"এই ব্রাশটা আমার খুব পছন্দের! রক্তসঞ্চালন, ত্বকের কোষ পুনর্নবীকরণ এবং হালকা এক্সফোলিয়েশনের জন্য সপ্তাহে বেশ কয়েকবার ত্বক ব্রাশ করি।”
“শরীর ব্রাশ করার জন্য একদম উপযুক্ত। ব্রাশের লোম ঝরে পড়ে
না। বেশ ভালো মানের। নরম, কিন্তু অতিরিক্ত নরম নয়।”
এমন অসংখ্য প্রশংসায় ভরে আছে পণ্যটির রিভিউ সেকশন। কারও কাছে এটি ত্বক মসৃণ
করার নতুন সঙ্গী, কারও কাছে আবার সেল্ফ কেয়ার রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতে ছোট্ট একটি
ব্রাশ নিয়ে গোসলের আগে শরীরের ত্বক ঘষে নেওয়া—ব্যাপারটি শুনতে যতটা অদ্ভুত, অনলাইনে এর জনপ্রিয়তা কিন্তু
ততটাই বাস্তব।
নাম "ড্রাই ব্রাশিং"। পানি, সাবান কিংবা বডি ওয়াশ ছাড়াই শুকনো ত্বকের
ওপর শুকনো ব্রাশ চালানোর এই পদ্ধতি এখন সেল্ফ কেয়ার ট্রেন্ড হিসেবে বেশ আলোচিত। দাবি
করা হচ্ছে, এতে মৃত কোষ ঝরে যায়, ত্বক হয় মসৃণ ও উজ্জ্বল, রক্তসঞ্চালন বাড়ে; এমনকি
সেলুলাইট কমানো থেকে শুরু করে শরীরের টক্সিন বের করে দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
আরোও পড়ুন: বর্ষায় হোকত্বক ও চুলের বিশেষ যত্ন
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই জনপ্রিয়
ব্রাশটি সত্যিই ত্বকের যত্নে এতটা কার্যকর, নাকি এর পেছনে কাজ করছে মূলত সোশ্যাল মিডিয়া
আর প্রোডাক্ট মার্কেটিং এর জোর?
ড্রাই ব্রাশিং আসলে কী?
এর নাম থেকেই কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ড্রাই ব্রাশিং হলো একটি যান্ত্রিক এক্সফোলিয়েশন
পদ্ধতি, যেখানে শুকনো ত্বকে প্রাকৃতিক আঁশযুক্ত শক্ত ব্রাশ ব্যবহার করে মৃত ত্বককোষ
সরানো হয়। সাধারণত গোসলের আগে পা থেকে শুরু করে শরীরের ওপরের দিকে হালকা চাপে বৃত্তাকার
বা লম্বা স্ট্রোকে ব্রাশ করা হয়। এতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং ত্বক সাময়িকভাবে মসৃণ ও
উজ্জ্বল দেখাতে পারে।
সত্যিই ত্বকের উপকার হয়?
ত্বক এক্সফোলিয়েট ও পুনরুজ্জীবিত করার সেরা উপায় এর প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হলে,
তবে ড্রাই ব্রাশিং হতে পারে একটি সেরা বিকল্প যা অনেক সুবিধা প্রদান করে; এমনটাই দাবি
করা হয় এই ড্রাই ব্রাশ এর। তাহলে কি এতে সত্যিই ত্বকের উপকার হয়?
