শিশুকে অর্থের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন, ভবিষ্যৎটা সহজ হবে

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

আপনার সন্তান কি বারবার খেলনা, চিপস, চকোলেট কিংবা নতুন কোনো গ্যাজেটের জন্য আবদার করে? চাওয়া মাত্রই কি আপনি অনেক সময় তা কিনে দেন? কখনো কি ভেবে দেখেছেন, শিশুটি কেন বুঝতে পারছে না—সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না?


কারণ, ছোটবেলা থেকেই আমরা তাকে টাকার মূল্য, আয়-ব্যয় কিংবা অপেক্ষা করার অভ্যাস শেখাই না। বরং অনেক সময় সন্তান যেন কোনো কষ্ট না পায়, মন খারাপ না করে—সেই চিন্তা থেকেই তার প্রায় সব আবদার পূরণ করে দিই। অথচ সামান্য অপেক্ষা, কিছুটা সীমাবদ্ধতা এবং নিজের সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করার অভিজ্ঞতাই শিশুকে ভবিষ্যতের জন্য বাস্তববাদী করে তুলতে পারে।


ছোটবেলা থেকেই অর্থের সঙ্গে পরিচয়


জাপানে শিশুদের আর্থিক শিক্ষা দেওয়ার ওপর বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকেই তাদের সঞ্চয়, খরচ এবং অর্থের মূল্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার নানা উদ্যোগ দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে শিশুরা নিজের নামে সঞ্চয় হিসাবও রাখে এবং অভিভাবকের সহায়তায় নিজের অর্থ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে।


এর পেছনে মূল ভাবনাটি খুব সহজ—শিশুকে শুধু টাকা দেওয়া নয়, টাকার দায়িত্ব নিতে শেখানো।


একটি শিশু যখন বুঝতে শেখে যে টাকা সীমিত, তখন সে ধীরে ধীরে প্রয়োজন আর শখের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখে। আজ সব টাকা খরচ করলে আগামীকাল হাতে কম থাকবে—এই সাধারণ হিসাবটিও তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে।


চাইলেই সব পাওয়া নয়


আমরা অনেক সময় ভাবি, ‘আমার সন্তান যেন কোনো কষ্ট না পায়।’ তাই সে খেলনা চাইলে খেলনা, নতুন পোশাক চাইলে পোশাক, দামি ফোন চাইলে ফোন—সাধ্যমতো সবই দিয়ে দিই।


কিন্তু এতে একটি সমস্যা তৈরি হতে পারে। শিশু যদি কখনো অপেক্ষা করতে না শেখে, তাহলে তার কাছে ‘চাওয়া’ আর ‘পাওয়া’ প্রায় একই বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।


একসময় স্কুলের টিফিনের টাকাও তার কাছে কম মনে হতে পারে। বন্ধুর দামি ফোন, ল্যাপটপ কিংবা বাইক দেখে তারও সেটি চাইতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু কীভাবে সেই টাকা আসবে, পরিবারের সামর্থ্য কতটুকু, কোন জিনিসটি প্রয়োজন আর কোনটি শুধু শখ—এসব প্রশ্ন তার চিন্তার অংশ নাও হতে পারে।


তাই শিশুকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সব আবদার সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করাও তার ভবিষ্যৎ আর্থিক আচরণের জন্য ভালো শিক্ষা নয়।


বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সমস্যাটা আরও বড় হতে পারে


ছোটবেলায় অর্থ ব্যবস্থাপনার অভ্যাস না থাকলে বড় হওয়ার পর এর প্রভাব দেখা যায়। ধরুন, আপনার সন্তান কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে এবং হোস্টেল কিংবা মেসে থাকছে। আপনি হিসাব করে পুরো মাসের খরচ পাঠালেন।


কিন্তু সে যদি আগে থেকেই টাকা ব্যবস্থাপনা না শিখে থাকে, তাহলে অল্প দূরত্বেও রিকশা বা রাইড শেয়ারিং, প্রয়োজনের বাইরে অনলাইন কেনাকাটা, বন্ধুদের হুটহাট ট্রিট দেওয়া কিংবা রেস্টুরেন্টে অতিরিক্ত খরচ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।


ফলে মাসের মাঝামাঝি কিংবা শেষ দিকে টাকা শেষ হয়ে যেতে পারে। তখন সন্তান আবার বাড়িতে ফোন করে টাকা চাইবে।


এই পরিস্থিতিতে শুধু বকাঝকা করে খুব একটা লাভ নেই। বরং ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো ভালো—টাকা সীমিত, তাই সিদ্ধান্তও হিসাব করে নিতে হয়।


শিশুকে কীভাবে শেখাবেন?


