কম আঁচে রান্না করলে কী গ্যাসের খরচ কমে?

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬

কম আঁচে রান্না করলে কী গ্যাসের খরচ কমে?

সকালের চা বানানোর জন্য চুলায় কেটলি চাপিয়েছেন। কিন্তু আগুন এতটাই কম যে এক কাপ চা বানাতেই লেগে যাচ্ছে অনেকটা সময়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলমান গ্যাস সংকট এখন অনেক পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বাসা-বাড়িতে গ্যাসের সংকট,  মাস শেষে সিলিন্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার শংকা এমন আমাদের অনেকেরই নিত্যদিনের গল্প।  আর এসব থেকেই মনে প্রশ্ন জাগে,  চুলার আঁচ কমিয়ে রান্না করলে কি গ্যাসের খরচও কমে? অনেকে মনে করেন, কম আঁচ মানেই কম গ্যাস। আবার অনেকের মতে, এতে শুধু রান্নার সময় দীর্ঘায়িত হওয়ায়  উল্টো গ্যাস বেশি খরচ হয়। তাহলে সত্যিটা কী?


চুলার আঁচ যত বেশি থাকে, প্রতি মিনিটে তত বেশি গ্যাস পোড়ে। তাই সেই হিসেবে বলা যায় যে,কম আঁচে চুলা জ্বালালে অবশ্যই গ্যাসের ব্যবহার কম হয়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। কম আঁচে খাবার সিদ্ধ হতে যদি অনেক বেশি সময় লাগে, তাহলে কিন্তু  মোট গ্যাসের খরচ প্রায় একই থাকতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বেড়েও যেতে পারে। অর্থাৎ শুধু আঁচ কমিয়ে দিলেই যে গ্যাস সাশ্রয় হবে, এমন ধারণাও সব সময় ঠিক নয়। কী রান্না করছেন, কীভাবে রান্না করছেন এবং কতক্ষণ চুলা জ্বলছে; এসব বিষয়ও কিন্তু ঠিক করে দেয় আপনার গ্যাস কতটা সাশ্রয় হবে। 



কম আঁচের রান্না-


কিছু খাবার আছে যেগুলো কম আঁচে ও ধীরে ধীরে রান্না করা যায়। এতে স্বাদও ভালো হয়, অযথা গ্যাসও নষ্ট হয় না। যেমন-

- ডাল ও পাতলা স্যুপ

- খিচুড়ি

- মাংস বা মাছের ঝোল

- বিভিন্ন ধরনের স্ট্যু

- ডিম সেদ্ধ বা পোঁচ


এসব ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োজনীয় তাপ দিয়ে পরে আঁচ কমিয়ে দিলে গ্যাসের অপচয় কম হয়।


কখন বেশি আঁচ প্রয়োজন? 


বেশি আঁচে বা উচ্চ তাপে সাধারণত -

- স্টেক

- বারবিকিউ ও গ্রিল

- বিভিন্ন ভাজাপোড়া যেমন, লুচি, পুরী, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই

- নুডুলস ও সবজি স্টির-ফ্রাই

এছাড়াও, পানি দ্রুত ফোটাতে কিংবা শুরুতে মাংস বা ডাল ফুটিয়ে তুলতে বেশি আঁচের প্রয়োজন। তবে ফুটিয়ে ওঠার পরও যদি একই তাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে অতিরিক্ত গ্যাস অপচয় হয়। 


কেনো কম আঁচে রান্না করবেন? 


