কাপড় ধোয়ার কাজটা মেশিন করে দিচ্ছে বলে তারও যে একটু যত্ন প্রয়োজন, তা ভুলে গেলে চলবে না!
একসময় কাপড় ধোয়া মানেই ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা
পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখা, ঘষাঘষি আর কষ্টসাধ্য পরিশ্রম। আমাদের প্রতিদিনকার কাপড় ধোয়ার
এই ক্লান্তিকর কাজটি সহজ করে দিয়েছে ওয়াশিং মেশিন। টি শার্ট, প্যান্টের মত রেগুলার
ওয়্যার থেকে শুরু করে বিছানার চাদর, পর্দার মত ভারী কাপড়; সবই এখন সহজে পরিষ্কার করা
যায় এতে।
কিন্তু যে যন্ত্রটি প্রতিদিন আমাদের কাজ
সহজ করছে, সেটির যত্ন নেওয়া হচ্ছে তো? নিয়মিত পরিষ্কার ও সঠিক ব্যবহার না করলে ওয়াশিং
মেশিনের ভেতরে ডিটারজেন্টের অবশিষ্টাংশ, লিন্ট, ময়লা এবং পানির খনিজ পদার্থ জমতে পারে।
এর ফলে দুর্গন্ধ, পানি বের হতে সমস্যা কিংবা ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা
দেখা দিতে পারে। তাই ওয়াশিং মেশিন ভালো ও টেকসই রাখতেও করতে হবে এর কিছু যত্নআত্তির।
ওয়াশিং মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ এই মেশিনগুলোকে
বছরের পর বছর ধরে সার্ভিস দিতে সাহায্য করে। কিছু কাজ আছে যা বাসায় বসে সহজেই করা সম্ভব।
এখানে কিছু ওয়াশিং মেশিন রক্ষণাবেক্ষণের টিপস রয়েছে যা একে ভালো রাখতে সাহায্য করবে-
ডিপ ক্লিনিং করুন:
ওয়াশিং মেশিন প্রতিবারই ১০০% সার্ভিস দিবে,
এটা ভেবে থাকলে ভুল হবে। নতুন অবস্থায় এটা যেমন কাজ করত, কিছু সময়ের পর দেখা যায় তাদের
কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। এর পেছনে বড় কারন হল স্কেলিং যা পানিতে মাইক্রো-রেসিডুয়্যালের
উপস্থিতির কারনে হয়ে থাকে।
তাই মেশিনের মডেল অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়
পর পর ‘ড্রাম ক্লিন’ বা ‘ক্লিন ওয়াশার’ সাইকেল চালানো ভালো। প্রয়োজন হলে প্রস্তুতকারকের
নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত ওয়াশিং মেশিন ক্লিনার ব্যবহার করতে পারেন।
রাবার গ্যাসকেট পরিষ্কার:
এটি মেশিনের একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ। এই রাবার
গ্যাসকেট ওয়াশার-ড্রায়ারের প্রান্তে মোড়ানো থাকে যা যেকোন ধারালো প্রান্ত থেকে কাপড়ের
ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। মেশিন ফ্রন্ট লোড বা টপ লোড যাই হোক না কেন যখনই এর দরজা খোলা
হয় তখন ধূলিকণা গ্যাসকেটের প্রান্তে এবং পাশে জড়ো হয়। এছাড়াও, রাবার গ্যাসকেটের ভাঁজে
পানি, চুল, লিন্ট ও ময়লা জমে থাকতে পারে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এখান থেকেই দুর্গন্ধ
তৈরি হতে পারে।
এই অংশটিকে উপেক্ষা না করে সপ্তাহে অন্তত
একবার নরম ভেজা কাপড় দিয়ে গ্যাসকেটের ভাঁজগুলো ভালোভাবে মুছে নিন। পরিষ্কারের সময় ধারালো
কোনো বস্তু ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
বাইরের আবরন পরিষ্কার:
নতুন এবং পরিষ্কার ঘরের যন্ত্রপাতি ঘরের
শোভা বাড়ায়। একটি পুরাতন ওয়াশিং মেশিন ঘরের চেহারা নস্ট করে দেয়। কিন্তু আমরা এই দিকটিই
উপেক্ষা করে থাকি। ফ্রন্ট লোড ওয়াশিং মেশিনগুলোই এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একটি গ্লাস
ক্লিনার দিয়ে মেশিনের উপরে এবং পাশে পরিষ্কার করতে হবে, এতে মেশিনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য
উজ্জ্বল রাখতে পারে।
কন্ট্রোল প্যানেলে সরাসরি পানি বা ক্লিনার
স্প্রে করবেন না। আর পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই মেশিনটি বন্ধ রাখুন। এছাড়া ব্যবহার না
করার সময় মেশিন ঢেকে রাখতে হবে।
দরজা বন্ধ করবেন না সঙ্গে সঙ্গে:
ওয়াশিং মেশিন ব্যবহারের সাথে সাথেই দরজা
বন্ধ করে দেয়া যাবেনা। অনেকেই ভেতরে ময়লা ও ধুলাবালি তৈরি হবে ভেবে বন্ধ করে দেয়, এটা
কিছু পরিমানে সত্য হলেও এর মানে এই নয় যে তা অবিলম্বে করতে হবে। কাপড় ধোয়া শেষ হওয়ার
পর মেশিনের দরজা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে রাখলে ভেতরের আর্দ্রতা বের হতে পারে না। এতে
