বিমানবন্দরের ভিড়। ক্যামেরার ঝলকানি। একের পর এক সেলিব্রেটি বেরিয়ে আসছেন গাড়ি থেকে। কারও হাতে শ্যানেল এর হ্যান্ডব্যাগ, কারও চোখে এর সানগ্লাস, কারও কাঁধে বা ঝুলছে সেই চেনা কুইল্টেড হ্যান্ডব্যাগ। পোশাকেও শ্যানেল- এর ছোঁয়া।
হলিউড থেকে বলিউড; তারকাদের রেড কার্পেট থেকে এয়ারপোর্ট লুক; পার্টি থেকে ক্যাজুয়াল
আউটিং— শ্যানেল যেন
আভিজাত্য আর স্টাইলের এক নীরব ঘোষণা। হাতে একটি শ্যানেল ব্যাগ থাকা, কিংবা এর পোশাক
পরা—অনেকের কাছেই শুধুমাত্র
ফ্যাশন নয়, যেন একটি স্ট্যাটাস স্টেটমেন্ট।
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই বিখ্যাত ব্র্যান্ডের পেছনে থাকা নারীটির জীবন
কেমন ছিল?
গ্যাব্রিয়েল কোকো শ্যানেল- আজ তাঁর নাম মানেই বিলাসিতা, আভিজাত্য আর ফরাসি ফ্যাশন।
"ফ্যাশন বদলায়, কিন্তু স্টাইল থেকে যায়”, এই দর্শনকে যেন নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করেছিলেন তিনি।
কোকো শ্যানেলকে নিয়ে লিখতে চাইলে শুধু একজন বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনারের সাফল্যের
গল্প হলে, লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁর জীবনে যেমন ছিল অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা ও
আত্মনির্ভরতার গল্প, তেমনই ছিল যুদ্ধকালীন বিতর্ক, নাৎসিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গুপ্তচরবৃত্তির
অভিযোগ। ফলে শ্যানেলকে বুঝতে হলে তাঁর জীবনের আলো এবং অন্ধকার, দু দিকই দেখতে হয়।
শুরুর দিনগুলো:
১৮৮৩ সালের ১৯ আগস্ট ফ্রান্সের সাওমুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন গ্যাব্রিয়েল বনিয়ের
শ্যানেল। তাঁর শৈশব ছিল স্বচ্ছলতার বিপরীত প্রান্তে। বাবা ছিলেন একজন ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা,
আর মা ধোপানী। মাত্র ১২ বছর বয়সে মা মারা গেলে বাবা তাঁকে ও তাঁর বোনদের রেখে আসেন
এক ক্যাথলিক অনাথ আশ্রমে। প্রায় সাত বছর তিনি কাটান ওবাজিন এর সেই প্রতিষ্ঠানে।
পরবর্তী জীবনে কোকো কখনো অনাথ আশ্রম শব্দটি কিংবা তাঁর এই দারিদ্র্যপীড়িত শৈশব
নিয়ে কথা বলতে চাইতেন না। তিনি অনাথ আশ্রমের
মেয়েদের বলেছিলেন যে তার বাবা ভাগ্য অন্বেষণে আমেরিকায় গেছেন এবং ধনী হলেই তাকে নিতে
আসবেন। কিন্তু বাস্তবে, সেখানে রেখে আসার পর কোকো আর কখনো তার বাবাকে দেখেননি।
সেখানকার জীবন ছিল কঠোর ও নিয়মানুবর্তী, যা কোকো কোনভাবেই পছন্দ করতেন না। কিন্তু
এই আশ্রমের জীবনই তাঁকে শিখিয়েছিল সংযম, কঠোর পরিশ্রম আর এক ধরনের স্পার্টান জীবনদর্শন।
শ্যানেলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল অনাথাশ্রমের দেয়ালের চেয়ে অনেক বড়। তরুণ বয়সে তিনি
সেলাই শিখেছিলেন। কিছুদিন ক্যাবারে গায়িকা হিসেবে কাজ করেছিলেন। তখন তিনি গাইতেন
‘কুই কুয়া ভু কোকো’ (Qui
qu'a vu Coco) নামের একটি জনপ্রিয় গান। সেখান থেকেই পাওয়া 'কোকো' ডাকনামটি পরবর্তীতে
তাঁর বিশ্বজোড়া পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
ফ্যাশন বিপ্লব:
শ্যানেলের প্রথম বড় ব্যবসা কিন্তু পোশাক ছিল না, ছিল টুপি। ১৯১০ সালে খোলা তার
প্রথম টুপির দোকানটি, যা পুরো প্যারিস শহরকে আকৃষ্ট করেছিল। পরে বালসানের বন্ধু ও ইংরেজ
ধনকুবের আর্থার ‘বয়’ ক্যাপেলের প্রেমে পড়েন কোকো। ক্যাপেল শুধু তাঁর প্রেমিকই ছিলেন না, ছিলেন
তাঁর প্রথম বিনিয়োগকারী ও অনুপ্রেরণা। ১৯১৩ সালে ফ্রান্সের দোভিল শহরে কোকো খোলেন
তাঁর প্রথম পোশাকের দোকান।
কোকো শ্যানেলের বিপ্লবী দর্শন ছিল সহজ-সরল, আরামদায়ক ও ব্যবহারিক পোশাক। তখন
নারীদের পোশাক মানেই ছিল ভারী, আঁটসাঁট এবং অস্বস্তিকর ধরনের। শ্যানেল সেখানে নিয়ে