শুধু গ্যাস সাশ্রয় নয়, একাধিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, কম আঁচে রান্না করা খাবার অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। সর্বাধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার একমাত্র নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রাতে রান্না করা হয়। এতে খাবারের পুষ্টিগুণ বজায় থাকে এবং অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে, যার ফলে খাবার স্বাস্থ্যকর ও আরও সুস্বাদু হয়। এছাড়াও -


- কম আঁচে রান্না করলে উপাদানগুলোর পুষ্টিগুণ বজায় রাখার পাশাপাশি ফল ও শাকসবজিতে উপস্থিত ভিটামিন এবং ফাইটো নিউট্রিয়েন্টসকে ঠিক রাখে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এই উপাদানগুলোর পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে।

- তাপ অপচয় রোধ করা যায়। গ্যাসের সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় যখন আগুনের শিখা পাতিলের চারপাশে বেরিয়ে যায় আর সেই তাপ বাতাসের সাথে মিশে অপচয় হয়। কম আঁচে শিখা কেবল পাতিলের তলায় সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে সর্বোচ্চ পরিমাণ তাপ রান্নায় ব্যবহৃত হয়।

- বেশি তাপমাত্রায় রান্না করা সবজির তুলনায় কম তাপমাত্রায় রান্না করা সবজিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বেশি থাকে। তাই, রান্নায় কম তাপমাত্রার কৌশল  প্রকৃতপক্ষে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অবদান রাখতে পারে। 

- কিছু খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে অ্যাক্রিলামাইড নামক একটি রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। অ্যাক্রিলামাইড রং, কাগজ, প্লাস্টিক তৈরিতে, বর্জ্য ও পানীয় জল পরিশোধনে ব্যবহৃত হয় এবং সিগারেটের ধোঁয়াতেও এটি পাওয়া যায়। যেহেতু অ্যাক্রিলামাইডকে কার্সিনোজেন (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই এটি সম্ভাব্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে, কম তাপমাত্রায় রান্না করলে এর গঠন প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

- আস্তে আস্তে সেদ্ধ হলে মশলা খাবারের গভীরে প্রবেশ করে, যা তরকারি বা মাংসের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

- মাঝেও আঁচ কমিয়ে রান্না করলে খাবার পাতিলের তলায় লেগে যাওয়া বা পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।


গ্যাস বাঁচানোর আরও কিছু কার্যকর টিপস অনুসরণ করতে পারেন-


ঢাকনা ব্যবহার করুন

রান্নার সময় হাঁড়ি-পাতিল ঢেকে রাখলে কেবল জ্বালানিই সাশ্রয় হয় না, বরং এটি একটি নিরাপদ পদ্ধতিও বটে। ঢাকনা দিয়ে রান্না করলে পাত্রের ভেতরে তাপ আটকে থাকে এবং খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়, যার ফলে কম জ্বালানি খরচ হয়। এটি প্রায় ৩০% পর্যন্ত গ্যাস বাঁচায়। এছাড়া, ঢাকনা ব্যবহার করলে খাবারের আর্দ্রতা ও স্বাদও বজায় থাকে।


সঠিক রান্নার পাত্র নির্বাচন

ভালো তাপ-পরিবহন ক্ষমতা সম্পন্ন পাত্র ব্যবহার করলে তাপের অপচয় কমে এবং দ্রুত খাবার রান্না হয়। কাস্ট আয়রনের পাত্র এবং মোটা তলদেশযুক্ত স্টেইনলেস স্টিলের প্যান এক্ষেত্রে চমৎকার পছন্দ; কারণ এগুলো তাপ সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়, ফলে জ্বালানির অপচয় কম হয়।


ভেজা পাত্র চুলায় দেবেন না

প্রথমত, পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করুন। এর উপরিভাগ মসৃণ ও পরিষ্কার থাকে, যা দক্ষতার সাথে তাপ সঞ্চালনে সহায়তা করে। পাত্রে লেগে থাকা খাবারের অবশিষ্টাংশ বা ময়লা তাপ-অন্তরক হিসেবে কাজ করে এবং তাপকে খাবারের সংস্পর্শে আসতে বাধা দেয়। 

এরপর, পাতিল বা কড়াই ভেজা থাকলে তা শুকাতে বাড়তি গ্যাস খরচ হয়। তাই তা মুছে চুলায় বসানো বুদ্ধিমানের কাজ।


