সব অপেক্ষার একটা ডেডলাইন থাকে

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

শুরুতে অপেক্ষার মধ্যে থাকে উত্তেজনা। তারপর আসে অভ্যাস। আর একসময় সেই অপেক্ষাই হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। তখন আমরা বুঝতে পারি—যেটার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছি, সেটার চেয়ে হয়তো অপেক্ষা করাটাই আমাদের বেশি বদলে দিয়েছে। ‘আর কত দিন?’- প্রশ্নটা হয়তো কাউকে করা হয়নি। তবু নিজের ভেতরে কতবার যে করা হয়েছে, তার হিসাব নেই।


শুরুতে অপেক্ষা ভালোই লাগে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটির একটি ফোন, বহুদিনের চাওয়া কোনো সুযোগ, চাকরির ফল, প্রিয় কারও ফিরে আসা, সম্পর্কের একটি সিদ্ধান্ত কিংবা নিজের কোনো স্বপ্ন—সবকিছুর জন্যই আমরা অপেক্ষা করতে পারি। কারণ তখন মনে হয়, একটু সময় লাগছে, এই যা। শেষ পর্যন্ত তো পাবই।


কিন্তু সময় যখন প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে যায়, তখন অপেক্ষার চরিত্র বদলে যেতে থাকে। প্রথমে থাকে আশা। তারপর অনিশ্চয়তা। এরপর অভ্যাস। আর একসময় আসে এক ধরনের নির্লিপ্ততা।


যেটা একসময় প্রতিদিন মনে পড়ত, সেটা আর প্রতিদিন মনে পড়ে না। যে ফোনটির জন্য বারবার মোবাইলের দিকে তাকানো হতো, একসময় সেটি না এলেও তেমন কিছু মনে হয় না। যে মানুষটির একটি কথার জন্য মন অস্থির থাকত, একসময় তাঁর কথাই হয়তো আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।


অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সব সময় জিনিসটি বদলায় না। অনেক সময় বদলে যাই আমরা।


অপেক্ষা কেন এত ক্লান্ত করে?


মনোবিজ্ঞানে অসম্পূর্ণ লক্ষ্য বা অসমাপ্ত কাজ মানুষের চিন্তায় সক্রিয় থাকার বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচিত। এটিকে ঘিরে ‘জাইগারনিক ইফেক্ট’ নামে একটি ধারণা জনপ্রিয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অসমাপ্ত কাজ সব সময় বেশি মনে থাকে—এমন সরল সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। ২০২৫ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে অসমাপ্ত কাজের স্মৃতিতে সার্বজনীন সুবিধা পাওয়া যায়নি; বরং অসমাপ্ত কাজ আবার শুরু করার প্রবণতার প্রমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া গেছে।


তবে অসম্পূর্ণ লক্ষ্য যে আমাদের মানসিকভাবে ব্যস্ত রাখতে পারে, তার পক্ষে গবেষণা রয়েছে। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, অপূর্ণ লক্ষ্য মানুষের মনোযোগ ও নির্বাহী কার্যক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। অর্থাৎ কোনো কিছু শেষ না হওয়া মানে শুধু সেটি না পাওয়া নয়; সেটি মনের ভেতর একটি ‘খোলা লুপ’ তৈরি করে রাখতে পারে।


আরও সাম্প্রতিক, ২০২৬ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ১৭টি গবেষণায় ২,৪৭৩ জন এবং ব্যক্তিভিত্তিক ১৪টি গবেষণায় ১২,১২৯ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, অসমাপ্ত কাজ অবসর সময়েও কাজসংক্রান্ত চিন্তা ও রুমিনেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত।


অর্থাৎ দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু ক্যালেন্ডারে দিন বাড়ায় না। কখনো কখনো মনের ভেতরও তার একটা খরচ জমতে থাকে।


চাওয়ারও কি একটা মেয়াদ আছে? সম্ভবত আছে।


আচরণবিজ্ঞানে ‘ডিলে ডিসকাউন্টিং’ নামে একটি ধারণা আছে। সহজ করে বললে, কোনো পুরস্কার বা কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে যত দেরি হয়, তার বর্তমান মান মানুষের কাছে তত কমে যেতে পারে।


২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ভবিষ্যতে পাওয়া নয়, সরাসরি ‘অপেক্ষা’ করতে হলে পুরস্কারের মূল্য আরও দ্রুত কমে যেতে পারে। গবেষকদের মতে, অপেক্ষার সময় অন্য আনন্দ বা বিকল্প অভিজ্ঞতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ কমে যাওয়াও এর একটি কারণ।


তাই যে জিনিসটি আজ খুব কাঙ্ক্ষিত, ছয় মাস পর সেটিই হয়তো একই রকম গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না।


এখানে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আমরা হয়তো জিনিসটিকে আর কম ভালোবাসি না; বরং দীর্ঘ অপেক্ষার অভিজ্ঞতা আমাদের সেই ভালোবাসার সঙ্গে ক্লান্তি, হতাশা এবং অনিশ্চয়তাকে জুড়ে দিয়েছে।


ফলে একসময় কাঙ্ক্ষিত জিনিসটির কথা ভাবলেই আনন্দের বদলে মনে পড়ে যায়—‘এত দিন ধরে তো অপেক্ষা করছি।’


তখন অভিমান জন্ম নেয়


দীর্ঘ অপেক্ষার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি সম্ভবত এখানেই।


কারও কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা করতে করতে যখন বারবার না পাওয়া হয়, তখন শুধু প্রত্যাশা কমে না, অভিমানও জমে।


‘আমাকে কি সত্যিই এতদিন অপেক্ষা করাতে হলো?’


