একজন নারী কতবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন?

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত


বিয়ে, সংসার, চাকরি হারানো, প্রতারণা, সন্তান বড় করা—জীবনের একেকটি ধাক্কা যেন একজন নারীকে বারবার শূন্যে দাঁড় করায়। কিন্তু শূন্য থেকে কি আবার শুরু করা যায়? যায়। যতবার প্রয়োজন, ততবার।একজন নারী কতবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন?


একবার?


দুবার?


নাকি যতবার জীবন তাকে ভেঙে দেয়, ততবার?


একজন নারীর জীবনে বিচ্ছেদ, চাকরি হারানো, প্রতারণা কিংবা স্বপ্নভঙ্গ শুধু ব্যক্তিগত সংকট হয়ে থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় সমাজের বিচার, পরিবারের প্রত্যাশা, সন্তানের দায়িত্ব এবং ‘মানুষ কী বলবে’—এই চিরচেনা ভয়।


ডিভোর্সের পর যখন চারপাশ থেকে শোনা যায়, ‘এবার তোমার জীবন শেষ’, তখনও একজন নারী নতুন করে শুরু করতে পারেন। চাকরি হারানোর পর যখন মনে হয় নিজের পরিচয়টিই যেন হারিয়ে গেছে, তখনও তিনি শূন্য থেকে পথ তৈরি করতে পারেন। সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষটি যখন প্রতারণা করেন, তখনও কান্না মুছে আবার বিশ্বাস করতে শেখা সম্ভব।


সন্তান বড় করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নগুলো বছরের পর বছর পিছিয়ে যায় অনেক নারীর। কিন্তু একদিন সন্তান একটু বড় হলে, দায়িত্বের ভিড় কিছুটা কমলে, তিনি নিজের জন্য আবার একটি সকাল বেছে নিতে পারেন।


অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, একজন পুরুষের জীবনে ব্যর্থতা এলে আমরা প্রায়ই বলি, ‘সময়টা খারাপ যাচ্ছে।’ আর একই ঘটনা একজন নারীর জীবনে ঘটলে প্রশ্ন আসে—‘কী ভুল করেছিলে?’


‘সংসারটা ধরে রাখতে পারলে না?’


‘চাকরিটা গেল কেন?’


‘সন্তান সামলে নিজের জীবন নিয়ে এত ভাবার কী আছে?’


অর্থাৎ একজন নারী শুধু নিজের কষ্টটুকু বহন করেন না, সেই কষ্টের জন্য তাঁকে জবাবদিহিও করতে হয়।


তবু তিনি উঠে দাঁড়ান।


কারণ জীবন তাঁকে বারবার শিখিয়েছে—সব হারানো মানেই সব শেষ নয়।


নতুন শুরুর কোনো নির্দিষ্ট চেহারা নেই


নতুন করে জীবন শুরু করা মানেই সবকিছু বদলে ফেলা নয়। কখনো নতুন জীবন শুরু হয় একটি ছোট চাকরি দিয়ে। কখনো নিজের উপার্জনের প্রথম টাকা দিয়ে। কখনো সন্তানের হাত শক্ত করে ধরে। কখনো নিজের মতো করে সাজানো ছোট্ট একটি ঘর দিয়ে।


কখনো আবার বহু বছর পর নিজের পছন্দের পোশাক পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়—‘এই তো আমি।’


আর কখনো নতুন জীবন শুরু হয় খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে—


এবার থেকে আমি নিজেকেও গুরুত্ব দেব।


এই সিদ্ধান্তের কোনো বয়স নেই।


৪০ বছর বয়সে একজন নারী নতুন করে শুরু করতে পারেন। ৫০-এ পারেন। ৬০-এও পারেন। কারণ নতুন করে শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। আছে শুধু সাহস করে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার একটি মুহূর্ত।