উত্তর হলো হ্যাঁ, তবে যতটা বলা হয়, ততটা নয়।
ড্রাই ব্রাশিংয়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপকার হলো এক্সফোলিয়েশন। শরীরের জন্য
এই ড্রাই ব্রাশটিতে রয়েছে নরম, প্রাকৃতিক ব্রিসল যা প্রতিদিন ড্রাই ব্রাশ করার জন্য
আদর্শ—এমনকি সংবেদনশীল
ত্বকের জন্যও।
শুকনো ও খসখসে ত্বকের ওপর ব্রাশের হালকা ঘর্ষণ মৃত কোষ সরাতে সাহায্য করতে পারে।
ফলে গোসলের পর ত্বক কিছুটা মসৃণ অনুভূত হতে পারে এবং দেখতে তুলনামূলক উজ্জ্বল লাগতে
পারে।
ড্রাই ব্রাশিং রক্তসঞ্চালন উন্নত করে। তবে এর লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমকে (লিম্ফ
নোড ও ভেসেল) সচল করে শরীর পরিষ্কার করার যে দাবি করা হয়েছে, তা মূলত সঠিক নয়। চিকিৎসকদের
মতে, হালকা ম্যাসাজ বা ব্রাশের ফলে ত্বকে ঘর্ষণ রক্তনালীগুলোকে উদ্দীপিত করে, ফলে ত্বকের
পৃষ্ঠে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে বেড়ে যায়।
ব্রাশের ম্যাসাজের মতো স্টিমুলেটিং অনুভূতি স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করতে পারে।
তাই এটি অনেকের কাছে রিফ্রেশিং একটা অনুভূতি দিতে পারে, যেমনটা ম্যাসাজের ক্ষেত্রে
প্রায়শই হয়ে থাকে।
ডিটক্সিফিকেশন—সত্য না মিথ?
ড্রাই ব্রাশিং নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দাবিগুলোর একটি হলো এটি নাকি শরীর থেকে
টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। এই দাবিটি মূলত একটি মিথ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ধারণা। আমাদের শরীর থেকে প্রাকৃতিকভাবে
টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার এবং নিষ্কাশন করার মূল দায়িত্ব লিভার (যকৃৎ) এবং কিডনির
(বৃক্ক)। ত্বকের ওপর ব্রাশ ঘষলে ভেতরের অর্গানের এই ডিটক্স প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন
আসে না। তবে এই প্রক্রিয়াটির কিছু চমৎকার স্কিনকেয়ার এবং শারীরিক উপকারিতা রয়েছে, যা
অনেকেই ডিটক্সিফিকেশনের সাথে গুলিয়ে ফেলেন।
সেলুলাইট কমাবে? দাবির পেছনে নেই শক্ত প্রমাণ-
ত্বকের নিচের ফ্যাট যখন উপরের দিকে ধাক্কা দেয় এবং ভেতরের শক্ত টিস্যুগুলো ত্বককে
নিচের দিকে টেনে ধরে রাখে, তখনই এক ধরনের খাঁজ বা টোলের সৃষ্টি হয়। একেই সেলুলাইট বলে।
এটি দেখতে অনেকটা কমলালেবুর খোসার মতো হয়। সাধারণত উরু, নিতম্ব ও পেটে এর বেশি দেখা
মেলে। এটি খুবই সাধারণ এবং অনেক সুস্থ মানুষের শরীরেও দেখা যায়।
ড্রাই ব্রাশিং সেলুলাইট কমাতে সাহায্য করে, এমন দাবি করা হলেও এর পেছনে নেই
শক্ত কোন বৈজ্ঞানিক প্রমান। শুকনো ত্বকে বিশেষ ব্রাশ দিয়ে ম্যাসাজ (ড্রাই ব্রাশিং)
করলে ওই অংশে রক্ত সঞ্চালন সাময়িকভাবে অনেক বেড়ে যায়. এতে ত্বক সাময়িকভাবে কিছুটা ফুলে
বা ফেঁপে (Plump up) ওঠে। ত্বক ফুলে ওঠার কারণে
নিচের সেলুলাইটগুলো কিছু ঘণ্টার জন্য ঢাকা পড়ে যায় এবং ত্বক মসৃণ দেখায়। অর্থাৎ, এর
সাময়িক পরিবর্তন দেখা যায়, স্থায়ী কোন সমাধান নয়।
সঠিকভাবে ড্রাই ব্রাশ করবেন কীভাবে?
