সন্তানের প্রথম বন্ধু, প্রথম আশ্রয়—মা

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: খালেদা আক্তার সিনথিয়া, সাইয়ারা রহমান, সারীম রহমান
ছবি: খালেদা আক্তার সিনথিয়া, সাইয়ারা রহমান, সারীম রহমান

মুখে উচ্চারিত প্রথম ডাক, কপালে স্নেহভরা স্পর্শ কিংবা নিঃস্বার্থ ত্যাগ, মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর অনুভূতির নামই যেন “মা”। পৃথিবীতে এমন কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে প্রত্যাশার চেয়ে ভালোবাসা বেশি। কিন্তু মা বরাবরই ব্যতিক্রম। শিশুর পৃথিবী শুরু হয় মায়ের কণ্ঠস্বর দিয়ে। মায়ের স্পর্শে সে নিরাপত্তা খুঁজে পায়, মায়ের চোখে দেখে ভালোবাসার প্রথম প্রতিচ্ছবি। বয়স বাড়ে, পৃথিবী বদলায়, মানুষের সংখ্যা বাড়েতবু মায়ের কাছে ফিরে আসার প্রয়োজনটি কোথাও যেন ফুরোয় না।


মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানের সঙ্গে মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে শিশু নিজের অনুভূতি, ভয়, দুশ্চিন্তা ও সমস্যার কথা সহজে মায়ের কাছে বলতে শেখে। এতে শিশুর মানসিক নিরাপত্তাবোধ বাড়ে এবং আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়।




মা দিয়ে সন্তানের পৃথিবী চেনা-


একটি শিশু যখন প্রথম পৃথিবীর আলো দেখে, তখন তার চেনা পৃথিবী বলতে মায়ের মুখ, মায়ের কণ্ঠ আর মায়ের স্পর্শ। ক্ষুধায়, অস্বস্তিতে কিংবা ভয় পেলে সে কাঁদে; আর সেই কান্নার ভাষা বুঝতে সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসেন মা। শিশুটি তখনও কথা বলতে শেখেনি, কিন্তু মা যেন তার না-বলা কথাগুলোও বুঝে ফেলেন।

এইভাবেই শুরু হয় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলোর একটিমা ও সন্তানের সম্পর্ক।


মায়ের কাছে ‘বলা যায়’ সব কথা-

শৈশবে একটি শিশু পড়ে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথা পেলে মায়ের কাছে ছুটে যায়। স্কুলে প্রথম দিন ভয় পেলে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে। পরীক্ষায় ভালো করলে আনন্দটা সবার আগে মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়। আবার কোনো কারণে মন খারাপ হলেও মায়ের কাছেই এসে চুপচাপ বসে থাকে।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই তৈরি হয় বিশ্বাস।

সন্তান যখন অনুভব করে“আমি যা-ই বলি, মা অন্তত আমার কথাটা শুনবেন”তখন মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু অভিভাবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মা হয়ে ওঠেন তার বন্ধু।

 



শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, মা যদি শুধু শাসনকারী হিসেবে নয়, সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে পাশে থাকেন, তাহলে শিশুর সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশ আরও সুস্থভাবে ঘটে। তবে বন্ধুত্ব মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়; ভালোবাসার পাশাপাশি বয়স উপযোগী নিয়ম ও সীমারেখাও থাকা জরুরি।



শাসনের চেয়ে কখনো কখনো প্রয়োজন একটু বেশি শোনা-


সন্তানের ভালো চাওয়ার জায়গা থেকেই মা অনেক সময় শাসন করেন, নিষেধ করেন, ভুল ধরিয়ে দেন। কিন্তু সন্তান যখন একটু বড় হয়, তখন শুধু নির্দেশ নয়তার প্রয়োজন হয় একজন মনোযোগী শ্রোতার।




সে কেন চুপ করে আছে?


কোন কথায় তার মন খারাপ হয়েছে?


বন্ধুর সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না?


কোনো ভয় তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছে কি না?


এসব প্রশ্নের উত্তর সবসময় সরাসরি পাওয়া যায় না। কখনো সন্তান কথা বলতে চায় না। কখনো দরজা বন্ধ করে একা থাকতে চায়। সেই সময়টুকুতেও মায়ের ধৈর্য প্রয়োজন।


কারণ, সন্তানকে সবসময় কথা বলাতে হয় না। কখনো কখনো তাকে শুধু জানিয়ে দিতে হয়“তুমি যখন বলতে চাইবে, আমি শুনব।”


এই একটি বাক্যই সন্তানের মনে তৈরি করতে পারে নিরাপদ একটি আশ্রয়।


চিন্তাশক্তির প্রসার: 


শিশুর ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা বিকাশেও মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা যখন সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন, গল্প করেন, গান শোনান, প্রশ্ন করেন, তখন শিশুর ভাষাগত বিকাশের পাশাপাশি তার চিন্তাশক্তিও প্রসারিত হয়। একই সঙ্গে শিশু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে।


ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের গবেষণায় গবেষকরা বলেন, ‘শিশুর দেহে বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টিকারী জিন মায়ের কাছ থেকেই আসে। মানবদেহের ‘এক্স’ক্রোমোজোমের মাঝেই থাকে বুদ্ধিমত্তার জিন।’