এলেন সরলতা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বাধীনতার ধারণা। তিনি পুরুষদের পোশাক থেকে ধারণা নিয়ে
নারীদের জন্য জার্সি ফ্যাব্রিকের পোশাক বানালেন, যা তখন কেবল পুরুষদের অন্তর্বাসে ব্যবহৃত
হতো। জার্সি কাপড়, সহজ কাট, ট্রাউজার, ছোট কালো পোশাক—এসবকে তিনি এমনভাবে ব্যবহার করলেন,
যা তখনকার নারীদের পোশাকে ছিল প্রায় অকল্পনীয়। তাঁর কাছে পোশাক শুধু সুন্দর দেখানোর
বিষয় ছিল না; নারী যেন পোশাকের ভেতর স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
ছিল।
তারপর এল সেই ছোট কালো পোশাক। শোকের রঙ হিসেবে বিবেচিত কালো রঙকে তিনি নারীদের
সবচেয়ে মার্জিত পোশাকে পরিণত করেন। ১৯২৬ সালে তিনি ডিজাইন করেন ‘লিটল ব্ল্যাক ড্রেস’ (Little Black Dress), যা আজও প্রতিটি
নারীর ওয়ারড্রোবের অপরিহার্য অংশ। কালো হয়ে উঠল শুধু শোকের রং নয়—এলিগ্যান্সের রং।
চ্যানেল নং ৫ (Chanel No. 5) পারফিউম: ১৯২১ সাল। শ্যানেলের সাম্রাজ্যে যোগ হলো এমন একটি জিনিস, যা তাঁর নামকে ফ্যাশনের
গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বসংস্কৃতির অংশ করে দেয়; 'চ্যানেল নং ৫' পারফিউম। দেশের প্রথম কোনো
সুগন্ধি বাজারজাত করা হয়। এটি ছিল প্রথম পারফিউম, যাতে কৃত্রিম অ্যালডিহাইড ব্যবহার
করা হয়েছিল। এর ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ নতুন, রহস্যময় ও নেশাতুর। প্রচলিত ফুলের নামের
বদলে একটি সংখ্যা—‘৫’—দিয়ে পারফিউমের
নামকরণও ছিল তখনকার জন্য অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
মার্লিন মনরোকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি রাতে কী পরে ঘুমান, তিনি বলেছিলেন,
“মাত্র কয়েক ফোঁটা চ্যানেল নং ৫।” এই একটি ঘটনাই পারফিউমটিকে কিংবদন্তি করে তোলে।
১৯২৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'Société des Parfums CHANEL,' যা পারফিউম ও প্রসাধনী ব্যবসাকে আলাদা করে বড় করার
ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর একে একে যুক্ত হয়েছে মেকআপ, গয়না, স্কিনকেয়ার; আর গড়ে উঠেছে এমন একটি ব্র্যান্ড,
যা পরবর্তী শতাব্দীতে বিলাসিতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
প্রেম ও একাকীত্ব:
কোকো শ্যানেলের প্রেম ও সম্পর্কের গল্পগুলো যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও
বেশি নাটকীয় ছিল। তিনি আজীবন অবিবাহিত থাকলেও তাঁর জীবনে একাধিক পুরুষের আগমন ঘটেছিল।
অনাথ আশ্রম থেকে বের হওয়ার পর তরুণী কোকোর সাথে ধনী টেক্সটাইল ব্যবসায়ী এতিয়েন বালসানের
পরিচয় হলেও, তাঁর জীবনের একমাত্র প্রকৃত ভালোবাসা ছিল বালসানেরই বন্ধু, ইংরেজ ব্যবসায়ী
ও পোলো খেলোয়াড় আর্থার ক্যাপেল। শ্যানেলকে তীব্র ভালোবাসলেও ক্যাপেল ছিলেন ব্রিটিশ
উচ্চবিত্ত সমাজের মানুষ। তৎকালীন সামাজিক নিয়মের কারণে তিনি কোকোকে বিয়ে না করে এক
অভিজাত ইংরেজ নারীকে বিয়ে করেন। ১৯১৯ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্যাপেল মারা গেলে
কোকো ভেঙে পড়েন। বলা হয়ে থাকে, ক্যাপেলের শোক কাটাতে এবং নিজের দুঃখ প্রকাশ করতেই
কোকো শ্যানেল তাঁর বিখ্যাত 'লিটল ব্ল্যাক ড্রেস' (Little Black Dress) ডিজাইন করেছিলেন,
যা ফ্যাশন দুনিয়ায় বিপ্লব এনেছিল।
পরবর্তীতে রুশ রাজপুত্র দিমিত্রি পাভলোভিচ, ব্রিটেনের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ওয়েস্টমিনস্টারের
ডিউক হিউ গ্রোসভেনরের সাথে তাঁর নাম জড়ালেও সম্পর্ক পরিনয়ের পর্যায়ে আর যায়নি।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ ও বিতর্কিত ভূমিকা:
কোকো শ্যানেলের জীবনের গতি এমন ধারাবাহিক ভাবে চললে, হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো।
কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৩৯
সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কোকো তাঁর সব দোকান বন্ধ করে দেন এবং প্যারিসের
রিটজ হোটেলে থাকতে শুরু করেন। সেই সময় তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয় জার্মান গোয়েন্দা অফিসার
ব্যারন হান্স গুন্টার ফন ডিংকলেজের সঙ্গে।
এরপর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে আরও গুরুতর অভিযোগ। গোপন নথি প্রকাশের পর জানা যায়,
নাৎসি গোয়েন্দা সংস্থা আবওয়ের-এর সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ৭১২৪ নম্বর গুপ্তচর এবং তাঁর কোডনাম ছিল ‘ওয়েস্টমিনস্টার’।
১৯৪৩–৪৪ সালের দিকে তাঁর
সম্পৃক্ততার সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়— মডেল হুট। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, উইনস্টন চার্চিলের
কাছে নাৎসিদের একটি গোপন চিঠি বা বার্তা পৌঁছে দেয়া, যাতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করা
যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়।
১৯৪৪ সালে প্যারিস মুক্ত হওয়ার পর শ্যানেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং কিছু সময়ের
মধ্যে তিনি মুক্তিও পান। তাঁর বিরুদ্ধে নাৎসি সহযোগিতার অভিযোগ থাকলেও তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে
বিচার বা দণ্ড দেওয়া হয়নি। কথিত আছে যে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের হস্তক্ষেপে (বিশেষ করে
চার্চিলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে) তিনি মুক্তি পান। তবে ফ্রান্সে আর টিকে থাকতে
না পেরে তিনি সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যান এবং প্রায় ১৫ বছর আত্মগোপনে থাকেন।
৭০ পেরিয়েও প্রত্যাবর্তন: ১৯৫৪ সালে, বয়স ৭০ পেরিয়ে যাওয়ার পর শ্যানেল আবার ফ্যাশন জগতে ফিরে আসেন। অনেকেই
ভেবেছিলেন তাঁর সময় শেষ। কিন্তু তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, বয়স তাঁর কাছে কোনো সীমা
নয়। ফ্যাশন দুনিয়া তখন বদলে গেছে। নতুন ডিজাইনার এসেছে, নতুন ট্রেন্ড এসেছে। তবুও শ্যানেল
তাঁর নিজস্ব ভাষা নিয়ে ফিরে এলেন।
প্রথমে ফরাসি গণমাধ্যম তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলেও ব্রিটিশ ও আমেরিকান ক্রেতারা
তাঁর নতুন কালেকশন সাদরে গ্রহণ করে। বিশেষ করে তাঁর 'কুইল্টেড হ্যান্ডব্যাগ' ও 'স্লিংব্যাক
শু' ফ্যাশন দুনিয়ায় ঝড় তোলে। ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি প্যারিসের রিটজ হোটেলে ৮৭
বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কোকো শ্যানেল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কাজ করে গেছেন, এমনকি
মৃত্যুর আগের রাতেও তিনি তাঁর পরবর্তী কালেকশনের নকশা তৈরি করছিলেন।
কোকো শ্যানেল নায়িকা, নাকি বিতর্কিত চরিত্র?
এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, তাকে শুধু ‘নারী স্বাধীনতার প্রতীক’ বলা যেমন তাঁর পুরো গল্প বলে না, তেমনি
শুধু ‘নাৎসি সহযোগী’ বললেও তাঁর শতাব্দী-প্রভাবী ফ্যাশন বিপ্লবকে অস্বীকার করা হয়। তাঁর জীবন
ছিল একদিকে সংগ্রাম ও সাফল্যের অনুপ্রেরণা, অন্যদিকে নৈতিক বিতর্ক ও অন্ধকার অধ্যায়ে
মোড়ানো।
সম্ভবত কোকো শ্যানেলের গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই—
তিনি নিখুঁত ছিলেন না।
তিনি ছিলেন জটিল।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মানুষগুলো প্রায়ই এমনই হয়।
তথ্যসূত্র: শ্যানেল অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
জার্মান পেটেন্ট অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অফিস (ডিপিএমএ)
[ভোগ ম্যাগাজিন]