আজ বিশ্ব মেজো সন্তান দিবস: বড়টির দায়িত্ব, ছোটটির আদর- মাঝেরটির কি?

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬

সংগৃহীত
সংগৃহীত

বাড়িতে যদি তিন ভাই-বোন থাকে, তাহলে তাদের পরিচয়ের পর্বটি হয় বেশ মজার। বড়জনের পরিচয় হয়  “আমাদের প্রথম সন্তান।” ছোটজন, "আমাদের আদরের ছোট্টটা।” আর মাঝেরজন?

“ও? ও তো মাঝেরটা!”  যেনো কাবাব মে আস্ত এক হাড্ডি।  


মজা করে বলা হলেও মাঝের সন্তানের গল্পটা যেনো কিছুটা আলাদাই হয়।  পরিবারের প্রথম সন্তান, পরিবারের প্রথম স্বপ্ন হয়ে বেড়ে উঠে। ছোটটি পায় সবচেয়ে ছোট হওয়ার সুবিধা। আর মাঝের সন্তান, যেন গল্পের সেই চরিত্র, যে সবসময় গল্পে থেকেও তাকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা হয়ে ওঠেনা।  


পরিবারের সেসব মেজো সন্তানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার উদ্দেশ্যে  প্রতি বছর ১২ই আগস্ট "ন্যাশনাল মিডল চাইল্ড ডে"  পালন করা হয়। 


১৯৮০-র দশকে এলিজাবেথ ওয়াকার এর সূচনা করেন। শুরুতে এটি আগস্ট মাসের দ্বিতীয় শনিবার পালন করা হলেও সময়ের সাথে সাথে ১২ই আগস্ট দিনটি পালন করার বিষয়টি সর্বজনগৃহীত হয়ে ওঠে। 

তার নাতি লিটন ওয়াকার তৃতীয়-এর পাঠানো একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধে ওয়াকার উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি এমন একটি জাতীয় দিবস প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন যা সেইসব শিশুদের সম্মান জানাবে যারা পরিবারের মাঝখানে জন্ম নিয়েছে এবং যাদের তিনি "উপেক্ষিত" বলে মনে করতেন। 


মাঝের সন্তানদের নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, তারা নাকি পরিবারের মধ্যে কিছুটা অবহেলিত বোধ করে। পরিবারে সাধারণত বড় সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের বিশেষ মনোযোগ থাকে এবং ছোট সন্তান পায় অতিরিক্ত আদর। ফলে মাঝের সন্তানরা অনেক সময় একধরনের একাকীত্ব বা "মিডল চাইল্ড সিন্ড্রোম"- এ ভোগেন। 


কি এই মিডল চাইল্ড সিনড্রোম? 

যদিও "সিনড্রোম" শব্দটি শুনলে মনে হতে পারে যে এটি কোনো চিকিৎসাগত বা মনস্তাত্ত্বিক রোগ বা সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত, আসলে এটি কোনো রোগ বা ব্যাধি নয় এবং এর কোনো একক বা সর্বজনস্বীকৃত চিকিৎসাগত সংজ্ঞা নেই।

এটি হল সেই অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা, যা পরিবারের মেজো সন্তানরা অনুভব করে; তারা মনে করে যে পরিবারের কাঠামোতে তাদের অবস্থান বড় ও ছোট ভাই-বোনদের অবস্থানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। 


মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলার জন্মক্রমের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পারিবারিক বিন্যাসে একটি শিশুর জন্মের ক্রম বা অবস্থান, তার সাথে কেমন আচরণ করা হবে এবং তাদের ব্যক্তিত্ব কেমন হবে তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, 'মিডল চাইল্ড সিনড্রোম'-এর ধারণা অনুযায়ী, সবার বড় সন্তান সাধারণত নেতা বা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনকারী হিসেবে পরিচিত হয়। অন্যদিকে, সবার ছোট সন্তান পরিবারের 'ছোট সদস্য' বা আদরের পাত্র হিসেবে পরিচিতি পায়। ফলে, মেজো সন্তানের ভূমিকাটি অনেক সময় অস্পষ্ট বা অনির্ধারিত থেকে যায়।