 

কৈশোরে দূরত্ব নয়, দরকার বন্ধুত্ব: 


সন্তান যখন বড় হতে থাকে, তার নিজের একটি পৃথিবী তৈরি হয়। বন্ধু, পড়াশোনা, স্বপ্ন, ভালো লাগা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসবকিছু মিলিয়ে সেই পৃথিবী ক্রমেই মায়ের পরিচিত জগতের বাইরে যেতে থাকে।


এই সময়টাতেই অনেক মা-সন্তানের সম্পর্কে অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়।


সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে তার সঙ্গে কথা বলা, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভুল করার সুযোগ দেওয়া জরুরি। কারণ, সন্তানকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে যদি তার প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে সে হয়তো সমস্যার কথা বলা বন্ধ করে দিতে পারে।


বরং এমন একটি সম্পর্ক প্রয়োজন, যেখানে সন্তান জানবেভুল করলে মা রাগ করতে পারেন, কিন্তু তাকে ছেড়ে যাবেন না।


মায়ের দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহারনিরাপত্তাবোধ-


সন্তানের জন্য মায়ের সবচেয়ে বড় উপহার সবসময় খেলনা, পোশাক কিংবা দামি কোনো জিনিস নয়। তার চেয়েও মূল্যবান হলো একটি নিরাপদ মানসিক জায়গা।


যেখানে সে কাঁদতে পারে।


ভুল স্বীকার করতে পারে।


নিজের দুর্বলতার কথা বলতে পারে।


নিজের স্বপ্নের কথা বলতে পারে।


এমনকি পৃথিবীর সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা কথাটিও মাকে বলতে পারে।


এই নিরাপত্তাবোধ শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে শিশু জানে, তার পাশে একজন মানুষ আছেন, সে ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়াতেও শেখে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘জীবনের প্রথম পাঁচ বছর শিশুর মানসিক গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শিশুর সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে মা-ই হয়ে ওঠেন তার প্রথম শিক্ষক, নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রথম রোল মডেল।’


সময়ের সঙ্গে বদলায় মা-সন্তরের সম্পর্ক

একসময় যে সন্তান মায়ের হাত ধরে হাঁটতে শিখেছিল, সেই সন্তানই একদিন নিজের জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করে। স্কুলের ব্যাগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বই, তারপর চাকরি, সংসার, নিজের ব্যস্ততাজীবনের প্রতিটি ধাপে দূরত্ব হয়তো বাড়ে।


কিন্তু দূরত্ব মানেই সম্পর্কের শেষ নয়। হয়তো প্রতিদিন ফোন করা হয় না। হয়তো একই ছাদের নিচে থাকা হয় না। হয়তো মায়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করার সময়ও থাকে না। তবু মায়ের ফোনের ওপাশ থেকে আসা সেই চেনা প্রশ্ন“খেয়েছিস?”আজও সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে থাকে।


মায়েরও তো একজন বন্ধু প্রয়োজন: 


মা মানেই সবসময় শক্ত থাকতে হবেএমন নয়। মায়েরও ক্লান্তি আছে, অভিমান আছে, নিজের না-বলা গল্প আছে। সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের দিকটাও বোঝা জরুরি।


একসময় মা যেমন সন্তানের কথা শুনেছেন, বড় হয়ে সন্তানও যেন মায়ের কথা শোনে। মায়ের পছন্দ-অপছন্দ, স্বপ্ন, একাকিত্ব কিংবা ছোট্ট কোনো আনন্দকে গুরুত্ব দেয়।


কারণ, মা শুধু একজন মা ননতিনি একজন মানুষও।


শেষ বিকেলের মতো থেকে যায় কিছু সম্পর্ক-


জীবনে অনেক মানুষ আসে, অনেকেই হারিয়ে যায়। বন্ধুত্ব বদলায়, সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলায়, ঠিকানা বদলায়। কিন্তু মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটির ভেতরে এমন এক শিকড় থাকে, যা সহজে উপড়ে ফেলা যায় না।






শৈশবে মা ছিলেন হাত ধরে হাঁটার মানুষ।


কৈশোরে তিনি ছিলেন নিরাপদ আশ্রয়।


যৌবনে তিনি হয়ে ওঠেন নীরব শুভাকাঙ্ক্ষী।


আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো বোঝা যায়মায়ের মতো করে কেউ কোনোদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করেনি।


তাই সন্তানের প্রথম বন্ধু, প্রথম শিক্ষক কিংবা প্রথম আশ্রয়এই পরিচয়গুলো মায়ের জন্য শুধু শব্দ নয়। এগুলো একটি শিশুর জীবনে মায়ের রেখে যাওয়া সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার।


সন্তান বড় হয়ে পৃথিবী জয় করুকমায়ের চাওয়া হয়তো এতটুকুই। আর সেই পৃথিবীর ভিড়ে সন্তান যেন কখনো ভুলে না যায়, তার জন্য একটি দরজা সবসময় খোলা ছিল। সেই দরজার ওপাশে ছিলেন একজন মানুষযিনি তাকে প্রথম ভালোবেসেছিলেন, কোনো শর্ত ছাড়াই।


তিনিমা।


ঢাকা/টিএ

 

sidebar ad