দুর্গন্ধ ও ছত্রাকজাতীয় সমস্যা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে।
তাই ওয়াশ শেষ হওয়ার পর ১৫-৩০ মিনিটের জন্য
খোলা রেখে এর ভেতরে আর্দ্রতা অপসারণ করতে হবে। গ্যাসকেটে পানি জমে থাকলে শুকনো কাপড়
দিয়ে মুছে নিতে পারেন।
ডিটারজেন্ট ডিসপেন্সার পরিষ্কার:
অটোমেটিক মেশিনগুলোতে ডিটারজেন্ট এবং ফ্যাব্রিক
সফটনারের জন্য আলাদা পাত্র আছে। এই মেশিনগুলো স্বয়ংক্রিয় ভাবে পানির সাথে এগুলো মিক্স
করে থাকে। ডিটারজেন্ট ও ফ্যাব্রিক সফটনার রাখার ড্রয়ারে ব্যবহৃত পণ্যের অবশিষ্টাংশ
জমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে সেখানে ময়লা ও ছত্রাকজাতীয় আস্তরণ তৈরি হওয়ার
সুযোগ থাকে এবং তা বিষাক্ত উপাদানে আশ্রয়স্থল করে তোলে।
এই ধরনের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে এর পরিষ্কার
করা জরুরি। নিয়মিত ড্রয়ারটি খুলে পানি দিয়ে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। জমে থাকা ডিটারজেন্ট
পরিষ্কার করতে নরম ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিল্টারের কথা ভুলবেন না:
কাপড় থেকে বের হওয়া লিন্ট, চুল, সুতা ও ছোটখাটো
ময়লা অনেক ওয়াশিং মেশিনের ফিল্টারে জমে। ফিল্টার অতিরিক্ত ময়লায় আটকে গেলে পানি বের
হতে সমস্যা হতে পারে।
আপনার মেশিনে ফিল্টার থাকলে প্রস্তুতকারকের
নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত পরিষ্কার করুন। বিশেষ করে লিন্ট বেশি বের হয় এমন কাপড় ধোয়ার
পর ফিল্টারের দিকে নজর দেওয়া ভালো।
হোস বা পানির পাইপ পরীক্ষা করুন:
মেশিনের ভেতরে এবং বাহিরে উভয় দিকে পানির
প্রবাহ ঠিক থাকার জন্য হোস চেক করা দরকার। মেশিনে পানি ঢোকা ও বের হওয়ার পাইপেও নজর
রাখা জরুরি। পাইপে ফাটল, লিকেজ, ব্লকেজ বা অতিরিক্ত বাঁক থাকলে পানির প্রবাহে সমস্যা
হতে পারে।
তাই মাঝে মাঝে মেশিনের পেছনের ইনলেট হোস
ও ড্রেন হোস পরীক্ষা করুন। কোথাও পানি চুইয়ে পড়ছে কি না, সেটিও দেখে নিন।
অতিরিক্ত কাপড় ঢোকাবেন না:
হতে পারে ব্যবহৃত ওয়াশিং মেশিনটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন।
কিন্তু তারপরেও এর ব্যবহারে হতে হবে সাবধানতা। আরেকটু কাপড় দিলেই বা কী হবে!—এই অভ্যাসটি মেশিনের
জন্য ভালো নয়। নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কাপড় দিলে কাপড়গুলো ঠিকভাবে নড়াচড়া
করতে পারে না। ফলে কাপড় ভালোভাবে পরিষ্কার নাও হতে পারে এবং মেশিনের ওপরও অতিরিক্ত
চাপ পড়ে।
তাই মেশিনের নির্ধারিত লোড মেনে কাপড় দিন।
ভারী কম্বল বা পর্দা ধোয়ার আগে মেশিনটি ওই ধরনের কাপড়ের জন্য উপযুক্ত কি না, ম্যানুয়াল
দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন।
সঠিক ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন:
ওয়াশিং মেশিনের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত ডিটারজেন্ট
ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফ্রন্ট-লোড বা হাই-এফিশিয়েন্সি মেশিনে সাধারণত
কম ফেনা তৈরি করে এমন নির্দিষ্ট ডিটারজেন্ট প্রয়োজন হয়।
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ডিটারজেন্ট ব্যবহার
করাও ঠিক নয়। এতে কাপড়ে অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে এবং মেশিনের ভেতরেও জমা হতে পারে।
তাই ডিটারজেন্টের প্যাকেট ও মেশিন প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিমাণ ব্যবহার
করুন।
ভুল ক্লিনার ব্যবহার নয়:
মেশিন পরিষ্কার করতে গিয়ে একসঙ্গে ভিনেগার,
ব্লিচ বা বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে ব্যবহার করা উচিত নয়। ভুল রাসায়নিক মেশিনের বিভিন্ন
অংশের ক্ষতি করতে পারে। তাই মেশিনের মডেলের জন্য প্রস্তুতকারক যে পরিষ্কার করার পদ্ধতি
ও পণ্য অনুমোদন করেছে, সেটিই অনুসরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ।
প্রতিদিনের কাজকে সহজ করে দেওয়া এই যন্ত্রটির
জন্য যত্নও খুব বেশি নয়। নিয়মিত পরিষ্কার, সঠিক ডিটারজেন্ট এবং পরিমিত কাপড়—এই কয়েকটি অভ্যাসই
ওয়াশিং মেশিনকে দীর্ঘদিন ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
ঢাকা/টিএ