খাবার নিয়ে আপত্তি, পছন্দমতো আয়োজন না হওয়া, কাবিন নিয়ে দর-কষাকষি—বিয়ের মতো একটি সম্পর্কের শুরুতেই যখন ‘দাবি’ বড় হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন থাকে, এই সংস্কৃতির শেষ কোথায়?
বিয়ের বাড়ি মানেই আনন্দ, উৎসব, আত্মীয়স্বজনের ভিড় আর নানা রকম আয়োজন। বিশেষ করে আমাদের সমাজে কনের বাড়ির ওপর থাকে বাড়তি চাপ—বরপক্ষকে আপ্যায়ন করতে হবে, খাবারে যেন কোনো কমতি না থাকে, বরযাত্রী যেন খুশি থাকে, আয়োজন নিয়ে যেন কেউ কোনো অভিযোগ না তোলে। আর এই প্রত্যাশার ভার অনেক সময় এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে বিয়ের আসরও হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘পরীক্ষার মঞ্চ’—কনের পরিবারকে প্রমাণ করতে হয়, তারা বরপক্ষকে কতটা সন্তুষ্ট করতে পেরেছে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—মেয়ের বাড়িতে মনমতো খাবার না পেলে কি বিয়ে ভেঙে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে?
আস্ত খাসি না থাকায় বিয়েই হলো না
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার তোলাতলা গ্রামের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। গত সোমবার, ১৭ আগস্ট, বিয়ের আয়োজন ছিল কনের বাড়িতে। কসবার নিয়ামতপুর গ্রামের জুনায়েদ মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আখাউড়ার রাশেদা আক্তারের। বরপক্ষের প্রায় ১৫০ জনসহ দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজনের খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে বর, তাঁর ভাই ও চাচার জন্য তিনটি বড় ডালায় বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়। কিন্তু সেখানে আস্ত খাসি না থাকায় আপত্তি জানান বর জুনায়েদ মিয়া।
বিষয়টি নিয়ে কনেপক্ষের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে কনের পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, এই ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হবে না।
কনের বাবা সফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, খাসি দেওয়ার কথা আগে নির্ধারিত ছিল না। বরকে তিনি জানিয়েছিলেন, বিয়ের পরের অনুষ্ঠানে আস্ত খাসি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।
বরপক্ষকে খাওয়ানোর পর উপহারসামগ্রী ও স্বর্ণালংকারসহ তাঁদের বিদায় করে দেওয়া হয়।
তবে ঘটনার আরেকটি দিকও সামনে এসেছে। বর জুনায়েদ মিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, খাবারের পর কনেপক্ষ পূর্বনির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে ১০ গুণ বেশি কাবিন দাবি করেছিল এবং এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির পর তাঁদের বিয়ের আসর থেকে বের করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একই ঘটনার দুটি ভিন্ন বয়ান রয়েছে।
কিন্তু যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো—বিয়ের আসরে খাবার নিয়ে বিরোধ।
ঘটনা নতুন নয়
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক বাস্তবতা নয়। বিয়ের আয়োজনকে ঘিরে খাবার, উপহার, বরযাত্রী আপ্যায়ন কিংবা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কনেপক্ষকে বিব্রত করার ঘটনা মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। কখনো শোনা যায়, বরযাত্রীর সংখ্যা নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। কখনো খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ। কখনো নির্দিষ্ট পদ না থাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানেই অসন্তোষ। আবার কখনো উপহার বা স্বর্ণালংকার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
কিছু ঘটনায় সামান্য বিষয় থেকে দুই পরিবারের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে ঘটনাগুলো মুহূর্তেই আলোচনায় চলে আসে।
এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যেখানে খাবার কম দেওয়া, পছন্দের পদ না থাকা কিংবা বরযাত্রীদের যথাযথ আপ্যায়ন না করার অভিযোগে বিয়ের আসর উত্তপ্ত হয়েছে। কোথাও বিয়ে ভেঙেছে, কোথাও আবার অনুষ্ঠান শেষ হলেও দুই পরিবারের সম্পর্কের মধ্যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি ঘটনার বিবরণ আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় মিল আছে—বিয়েকে সম্পর্কের বদলে আপ্যায়ন ও প্রত্যাশা পূরণের প্রতিযোগিতায় পরিণত করা।
কেন বরপক্ষের ‘অধিকার’ এত বড়?
