না: শিশুরা শুধু আমাদের কথা শোনে না, আমাদের আচরণও শেখে। বাড়িতে যদি নিয়মিত চিৎকার, উত্তেজনা, ঝগড়া কিংবা কঠোর শাসনের পরিবেশ থাকে, শিশুর ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। UNICEF বলছে, ঘন ঘন পারিবারিক বিরোধ ও নেতিবাচক পরিবেশ শিশুদের মধ্যে চাপ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র চাপ শিশুর রাগ ও উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এমনকি বাবা-মা নিজেরা কীভাবে রাগ সামলান, সেটিও শিশুর জন্য একটি ‘লাইভ মডেল’। বাবা রেগে গিয়ে চিৎকার করলে শিশু শিখতে পারে—রাগ প্রকাশের স্বাভাবিক উপায়ই হলো চিৎকার। বিপরীতে বাবা-মা যদি বিরতি নেন, গভীর শ্বাস নেন এবং শান্তভাবে কথা বলেন, শিশুও ধীরে ধীরে সেই কৌশল শিখতে পারে।
৫. ‘ভালো ছেলে/মেয়ে’ হওয়ার চাপ: অনেক সময় আমরা শিশুর কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করি, যা তার বয়স ও মানসিক বিকাশের তুলনায় বেশি। সবসময় প্রথম হতে হবে, পরীক্ষায় ভালো করতে হবে, ভুল করা যাবে না, বড়দের কথা প্রশ্ন না করে শুনতে হবে—এমন প্রত্যাশা শিশুর ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করতে পারে। হার্ভার্ডের Center on the Developing Child-এর মতে, শিশুর মস্তিষ্ক ও আচরণ সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে এবং নিরাপদ, স্থিতিশীল পরিবেশ ও যত্নশীল বড়দের সঙ্গে responsive interaction শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত চাপ এই বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে।
রাগী শিশুকে কীভাবে সামলাবেন?
রাগের মুহূর্তে দীর্ঘ বক্তৃতা বা শাস্তি সাধারণত সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। প্রথমে শিশুকে শান্ত হতে সাহায্য করা জরুরি।
কিছু সহজ কৌশল—
শিশুর অনুভূতিকে অস্বীকার না করে বলুন, ‘তুমি খুব রেগে গেছ, আমি বুঝতে পারছি।’ রাগের কারণ জানতে শান্তভাবে প্রশ্ন করুন। ‘রাগ করা যাবে না’ না বলে শেখান কীভাবে রাগ প্রকাশ করা যায়।
নিয়ম ও সীমা স্পষ্ট রাখুন, কিন্তু অপমান বা ভয় দেখিয়ে নয়। প্রতিদিন কিছু সময় শুধু শিশুর সঙ্গে কথা বলা ও খেলার জন্য রাখুন। বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও জায়গা নিয়ে পরিবারের সবাই মিলে নিয়ম করুন। শিশুকে নিয়মিত খেলাধুলা ও বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ দিন। শিশুর সামনে বাবা-মায়ের চিৎকার ও ঝগড়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
UNICEF-এর পরামর্শও হলো—শিশুর অনুভূতির নাম দিতে সাহায্য করা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বিচার না করে তার দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা।
শাস্তি নয়, আগে বুঝতে হবে। শিশু রেগে গেলে অনেক বাবা-মায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়—‘চুপ করো’, ‘এভাবে কথা বলবে না’, ‘আর একবার করলে মেরে দেব।’ কিন্তু শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করা শিশুকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখায় না। বরং UNICEF-এর ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ কোটি শিশু—প্রতি ১০ জনে প্রায় ৬ জন—নিয়মিত মানসিক আগ্রাসন বা শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। সংস্থাটি শিশুর বিকাশে খেলাধুলা, উদ্দীপনা ও বাবা-মায়ের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগের গুরুত্বও তুলে ধরেছে।