প্রায় প্রতিদিনই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি পরিচিত ও বহুলচর্চিত অস্ত্রোপচার। স্পাইনাল অ্যানেসথেশিয়ার পর মায়ের শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায়। এরপর জীবাণুমুক্ত কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয় শরীর। চামড়া থেকে শুরু করে একে একে ভেতরের স্তরগুলো অতিক্রম করে চিকিৎসক পৌঁছান জরায়ুতে। পৃথিবীর আলো দেখানো হয় নতুন এক প্রাণকে। তারপর আবার প্রতিটি স্তর সেলাই করে, ব্যান্ডেজ লাগিয়ে মাকে পাঠানো হয় ওয়ার্ডে।
চিকিৎসকের চোখে এটি হয়তো প্রতিদিনের কাজ। কিন্তু সেই শরীরের ভেতরে যে অপেক্ষা, ভয়, যন্ত্রণা, ভালোবাসা আর নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে—তা কি কখনো শুধু একটি অস্ত্রোপচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে?
২০২৬ সালের মিস ওয়ার্ল্ডের মঞ্চে উগান্ডার প্রতিনিধি মুঝোজা ত্রিভিয়া যখন ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ গাউন পরে হাঁটলেন, তখন এই প্রশ্নটিই যেন নতুন করে সামনে এলো। ঝলমলে ফ্যাশন শোর মঞ্চে একটি গাউন হয়ে উঠল মাতৃত্ব, নারীদেহ ও সন্তান জন্মদানের এক অসাধারণ দৃশ্যমান গল্প।
‘লেয়ার্স অব লাইফ’ নামটিই পোশাকটির ভাবনাকে স্পষ্ট করে। গাউনটির নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় অতিক্রম করা শরীরের বিভিন্ন স্তর থেকে। ত্বক, চর্বি, ফ্যাসিয়া, পেশি, পেরিটোনিয়াম, জরায়ু এবং অ্যামনিওটিক থলি—সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে চিকিৎসককে যে স্তরগুলো অতিক্রম করতে হয়, সেগুলোকেই রূপ দেওয়া হয়েছে কাপড়, রং ও গঠনের ভাষায়।
স্ট্রেচ স্যাটিন এবং একাধিক স্তরের টিউল দিয়ে তৈরি পোশাকটিতে তাই প্রতিটি স্তর যেন আলাদা একটি গল্প। পিচ, সোনালি, কোরাল, লাল, মেরুন ও বারগান্ডির ক্রমবিন্যাসে তৈরি হয়েছে শরীরের ভেতরের স্তরগুলোর একটি শৈল্পিক প্রতিরূপ। যেখানে সাধারণত এই স্তরগুলোকে দেখা হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, সেখানে ডিজাইনার সেগুলোকে দেখেছেন সৌন্দর্য ও জীবনের প্রতীক হিসেবে।
অস্ত্রোপচারের টেবিল থেকে ফ্যাশনের মঞ্চে
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সঙ্গে যুক্ত শব্দগুলো শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাসপাতাল, অপারেশন থিয়েটার, চিকিৎসক, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি। সেখানে সৌন্দর্যের কোনো জায়গা আছে বলে সাধারণত মনে হয় না। কিন্তু ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ সেই ধারণাটিকেই বদলে দেয়। একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার জন্য একজন নারীর শরীরের ভেতর দিয়ে যে যাত্রা, সেটিই হয়ে ওঠে পোশাকের নান্দনিক ভাষা। ফলে গাউনটি শুধু শরীরকে আবৃত করেনি; বরং নারীদেহের ভেতরে ঘটে যাওয়া এক অসাধারণ সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান করেছে।
ফ্যাশনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পোশাকটি যেন বলেছে—মাতৃত্ব কেবল কোমলতা বা আবেগের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শারীরিক শক্তি, ভয়, ঝুঁকি, যন্ত্রণা এবং অসীম সাহস।
ডিজাইনারের নিজের মাতৃত্বের গল্প
এই নকশার পেছনের গল্পটিকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলেছে ডিজাইনার কিশা আবদাল্লাহর নিজের অভিজ্ঞতা। তিনি নিজেও নতুন মা। নিজের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা থেকেই ‘লেয়ার্স অব লাইফ’-এর ভাবনা পেয়েছেন বলে জানা যায়। সম্ভবত এ কারণেই পোশাকটির প্রতিটি স্তর কেবল নকশার অংশ হয়ে থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একজন নারীর নিজের শরীর, সন্তান জন্ম এবং মাতৃত্বকে নতুন করে দেখার অভিজ্ঞতা।
একজন মা যখন সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন, তখন শুধু একটি শিশুর জন্ম হয় না। জন্ম নেয় একজন নতুন মানুষেরও—‘মা’ হিসেবে। সেই রূপান্তর দৃশ্যমান নয়, কিন্তু গভীর। ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ যেন সেই অদৃশ্য রূপান্তরকেও পোশাকের স্তরে স্তরে তুলে ধরেছে।
একটি গাউন, অসংখ্য না-বলা গল্প
সিজারিয়ানের পর মায়ের শরীরে যে দাগ থেকে যায়, সেটি কেবল একটি অস্ত্রোপচারের স্মৃতি নয়। কারও কাছে সেটি দীর্ঘ অপেক্ষার, কারও কাছে ভয় জয় করার, কারও কাছে বহু বছরের আকাঙ্ক্ষা পূরণের, আবার কারও কাছে হারানোর পর নতুন করে জীবনের কাছে ফিরে আসার গল্প। সেই দাগের দিকে তাকালে আমরা হয়তো শুধু একটি ক্ষত দেখি। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক নারীর না-বলা যুদ্ধ।
‘লেয়ার্স অব লাইফ’ সেই না-বলা গল্পগুলোকেই মঞ্চে নিয়ে এসেছে। তাই এটি কেবল একটি ফ্যাশন গাউন নয়। এটি নারীদেহের প্রতি সম্মান, মাতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবন সৃষ্টির এক অসাধারণ প্রক্রিয়ার শিল্পিত উদ্যাপন।