এর জন্য আলাদা কোনো বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনই হতে পারে শিশুর প্রথম ‘ফাইন্যান্স ক্লাস’।


বাজারের তালিকা করতে দিন


শিশু লিখতে শিখলেই তাকে বাজারের তালিকা করতে দিন। কোন জিনিস জরুরি, কোনটি পরে কেনা যাবে—সেটিও বোঝান।


সঙ্গে করে বাজারে নিন


দোকানে গিয়ে পণ্যের দাম দেখান। নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে কীভাবে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যায়, তা বুঝতে দিন।


টাকা লেনদেনের অভিজ্ঞতা দিন


দোকানদারকে টাকা দেওয়া, ফেরত টাকা নেওয়া, রিকশার ভাড়া দেওয়া—এসব ছোট অভিজ্ঞতা শিশুকে অর্থের বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেয়।


আবদারে একটু অপেক্ষা শেখান


কোনো খেলনা বা অন্য কিছু চাইলে সব সময় সঙ্গে সঙ্গে কিনে না দিয়ে বলতে পারেন, ‘এখন নয়, আগামী মাসে বাজেট হলে দেখা যাবে।’ এতে শিশু বুঝবে, টাকা এলেই সঙ্গে সঙ্গে খরচ করা যায় না।


নিজের কাজের গল্প বলুন


আপনি কীভাবে আয় করেন, একটি নির্দিষ্ট জিনিস কিনতে কতটা পরিশ্রম করতে হয়—বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় তাকে বোঝান। পারিবারিক আর্থিক সংকটের সব খুঁটিনাটি জানানো প্রয়োজন নেই; তবে অর্থের মূল্য ও পরিশ্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া জরুরি।


সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করুন


শিশুকে ছোট একটি সঞ্চয় বাক্স বা সঞ্চয়ের ব্যবস্থা দিতে পারেন। সে কত টাকা জমাল, কত খরচ করল—সেটার হিসাব রাখার অভ্যাস তৈরি করুন।


জরুরি সঞ্চয়ের কথা বোঝান


কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে কিংবা হঠাৎ কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে কেন আগে থেকে কিছু টাকা জমিয়ে রাখা দরকার, সেটিও শিশুকে বোঝানো যায়।


শুধু টাকা নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়াও শেখানো


আর্থিক শিক্ষা আসলে শুধু টাকা গোনার শিক্ষা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপেক্ষা করার ক্ষমতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল মেনে নেওয়া।


আজ একটি খেলনা না কিনে টাকা জমালে কয়েক সপ্তাহ পর আরও পছন্দের কিছু কেনা সম্ভব—এই অভিজ্ঞতা শিশুকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে শেখায়। আবার ভুল জায়গায় টাকা খরচ করে ফেললে পরের কয়েক দিন কম খরচ করতে হবে—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।


এভাবেই ধীরে ধীরে শিশু বুঝতে শেখে—টাকা শুধু খরচ করার বিষয় নয়, এটি একটি দায়িত্বও।


ভবিষ্যতের জন্য আজকের শিক্ষা


সন্তানের জন্য আমরা ভালো স্কুল, ভালো কোচিং, ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভালো ক্যারিয়ার নিশ্চিত করতে যতটা চিন্তা করি, অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখানোর বিষয়টি অনেক সময় ততটা গুরুত্ব পায় না। কিন্তু জীবনের একটি পর্যায়ে তাকে নিজের আয়, খরচ, সঞ্চয়, প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। তখন পাশে থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমরা নিয়ে দিতে পারব না।


তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে টাকার সঙ্গে পরিচিত করুন। সব আবদার পূরণ না করে কখনো অপেক্ষা করতে দিন, নিজের ছোটখাটো খরচের হিসাব করতে দিন, সঞ্চয় করতে উৎসাহ দিন। মনে রাখবেন, সন্তানকে শুধু টাকা দেওয়া নয়, টাকার দায়িত্ব নিতে শেখানোই তাকে সত্যিকারের স্বনির্ভর করে তুলবে।


কারণ ভবিষ্যতে সে কত টাকা আয় করবে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সে সেই টাকা কীভাবে ব্যবহার করবে।

sidebar ad