প্রশ্নটি হয়তো মুখে আসে না। কিন্তু ভেতরে থেকে যায়।


সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এমন হয়। একজন মানুষ হয়তো প্রথম দিকে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন—কথা হবে, দেখা হবে, সম্পর্কটি একটি নাম পাবে, মানুষটি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবে। কিন্তু দিনের পর দিন অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে একসময় অপেক্ষা করার শক্তিটাই কমে যায়।


তখন মানুষটি হয়তো আর রাগও করেন না।


শুধু ভাবেন, ‘থাক।’


এই ‘থাক’ শব্দটির মধ্যে অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ লুকিয়ে থাকে।


পাওয়া গেলেও কেন আনন্দ কমে যেতে পারে?


আমরা সাধারণত ভাবি, এতদিন যে জিনিসটির জন্য অপেক্ষা করেছি, সেটি একদিন পেলে সব কষ্ট সার্থক মনে হবে।


সব সময় তা হয় না।


কারণ অপেক্ষা করতে করতে আমরা নিজেরাও বদলে যাই। আমাদের প্রয়োজন বদলায়, অগ্রাধিকার বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, আত্মপরিচয় বদলায়। যে মানুষটি ছয় মাস আগে একটি সুযোগকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে করেছিলেন, ছয় মাস পর হয়তো তাঁর কাছে অন্য কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এমনকি অপেক্ষার সময়টিও আমাদের প্রত্যাশাকে বদলে দিতে পারে।


গবেষণায় দেখা গেছে, অপেক্ষার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পুরস্কারের মূল্য কমে যাওয়ার প্রবণতা কেবল সময়ের হিসাব নয়; অপেক্ষার অভিজ্ঞতা নিজেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।


তাই কখনো কখনো বহুদিন পর কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি সামনে এলেও মনে হয়—‘এখন আর আগের মতো ভালো লাগছে না।’


এটি অকৃতজ্ঞতা নয়।


এটি হয়তো মানুষের পরিবর্তনশীলতার স্বাভাবিক অংশ।


সব অপেক্ষার কি সত্যিই ডেডলাইন থাকে?


ডেডলাইন বলতে এখানে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বোঝানো হচ্ছে না। বরং বোঝানো হচ্ছে মনের একটি সীমা।


কতদিন অপেক্ষা করলে একজন মানুষ ক্লান্ত হবেন, কতবার প্রত্যাশা পূরণ না হলে তিনি নিজের চাওয়াকে সরিয়ে রাখবেন—তার কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নেই।


কারও অপেক্ষার ক্ষমতা বেশি। কেউ আবার দ্রুত বুঝে ফেলেন, কোনো দরজার সামনে আর দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।


তবে নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—


‘আমি কি এখনো সত্যিই এটা চাই, নাকি শুধু এতদিন চেয়েছি বলেই অপেক্ষা করে যাচ্ছি?’


দুটির মধ্যে পার্থক্য অনেক।


কখনো আমরা কোনো মানুষকে চাই না, চাই আমাদের পুরোনো অনুভূতিটাকে ফিরে পেতে। কখনো কোনো সুযোগকে চাই না, চাই সেই সুযোগের সঙ্গে জুড়ে থাকা নিজের পুরোনো স্বপ্নটাকে। কখনো কোনো সম্পর্ক চাই না, শুধু চাই এতদিনের অপেক্ষাটা যেন বৃথা না যায়।


কিন্তু জীবনের সব অপেক্ষার শেষ প্রাপ্তিতে হয় না।


কিছু অপেক্ষার শেষ হয় ছেড়ে দেওয়ায়।


অপেক্ষা ছেড়ে দেওয়া মানেই হেরে যাওয়া নয়


অনেক সময় আমরা ভাবি, এতদিন যেহেতু অপেক্ষা করেছি, আরেকটু করি। এতদূর যেহেতু এসেছি, ফিরে যাব কেন?


কিন্তু দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ করেছি বলে একই সিদ্ধান্তে সারাজীবন আটকে থাকতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।


কখনো কখনো অপেক্ষা থেকে সরে আসা মানে নিজের সময়, মানসিক শান্তি এবং বর্তমান জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া।


অপূর্ণতার সঙ্গে বেঁচে থাকাও জীবনের অংশ।


সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। সব মানুষ ফিরে আসবে না। সব সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবে না। আর সব চাওয়া পূরণ হলেও যে আমরা আগের মতো খুশি হব, তার নিশ্চয়তাও নেই।


তাই হয়তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু ‘কখন পাব?’ নয়।


কখনো প্রশ্নটা হওয়া উচিত—


‘আর কতদিন অপেক্ষা করলে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলব?’


কারণ অপেক্ষারও একটি মূল্য আছে।


সময় দিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করতে হয়।


মন দিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করতে হয়।


কখনো কখনো নিজের বদলে যাওয়া দিয়েও।


আর সবচেয়ে অদ্ভুত সত্যিটা হলো—যে জিনিসটির জন্য আমরা এতদিন অপেক্ষা করেছি, সেটি হয়তো একদিন ঠিকই আসবে।


কিন্তু তখন হয়তো আমরা আর সেই মানুষটি থাকব না, যে একদিন সেটিকে পাওয়ার জন্য এতটা ব্যাকুল ছিল।


সূত্র: জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল সোশ্যাল সাইকোলজি

sidebar ad