মানসিক নির্যাতন: গায়ে হাত না তুলেও একজন মানুষকে ভেঙে দেওয়া যায়

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

কিছু আঘাত শরীরে দাগ ফেলে না। অথচ সেই আঘাতই কখনো কখনো একজন মানুষকে ভেতর থেকে সবচেয়ে বেশি ভেঙে দেয়। দাম্পত্যে নির্যাতন বললেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত মারধরের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু একজন মানুষকে ভাঙার জন্য সবসময় গায়ে হাত তোলার প্রয়োজন হয় না।



প্রতিদিনের অপমান, ভয় দেখানো, অবমূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রণ, দোষারোপ, অবহেলা কিংবা এমনভাবে বাস্তবতাকে ঘুরিয়ে দেওয়া

যাতে মানুষটি নিজের বিচারবুদ্ধি নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন, এসবও মানসিক নির্যাতনের অংশ হতে পারে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই নির্যাতন অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝাই যায় না।



একজন সুস্থ মানুষ কীভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন?


মানুষের মন ও শরীর আলাদা কোনো জগত নয়। দীর্ঘদিনের ভয় ও মানসিক চাপ শরীরের স্ট্রেস  রেসপন্স কে বারবার সক্রিয় রাখতে পারে।


ফলে একজন মানুষ সবসময় যেন বিপদের অপেক্ষায় থাকেন।


দিনের পর দিন যদি তাকে ভাবতে হয়,


“আজ আবার কী নিয়ে ঝামেলা হবে?”


“আমি কী বললে সে রেগে যাবে?”


“আমি কি আবার কোনো ভুল করে ফেললাম?”


“ও কি আমাকে ছেড়ে যাবে?”


“আমি কি সত্যিই এত খারাপ?”


তাহলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মন খারাপ, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, মনোযোগে সমস্যা, সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এসব দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ সবসময় সতর্ক ও ভীত অবস্থায় থাকতে পারেন।



এজন্যই কি প্যানিক অ্যাটাক হয়?

প্যানিক অ্যাটাক হলো হঠাৎ তীব্র ভয় বা অস্বস্তির একটি পর্ব। কখনো স্পষ্ট কোনো বিপদ ছাড়াও এটি শুরু হতে পারে। তখন শরীরের ফাইট অর ফ্লাইট ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে যেতে পারে।


ফলে হতে পারে


বুক ধড়ফড় করা,


শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মনে হওয়া,


বুক চাপ বা অস্বস্তি


ঘাম,


কাঁপুনি,


মাথা ঘোরা,


শরীর অবশ বা ঝিনঝিন করা,


নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়,


মনে হওয়া, “আমি বুঝি মারা যাচ্ছি!”

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ প্যানিকের একটি সম্ভাব্য trigger ট্রিগার হতে পারে। তবে প্যানিকের কারণ সবসময় সম্পর্কের সমস্যা নয় এবং একই উপসর্গের পেছনে শারীরিক কারণও থাকতে পারে।


তাই বিশেষ করে প্রথমবার বা তীব্র বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


 Narcissistic Personality Disorder নার্সিসিস্ট পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার  একটি মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস। 


তবে কিছু নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও মানসিক নির্যাতনের প্যাটার্ন  সম্পর্ককে অত্যন্ত ক্ষতিকর করে তুলতে পারে।


১. সব ভুলের দায় আপনার


নিজের ভুলের জন্যও এমনভাবে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয় যেন শেষ পর্যন্ত আপনিই দায়ী। “তুমি আমাকে বাধ্য করেছ।”

“তুমি এমন না করলে আমি এমন করতাম না।” একসময় মানুষ নিজের ভুলের পাশাপাশি অন্যের ভুলের দায়ও নিতে শুরু করেন।


২. গ্যাসলাইটিং


ঘটনা ঘটেছে কিন্তু বলা হচ্ছে, “এটা কখনোই হয়নি।” আপনি কষ্ট পেয়েছেন  “তুমি বেশি ভাবছ।” আপনি যা মনে রেখেছেন

"তোমার স্মৃতিই ভুল।” বারবার এমন হলে একজন মানুষ নিজের স্মৃতি ও বিচারবোধ নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করতে পারেন।


৩. সবসময় নিজেকে নির্দোষ দেখানো


ভুল করলেও ক্ষমা চাওয়ার বদলে নিজের কষ্টের গল্প সামনে আনা হয়। আপনি তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করলেন, অথচ কিছুক্ষণ পর আপনিই তাকে কষ্ট দিয়েছেন এমন একটি গল্প তৈরি হয়ে গেল।


৪. কথায় কথায় অপমান


চেহারা, বুদ্ধি, পরিবার, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ব্যক্তিত্ব যেকোনো বিষয়কে ব্যবহার করে আত্মসম্মানে আঘাত করা। প্রথমে হয়তো মজা করে বলা হয়। পরে সেটাই নিয়মিত অপমানের ভাষা হয়ে ওঠে।


৫. Silent treatment (সাইলেন্ট  ট্রিটমেন্ট) 


সমস্যা নিয়ে আলোচনা না করে ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বন্ধ করে দেওয়া, যোগাযোগ প্রত্যাহার করা বা দীর্ঘসময় উপেক্ষা করা যাতে অপরজন ভয় ও অনিশ্চয়তায় থাকেন।


৬. ভালোবাসাকে শর্ত বানানো


“আমার কথা শুনলে আমি তোমাকে ভালোবাসব।”


“আমার মতো না চললে তোমাকে দরকার নেই।”