নতুন জীবন মানেই নতুন মানুষ নয়


আমরা অনেক সময় মনে করি, নতুন করে জীবন শুরু করার অর্থ নতুন কোনো সম্পর্ক, নতুন কোনো শহর কিংবা নতুন কোনো পরিচয়। কিন্তু সব সময় তা নয়।


অনেক সময় নতুন জীবন মানে নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাটিকে ফিরে পাওয়া।


যে মেয়েটি একসময় গান গাইত, সে আবার গান শুরু করতে পারে। যে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, বহু বছর পর আবার বই খুলে বসতে পারে। যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল, সে নতুন করে কোনো কাজ শিখতে পারে।


যে নারী সারাজীবন পরিবারের সবার ভালো থাকার কথা ভেবেছেন, তিনিও একদিন নিজের ভালো থাকার কথা ভাবতে পারেন।


নিজের জন্য সময় রাখা, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের আয় তৈরি করা, নতুন কিছু শেখা—এসবও তো নতুন জীবনের অংশ।


তাহলে প্রশ্নটা কী হওয়া উচিত?


প্রশ্নটা হওয়া উচিত নয়—একজন নারী কতবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন?


প্রশ্নটা বরং হওয়া উচিত—


একজন নারীকে কেন বারবার ভেঙে যাওয়ার পরও একাই নিজেকে জোড়া লাগাতে হয়?


সমাজ যদি তাঁর পাশে দাঁড়ায়, তাঁকে বিচার না করে সুযোগ দেয়, তাঁর ভুলকে অপরাধে পরিণত না করে এবং সন্তান পালনের দায়িত্বকে শুধু তাঁর একার দায়িত্ব হিসেবে না দেখে, তাহলে একজন নারীর নতুন করে জীবন শুরু করা শুধু সম্ভবই নয়, অনেক সহজও হতে পারে।


একজন নারীকে সব সময় শক্ত হতে হবে—এই প্রত্যাশাটিও আসলে অন্য এক ধরনের চাপ। তাঁরও কাঁদার অধিকার আছে, ক্লান্ত হওয়ার অধিকার আছে, সাহায্য চাওয়ার অধিকার আছে। আবার উঠে দাঁড়ানোর আগে কিছুটা সময় থেমে থাকার অধিকারও আছে।


কারণ নতুন করে শুরু করা মানে সব সময় শক্ত মুখে সামনে এগিয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো ভেঙে পড়ার পর নিজেকে সময় দেওয়াও নতুন শুরুরই অংশ।


শেষ নয়, আরেকটি শুরু


আর যদি কেউ পাশে না-ও থাকে?


তবু মনে রাখা দরকার, জীবন একবার ভেঙেছে বলে জীবন শেষ হয়ে যায় না।


কখনো কখনো ভাঙা জায়গা দিয়েই আলো ঢোকে।


একটি সম্পর্ক শেষ হতে পারে। একটি চাকরি চলে যেতে পারে। কেউ প্রতারণা করতে পারে। কোনো স্বপ্ন পূরণ নাও হতে পারে। সন্তান বড় হয়ে নিজের পথে চলে যেতে পারে। বয়স বাড়তে পারে। কিন্তু এর কোনোটিই একজন নারীর জীবনের শেষ অধ্যায় নির্ধারণ করে দিতে পারে না।


তাই একজন নারী যতবার প্রয়োজন, ততবার নতুন করে শুরু করতে পারেন।


একবার নয়। দুবার নয়। প্রয়োজনে একশোবার।


কারণ তাঁর জীবন কোনো ব্যর্থ সম্পর্ক, কোনো চাকরি, কোনো প্রতারণা, কোনো সামাজিক রায় কিংবা বয়সের একটি সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়। শেষ হয়ে যাওয়া আর নতুন করে শুরু করার মাঝখানে কখনো কখনো শুধু একটি সিদ্ধান্তের দূরত্ব— আমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করবো।


ঢাকা/আরএস


sidebar ad