কিন্তু দেখা গেছে যে, ভাইবোনদের মধ্যে মেজো সন্তানরাই সবচেয়ে সুবোধ বা ভালো আচরণের অধিকারী হয়ে থাকে। ১৯৬৪ ও ২০০৯ সালে পরিচালিত দুটি ভিন্ন গবেষণায় বলা হয় যে, মেজো সন্তানদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল বা অবাধ্য আচরণ করার প্রবণতা সবচেয়ে কম  থাকে।


মেজো সন্তানরা সাধারণত বিনয়ী, সৎ এবং সবার সাথে সহজে মানিয়ে চলতে পারা স্বভাবের হয়ে থাকে। পরিবারে তারা তুলনামূলক কম মনোযোগ পায় এবং তাদের ভূমিকাও অনেক সময় সুনির্দিষ্ট থাকে না; আর এই পরিস্থিতির কারণেই ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে উচ্চমাত্রার স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে। 


এছাড়াও, মাঝের সন্তানকে অনেক সময় বড়টির সঙ্গে তুলনা করা হয়, আবার ছোটটির সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয় বাবা-মায়ের মনোযোগ। আর সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে কিছু দারুণ দক্ষতা।

পরিবারের সবার মধ্যে সুসম্পর্ক ও শান্তি বজায় রাখার খাতিরে মধ্যস্থতাকারী, নমনীয়তা ও সমঝোতা— এসব গুণ অনেক মাঝের সন্তানের ব্যক্তিত্বে দেখা যেতে পারে। ব্যক্তিত্ব বিষয়ক একটি গবেষণায় এ-ও দাবি করা হয়েছে যে, মেজো সন্তানরা সাধারণত শৈল্পিক ও সৃজনশীল স্বভাবের হয়ে থাকে।


তবে, ব্যক্তিত্ব বিষয়ক পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞদের মতামত যা-ই হোক না কেন, এই দিনটি আমাদের মনোযোগ মেজো সন্তানের দিকে ফেরাতে উদ্বুদ্ধ করে। এই দিনটিতে বাবা-মা ও ভাই-বোনদের উচিত মেজো সন্তানের জন্য বিশেষ কিছু করা; পরিবারে তাদের গুরুত্ব বুঝানো, বিশেষ অনুভব করানো। 


জাতীয় মেজো সন্তান দিবস যেভাবে পালন করবেন:

১২ই আগস্ট তারিখে পরিবারের মেজো সন্তানকে, যিনি পারিবারিক 'স্যান্ডউইচ'-এর মাঝখানের মূল অংশ, তাকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিন। এটি হয়তো খুব আনুষ্ঠানিক কোনো দিবস নয়। কিন্তু উপলক্ষটা মন্দ নয়। নিচের পরামর্শগুলো কাজে লাগাতে পারেন:


- তাদের পছন্দের কোনো ঘরোয়া খাবার তৈরি করুন এবং তাদের নিমন্ত্রণ জানান।

- একটি কার্ড পাঠান এবং তাদের সাথে জড়িত কোনো স্মৃতি শেয়ার করুন। 

- তাদের দিনটি কেমন কাটল তা জানতে ফোন করুন। আপনি যদি সাধারণত তাদের ফোন না করে থাকেন, তবে এই কাজটি করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

- আপনার মেজো সন্তানেরও যদি কোনো মেজো সন্তান (অর্থাৎ আপনার নাতি বা নাতনি) থাকে, তবে সবাই মিলে কোনো একটি দিন বিভিন্ন কার্যকলাপে কাটানোর পরিকল্পনা করতে পারেন।

- অন্যদের জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় #NationalMiddleChildDay হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে পোস্ট করুন। আর সকলকে জানিয়ে দিন সে আসলেই স্পেশাল। 


সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যপট যে এক হবে তা নয়। মাঝখানে থাকাই মানে যে সবার আড়ালে থাকা, তা কিন্তু নয়।  বরং কখনো কখনো মাঝের অবস্থান হতে পারে দুই দিকের ভালোবাসাকে একসংগে পাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। 


জনপ্রিয় সিরিজ "দ্য মিডেল" এর মেজো সন্তান স্যু হেকের বলা কথাটিও যেন বিষয়টিকে দারুণভাবে তুলে ধরে। তার ভাষায়, “আমি মেজো হয়ে সবসময় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছি, কারণ আমার একজন বড় ভাই এবং একজন ছোট ভাই আছে। মাঝখানটাই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা—দুই দিক থেকেই ভালোবাসা পাওয়া যায়।”

sidebar ad