তোমার তো সন্তান নেই, এতো ব্যস্ততা কীসের?

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

সন্তান নেই বলেই একজন নারীর হাতে অফুরন্ত সময় থাকে, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কিন্তু যে নারীর সন্তান নেই  তাঁকে বলা হয়, তোমার তো সন্তান নেই, তোমার আবার এতো ব্যস্ততা কীসের? কেউ প্রশ্নের ছলে এই কথাগুলো বলেন, কেউবা একটু খোঁচা দিয়ে মজা নেন। মানে হলো, কখনো রসিকতায়, কখনো অভিযোগে, কখনো একেবারে স্বাভাবিক সত্যের মতো বলা হয় এটি। যেন একজন নারীর সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার সন্তান প্রতিপালন। 


আমাদের সমাজে এক অদৃশ্য হিসাব চালু আছে—সন্তান আছে মানেই ব্যস্ত, সন্তান নেই মানেই সময় আছে। একজন মা বললে, “আমি খুব ক্লান্ত,” আমরা সহজে বুঝি। কিন্তু একজন নারীর জীবন কী শুধু মাতৃত্বকে ঘিরেই আবর্তিত হয়? 


সন্তান না থাকা মানেই দায়িত্ব না থাকা নয়


যার সন্তান নেই, সেও নারীও চাকরি করেন, ব্যবসা করেন, পড়াশোনা করেন, সংসার সামলান, বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন, অসুস্থ স্বজনের পাশে থাকেন। রান্না, ঘর পরিষ্কার, বাজারের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পারিবারিক সম্পর্ক ধরে রাখার অদৃশ্য কাজ—এসবেরও সময় লাগে। 


গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা বিপুল সময় ব্যয় করেন অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নের কাজে—যে শ্রমের বড় অংশই সমাজ ও অর্থনীতির প্রচলিত হিসাবের বাইরে থেকে যায়।


তবু সন্তান না থাকলে অনেকের ধারণা হয়, এই নারীর সময় অন্যদের জন্য সহজলভ্য। পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে বলা হয়, “তুমি একটু হাসপাতালে থাকো।” কোনো অনুষ্ঠানে বলা হয়, “তোমার তো বাচ্চা নেই, তুমি আগে চলে এসো।” ধীরে ধীরে তাঁর সময় যেন তাঁর নিজের না থেকে পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়।


সমাজ প্রায়ই নারীর অবসরকে বৈধতা দিতে চায় না—বিশেষ করে তিনি যদি মা না হন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব সন্তানহীন নারীর গল্প এক নয়। কেউ সন্তান চান না, কেউ এখনো সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন, কেউ বহু বছর ধরে চেষ্টা করছেন, কেউ সন্তান হারানোর শোক বহন করছেন।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় প্রতি ছয়জন মানুষের একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বন্ধ্যাত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানসিক চাপ, সামাজিক কলঙ্ক, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আর্থিক বোঝাও জড়িয়ে থাকতে পারে।


এরপরও প্রশ্ন আসে—“কবে সুখবর দেবে?” “ডাক্তার দেখাচ্ছ?” “এত দিন হয়ে গেল, বাচ্চা নিচ্ছ না কেন?” এগুলো নিছক কৌতূহল নয়; অনেক সময় এগুলো ব্যক্তিগত জীবনের ওপর সামাজিক নজরদারি।


আবার সন্তানহীন নারীদের নিয়ে একটি ধারণা হলো—তাঁদের জীবনে বুঝি সুখেরও অভাব। যেন সুখের একমাত্র নির্দিষ্ট পথ হলো বিয়ে, সন্তান, পরিবার। অথচ মাতৃত্ব অনেকের জীবনে গভীর আনন্দের উৎস হলেও, সেটিই নারীর সুখের একমাত্র সংজ্ঞা হতে পারে না।


একজন নারী শুধু সম্ভাব্য মা নন; তিনি একজন পূর্ণ মানুষ। তাঁর সময়, ক্লান্তি, স্বপ্ন, শোক, আনন্দ ও সিদ্ধান্ত—সবকিছুর নিজস্ব মূল্য আছে।


রোদসী মনে করে, একজন নারীর জীবনকে শুধু মাতৃত্বের মাপকাঠিতে নয়, একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার সময় এখনই।

sidebar ad