ভালোবাসা তখন সম্পর্কের নিরাপদ জায়গা না হয়ে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে দাড়ায়।


৭. অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ


কার সঙ্গে কথা বলবেন, কোথায় যাবেন, কী পরবেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।

এটি যত বাড়তে থাকে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা তত সংকুচিত হয়।


৮. আপনাকে পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া


“তোমার পরিবার তোমাকে আমার বিরুদ্ধে লাগায়।” “ওই বন্ধুর সঙ্গে কথা বলবে না।” ধীরে ধীরে যদি একজন মানুষ তার নিজের support system (সাপোর্ট সিস্টেম)  হারিয়ে ফেলেন, তখন নির্যাতন থেকে বেরিয়ে আসা আরও কঠিন হতে পারে।


৯. Double standard(ডাবল স্ট্যান্ডার্ড) 


নিজের জন্য এক নিয়ম, সঙ্গীর জন্য আরেক নিয়ম। নিজে যা করতে পারেন, সঙ্গী তা করলে সেটাই “বিশ্বাসঘাতকতা”।


১০. অন্যের সঙ্গে তুলনা


“অমুকের স্ত্রী এমন।”


“অমুকের স্বামী তোমার চেয়ে ভালো।”


নিয়মিত তুলনা একজন মানুষের আত্মমর্যাদাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে পারে।


১১. হট এন্ড কোল্ড আচরণ


একদিন প্রচণ্ড ভালোবাসা, পরদিন সম্পূর্ণ অবহেলা। কখনো ক্ষমা চাওয়া, কখনো আবার একই আচরণ। এই অনিশ্চয়তা একজন মানুষকে সম্পর্কটিকে ধরে রাখার জন্য আরও বেশি চেষ্টা করতে বাধ্য করতে পারে।


১২. সীমারেখা অস্বীকার করা


আপনি বলছেন, “এই কথাটা আমাকে কষ্ট দেয়।” উত্তর আসছে, “তোমার এত সেনসিটিভ হওয়ার কী আছে?”- একটি সুস্থ সম্পর্কে “না” এবং ব্যক্তিগত বাউন্ডারি এর মূল্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।


১৩. জনসমক্ষে একরকম, ঘরে আরেকরকম


বাইরে অত্যন্ত ভদ্র, দায়িত্বশীল ও ভালো মানুষের পরিচয়; কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কে অপমান, নিয়ন্ত্রণ বা অবহেলা।

ফলে ভুক্তভোগী যখন নিজের অভিজ্ঞতা বলতে চান, তখন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেন না।


১৪. ক্ষমা চাওয়া, আবার একই চক্র


ঝগড়া → কষ্ট → ক্ষমা → কিছুদিন ভালো আচরণ → আবার একই ঘটনা। এই সাইকেল বছরের পর বছর চলতে পারে।


১৫. আপনাকে নিজের কাছেই ছোট করে দেওয়া


সবশেষে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তনটি ঘটে ভেতরে। যে মানুষটি একসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তিনি ভাবতে শুরু করেন


“হয়তো সত্যিই সব আমার দোষ।”


“হয়তো আমি যথেষ্ট ভালো নই।”


“হয়তো আমাকে নিয়ে কেউ আর থাকতে চাইবে না।”


এখানেই মানসিক নির্যাতনের গভীর ক্ষত তৈরি হয়। একটি বিষাক্ত সম্পর্ক সবসময় ঝগড়াপূর্ণ হয় না।  কখনো কখনো সম্পর্কের বাইরে থেকে সবকিছু একেবারে স্বাভাবিক মনে হয়।


ছবি আছে। সামাজিক অনুষ্ঠান আছে। হাসিমুখ আছে। এমনকি ভালোবাসার প্রকাশও আছে। কিন্তু বন্ধ দরজার ভেতরে একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের কথার ওজন মেপে কথা বলেন, কখন সঙ্গী রেগে যাবেন সেই ভয় করেন এবং নিজের অনুভূতিকেও বারবার অস্বীকার করতে শেখেন।


তাই নির্যাতন শুধু চিৎকার বা মারধরের নাম নয়। কখনো নির্যাতন খুব নীরব। কখনো একটি বাক্যে। কখনো দিনের পর দিন উপেক্ষায়। কখনো ভালোবাসা প্রত্যাহারের ভয় দেখিয়ে। কখনো এমনভাবে দোষ চাপিয়ে, যাতে ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যান।


সম্পর্ক মানে নিরাপত্তা, ভয় নয়,একটি সুস্থ দাম্পত্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। রাগ হতে পারে। ভুল হতে পারে। দুজনের মত আলাদা হতে পারে।


কিন্তু সেখানে ভুল স্বীকার করার জায়গা থাকে। ক্ষমা চাওয়ার জায়গা থাকে। সীমারেখার সম্মান থাকে। কথা বলার নিরাপদ জায়গা থাকে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভালোবাসার সঙ্গে ভয়কে নিয়মিত জুড়ে দেওয়া হয় না।


কেউ যদি প্রতিদিন নিজের আত্মসম্মান, স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি হারাতে থাকেন, তাহলে শুধু “সংসার টিকিয়ে রাখার” নামে সেই কষ্টকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়।


কারণ— গায়ে হাত না তুলেও একজন মানুষকে ভেঙে দেওয়া যায়। আর ভেঙে যাওয়া মানুষের প্রথম প্রয়োজন সবসময় বিচ্ছেদ নয়। কখনো তার প্রথম প্রয়োজন হলো নিজের অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করতে শেখা, নিরাপদ সহায়তা খোঁজা এবং বুঝতে পারা সবকিছুর দায় তার একার নয়।

sidebar ad