আমাদের সামাজিক কাঠামোয় বিয়েকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে দেখা হয়, যেখানে কনের পরিবারকে ‘দিতে’ হবে আর বরপক্ষ ‘নেবে’। কনের পরিবারকে ভালো খাবার দিতে হবে, ভালোভাবে আপ্যায়ন করতে হবে, উপহার দিতে হবে, বরযাত্রীকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বিপজ্জনক মানসিকতা—“মেয়েকে তো আমরা নিয়ে যাচ্ছি।”
ফলে মেয়ের পরিবারকে কখনো কখনো এমন এক অবস্থানে দাঁড় করানো হয়, যেখানে সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও আয়োজন করতে হয়। কারণ, একটু কম হলেই ‘মান-সম্মান’ থাকবে না, আত্মীয়স্বজন কথা বলবে, বরপক্ষ অসন্তুষ্ট হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষকে বিয়ে করার সঙ্গে তার পরিবারের কাছ থেকে আপ্যায়নের একটি নির্দিষ্ট মান পাওয়ার অধিকার কীভাবে যুক্ত হয়ে গেল? একটি বিয়ের সম্পর্ক যদি শুরুই হয় খাবারের পদ, উপহার কিংবা অর্থের হিসাব দিয়ে, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিত্তিটা আসলে কোথায়?
কনের পরিবারের ওপর এত চাপ কেন?
একজন মেয়ের বাবা-মা মেয়ের বিয়েতে সাধ্য অনুযায়ী আয়োজন করতে চান। কিন্তু ‘সাধ্য’ আর ‘সামাজিক প্রত্যাশা’ এক জিনিস নয়। বরযাত্রী ৫০ জন হলে ১০০ জনের খাবার রাখতে হবে। বরকে আলাদা খাবার দিতে হবে। বিশেষ পদ থাকতে হবে। দামি উপহার দিতে হবে। কোথাও আবার স্বর্ণালংকার, আসবাব, নগদ টাকা—সবকিছুর প্রত্যাশা তৈরি হয়।
এই চাপের সবচেয়ে বড় শিকার হন মেয়ের বাবা-মা।
অথচ বিয়ে দুটি মানুষের সম্পর্ক। দুই পরিবারের আনন্দের অনুষ্ঠান। সেখানে এক পক্ষের ওপর আরেক পক্ষের সন্তুষ্টির দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া কেন?
খাবার কী মানুষের চরিত্রের পরীক্ষা নয়?
আখাউয়ার ঘটনাটিতে আস্ত খাসি ছিল কি না—এটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা আছে। পুরো ঘটনার সত্যতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যই বিবেচ্য। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। একজন মানুষ তাঁর পছন্দের খাবার না পেয়ে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, সেটি কি তাঁর ব্যক্তিত্বেরও একটি পরিচয় নয়?
বিয়ের দিন সবকিছু মনের মতো হবে—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? খাবারের একটি পদ কম হতে পারে। ফুলের তোড়া পছন্দের মতো নাও হতে পারে। চেয়ার, সাজসজ্জা, মেনু—কোনো কিছুতেই শতভাগ মিল নাও থাকতে পারে। কিন্তু এসব নিয়ে অপমান, রাগ, হুমকি কিংবা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার মতো আচরণ কি গ্রহণযোগ্য? বরং বিয়ের দিনই তো বোঝা যায়, মানুষটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কীভাবে আচরণ করেন।
‘বরযাত্রী’ মানেই কী বাড়তি সুবিধা?