আপনি যদি ত্বকের যত্নে এটি করতে চান, তবে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি-
- প্রথমেই সঠিক ব্রাশ নির্বাচন করুন। প্রাকৃতিক আঁশযুক্ত (যেমন ক্যাকটাস, সিসাল
বা জুট) ব্রাশ ব্যবহার করুন। প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক ব্রাশ এড়িয়ে চলুন।
- শরীর এবং ব্রাশ দুটোই সম্পূর্ণ শুকনা থাকা অবস্থায় গোসলের ঠিক আগে এটি করুন।
৩-৫ মিনিট যথেষ্ট।
- পায়ের পাতা থেকে শুরু করে স্ট্রোকগুলো সবসময় হার্টের বা বুকের দিকে (নিচ থেকে
উপরের দিকে) টানুন। প্রতিটি অংশে ৫-১০ বার ওভারল্যাপিং স্ট্রোক করুন। ত্বক হালকা লালচে
হবে, কিন্তু কখনোই রক্ত বের হওয়া যাবে না।
- বেশি চাপ দেবেন না। এটি স্কিন পোলিশিং এর প্রতিযোগিতা নয়। জোরে ঘষলে বেশি
উপকার হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
বরং অতিরিক্ত ঘর্ষণে জ্বালাপোড়া, লালভাব এমনকি ত্বকে ক্ষতও হতে পারে।
- ড্রাই ব্রাশিং ও গোসল শেষ করার পর ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে অবশ্যই শরীরে
ভালো ময়েশ্চারাইজার বা বডি অয়েল মাখুন। কারণ ড্রাই ব্রাশিং ত্বককে শুষ্ক করে তোলে।
- সপ্তাহে একবার ব্রাশ সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিন।
সবার জন্য কি ড্রাই ব্রাশিং নিরাপদ?
না, ত্বকের অবস্থা বুঝে ব্যবহার করা জরুরি।
যাদের একজিমা, রোজেসিয়া, সোরিয়াসিস বা গুরুতর শুষ্ক ত্বক আছে, তাদের জন্য
ড্রাই ব্রাশিং ক্ষতিকর হতে পারে।
মুখের ত্বকেও ড্রাই ব্রাশিং করার পরামর্শ দেওয়া হয় না, কারণ মুখের ত্বক শরীরের
অনেক অংশের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল।
ত্বকে কাটা-ছেঁড়া, ক্ষত, ফোস্কা, র্যাশ বা কোনো ধরনের সংক্রমণ, সেলুলাইটিস
বা অন্য কোনো স্কিন কন্ডিশন থাকলে তারা ব্যবহারের আগে ডার্মাটোলজিস্ট এর পরামর্শ নিলে
ভালো।
ব্রাশ কেনার সময় কী দেখবেন?
অ্যামাজন বা অন্য অনলাইন মার্কেটে এর অসংখ্য ধরন পাওয়া যায়। এই ড্রাই ব্রাশ
কেনার সময় কিছু জিনিস খেয়াল রাখতে পারেন—
- ব্রিসল যেন ত্বকে অত্যধিক খসখসে না লাগে
- হাত ও পা পর্যন্ত সহজে পৌঁছানোর জন্য লম্বা হাতলওয়ালা যুক্ত সুবিধাজনক হতে পারে
- ব্রাশ পরিষ্কার রাখা সহজ কি না
- খুব ধারালো বা শক্ত কোনো অংশ আছে কি না
- আপনার ত্বক কতিটুকু স্পর্শকারতর, সেই অনুযায়ী ব্রিসল বেছে নেওয়া।
ড্রাই ব্রাশ ইদানীং অ্যামাজন -এর মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিউটি ও সেলফ-কেয়ার টুল হয়ে উঠেছে। গুইনেথ প্যালট্রো, ট্রেসি এলিস রস-এর মতো তারকারা তাদের রুটিনে ড্রাই ব্রাশিং ব্যবহার করার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। মাত্র ৮-১০ ডলারে একটি ব্রাশ কিনে ঘরে বসেই যদি স্পা-সদৃশ অভিজ্ঞতা পাওয়ার আকর্ষণ পাওয়া যায়, তাহলে মন্দ কি?
নিজেকে একটু সময় দিতে, ত্বকের মৃত কোষ দূর করে ত্বককে মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাতে
চাইলে ড্রাই ব্রাশিং রুটিনে যোগ করা যেতে পারে। তবে এটি কোনো ম্যাজিক বিউটি ট্রিটমেন্ট
নয়—বরং সহজ একটি সেল্ফ
কেয়ার অভ্যাস হিসেবেই দেখাটা বেশি যুক্তিযুক্ত।
ঢাকা/টিএ