বার্নারের আকার

রান্নার প্রয়োজনে সঠিক আকারের বার্নার বেছে নেওয়া  গ্যাস সাশ্রয় করার আরেকটি চমৎকার উপায়। বড় বার্নারের তুলনায় ছোট বার্নারে ৬-১০% কম জ্বালানি খরচ হয়, এমনকি শিখার উচ্চতা সমান থাকলেও। ছোট বার্নারের ব্যাস কম হওয়ায় চারপাশের বাতাসে তাপের অপচয় কম হয়, ফলে গ্যাস সাশ্রয় হয়।


প্রি-হিটিং

রান্না শুরুর আগে চুলা বা পাত্র গরম করে নেওয়া (প্রি-হিটিং) একটি জরুরি ধাপ হলেও অনেক সময় তা উপেক্ষা করা হয়, যার ফলে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস খরচ হয়। অহেতুক জ্বালানি খরচ এড়াতে প্রি-হিটিংয়ের সময় মাঝারি থেকে কম আঁচ ব্যবহার করুন। এই কৌশলটি অবলম্বন করলে ২০% পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় হতে পারে এবং রান্নার সময়ও কমে আসে।


প্রেশার কুকারের ব্যবহার

সাধারণ রান্নার পদ্ধতির তুলনায় প্রেশার কুকারে রান্না করলে সময় ও জ্বালানি, উভয়ই সাশ্রয় হয়। পিসিআরএ এর তথ্য অনুযায়ী, প্রেশার কুকারে রান্না করলে চাল বা ভাতের ক্ষেত্রে ২০%, ভিজিয়ে রাখা ডালের ক্ষেত্রে ৪৬%, শাকসবজির ক্ষেত্রে ৫০-৭০% এবং মাংসের ক্ষেত্রে ৪১.৫% জ্বালানি সাশ্রয় হয়।


বার্নার পরিষ্কার রাখুন

বার্নারে জমে থাকা কালি বা ময়লা তাপ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে পাত্র গরম হতে বেশি সময় লাগে। এটি  নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে এগুলোর কার্যকারিতা বাড়ে এবং গ্যাসের অপচয় কমে। পরিষ্কার স্টোভ ও বার্নার আগুনের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে এবং গ্যাস লিক বা নিঃসরণ রোধ করে, যার ফলে রান্না নিরাপদ ও কার্যকর হয়। 

এছাড়া, নিয়মিত পরিষ্কারের ফলে এই সরঞ্জামগুলোর স্থায়িত্বও বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে আপনার অর্থ সাশ্রয় করে। তাই আগুনের রঙ হলুদ বা কমলা কি না খেয়াল রাখুন, কারণ এই রঙের শিখা পাত্র গরম করার ক্ষেত্রে কম কার্যকর।


ভিজিয়ে রাখা

ডাল, চাল এবং অন্যান্য শস্য রান্নার আগে ভিজিয়ে রাখলে জ্বালানি সাশ্রয় হয়। যেহেতু খাবার আগেই কিছুটা পানি শুষে নেয়, তাই রান্নার সময় বাষ্পীভূত করার জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ কমে যায়। ভিজিয়ে রাখার এই পদ্ধতিটি কেবল গ্যাসই বাঁচায় না, বরং স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।


রান্নার ক্রম বা পর্যায় ঠিক করুন

কি কি রান্না করবেন তা আগে থেকে পরিকল্পনা করলে গ্যাস স্টোভ বারবার জ্বালানো ও নেভানোর প্রয়োজন কমে। উদাহরণস্বরূপ, যেসব খাবার রান্না করতে বেশি সময় লাগে সেগুলো দিয়ে রান্না শুরু করুন এবং এরপর পাত্রের অবশিষ্ট তাপ ব্যবহার করে চটজলদি যেগুলো অল্প তেলে দ্রুত ভাজা যায় তেমন খাবার তৈরি করে নিন।

এছাড়াও, রান্নার আগে সমস্ত উপকরণ হাতের কাছে এনে রাখলে সময় ও গ্যাস উভয়ই সাশ্রয় হবে। 


ছবি: সংগৃহীত


/এসএন

sidebar ad