আমাদের বিয়ের সংস্কৃতিতে বরযাত্রীকে ঘিরে এক ধরনের বিশেষ মর্যাদা তৈরি হয়েছে। তাঁদের জন্য আলাদা আয়োজন, আলাদা খাবার, বিশেষ আপ্যায়ন—সবই যেন বাধ্যতামূলক। আনন্দের অংশ হিসেবে আপ্যায়ন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেটি যখন দাবি হয়ে যায়, তখনই সমস্যা।
একজন অতিথি খাবার পছন্দ না করলে অন্য খাবার চাইতে পারেন। কোনো বিষয়ে অসুবিধা হলে ভদ্রভাবে জানাতে পারেন। কিন্তু অতিথি হিসেবে নিজের অবস্থান ভুলে গিয়ে আয়োজককে অপমান করা কিংবা বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে খাবারের সঙ্গে যুক্ত করা নিছক অশোভন আচরণ নয়; এটি ক্ষমতার একটি সামাজিক প্রদর্শনও।
‘মেয়েপক্ষ’ আর ‘বরপক্ষ’—এই বিভাজনটাও বদলাতে হবে
বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘মেয়েপক্ষ’ ও ‘বরপক্ষ’—এই দুটি শব্দের ব্যবহার আমাদের সামাজিক বিভাজনকে আরও শক্তিশালী করে।
কেন একটি পক্ষ দেবে আর অন্য পক্ষ নেবে?
কেন মেয়ের পরিবারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা যথেষ্ট ভালো আয়োজন করতে পেরেছে?
কেন বরপক্ষের সন্তুষ্টিকে বিয়ের সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হবে?
বরং বিয়ের দিন হওয়া উচিত দুই পরিবারের সমান আনন্দের দিন। খাবারও হওয়া উচিত দুই পক্ষের সামর্থ্য ও সম্মতির ভিত্তিতে। উপহার থাকলে তা হবে ভালোবাসা থেকে, চাপ থেকে নয়।
বিয়ে টিকিয়ে রাখার চেয়ে কখনো বিয়ে না করাই ভালো
আখাউয়ার ঘটনায় কনের পরিবার শেষ পর্যন্ত বিয়ে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সামাজিকভাবে নানা মত থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বিয়ের আগেই যদি আচরণে অসম্মান, অযৌক্তিক দাবি বা অন্য পক্ষকে ছোট করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ বিয়ের পর এই প্রত্যাশাগুলো সাধারণত কমে যায় না; বরং আরও বাড়তে পারে।
আজ খাবারের পদ নিয়ে অভিযোগ, কাল উপহার নিয়ে অসন্তোষ, পরদিন হয়তো অন্য কোনো বিষয়ে দাবি। তাই বিয়ের আগে একটি লাল সংকেতকে ‘ছোট বিষয়’ বলে এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে তার মূল্য আরও বড় হতে পারে।
বরপক্ষকে বুঝতে হবে—কনের বাড়িতে গিয়ে খাবার খাওয়া কোনো অধিকার আদায়ের বিষয় নয়, এটি একটি অতিথি হিসেবে পাওয়া আপ্যায়ন। কনেপক্ষকেও বুঝতে হবে—বরপক্ষকে খুশি করার জন্য নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে আয়োজন করা বাধ্যতামূলক নয়।
আর পরিবারগুলোকে বুঝতে হবে—বিয়েতে যত বেশি প্রদর্শন, দাবি ও প্রতিযোগিতা থাকবে, সম্পর্কের জায়গা তত সংকুচিত হবে। একটি মেয়ের বাবা-মা তাদের সন্তানকে বিয়ে দিচ্ছেন; কোনো ‘প্যাকেজ’ তুলে দিচ্ছেন না। একজন ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছে; সে কোনো অনুষ্ঠানের ‘ভিআইপি অতিথি’ হয়ে যাচ্ছে না।
ঢাকা/আরএস