মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া সব চিন্তা কি সত্যি?

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

মানুষের মনের ভেতর প্রতিদিন কত কথা ঘুরপাক খায়। কারও একটি মন্তব্য, কারও আচরণ, কোনো অপূর্ণ কাজ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—ছোট একটি ঘটনাও কখনো কখনো আমাদের ভাবনার জগতে বড় ঝড় তুলতে পারে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, “সবাই আমাকে অপছন্দ করে।” কোনো কাজে ব্যর্থ হলে মনে হতে পারে, “আমি নিশ্চয়ই ব্যর্থ হব।” কাছের কেউ একটু রাগ করে কথা বললে মনে হয়, “ও আমার ওপর রাগ করেছে।” আবার কখনো মনে হয়, “কেউ আমাকে বুঝবে না।” কিন্তু প্রশ্ন হলো—মনে আসা প্রতিটি কথাই কি সত্যি?


বাস্তবতা হচ্ছে, চিন্তা আর সত্য এক জিনিস নয়। কোনো একটি পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক যে ব্যাখ্যা তৈরি করে, সেটিই অনেক সময় আমাদের কাছে সত্য বলে মনে হয়। অথচ সেই ব্যাখ্যার পেছনে বাস্তব প্রমাণ নাও থাকতে পারে।


চলুন একটু বিস্তারিত ভাবা যাক, একজন বন্ধু ফোনে কথা বলার সময় বেশ সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, তিনি হয়তো বিরক্ত বা রাগ করেছেন। এরপর শুরু হলো নানা অনুমান—“আমি কি কোনো ভুল করেছি?”, “সে কি আমাকে আর পছন্দ করে না?”, “সম্পর্কটা কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?” এভাবে একটি ছোট ঘটনা থেকে তৈরি হতে পারে বিশাল দুশ্চিন্তার জাল।


এ ধরনের চিন্তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় ঘটনা, অনুমান ও সত্যকে এক করে ফেলি। কেউ উত্তর দিতে দেরি করেছে—এটি ঘটনা। “সে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে”—এটি একটি ব্যাখ্যা। আর “সে নিশ্চয়ই আমাকে অপছন্দ করে”—হতে পারে সেটি কেবল আশঙ্কা।


আমাদের মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কেন পড়ে জানেন? অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা আমাদের মনকে ক্লান্ত করে দেয়। একই বিষয় বারবার ভাবতে গিয়ে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ফলে যে সমস্যা বাস্তবে হয়তো খুব ছোট, সেটিই মনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠে।


মনোবিদের পরামর্শ: চিন্তাকে প্রশ্ন করুন

মনোচিকিৎসাবিদ ড. অ্যারন টি. বেকের মতে, মানুষের মনে অনেক সময় এমন কিছু “অটোমেটিক থট” বা স্বয়ংক্রিয় চিন্তা আসে, যা এত দ্রুত তৈরি হয় যে আমরা সেটিকে চিন্তা না ভেবে বাস্তবতা বলেই ধরে নিই। বিশেষ করে দুশ্চিন্তা বা মন খারাপের সময় নিজের সম্পর্কে, অন্যদের সম্পর্কে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।’’ 


নিজেকে বোঝানো জরুরি যে, নেতিবাচক চিন্তা এলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে একটু থামা জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—“এই চিন্তার পক্ষে আমার কাছে কী প্রমাণ আছে?” একই সঙ্গে প্রশ্ন করুন, “এর বিপরীতে কোনো প্রমাণ আছে কি?”


উদাহরণ হিসেবে, “সবাই আমাকে অপছন্দ করে”—এই চিন্তা এলে ভাবুন, সত্যিই কি সবাই? এমন কেউ কি আছেন যিনি আপনার খোঁজ নেন, আপনার সঙ্গে কথা বলেন বা আপনার পাশে থাকেন? তাহলে “সবাই আমাকে অপছন্দ করে” কথাটি হয়তো বাস্তব সত্য নয়; এটি মুহূর্তের কষ্ট থেকে তৈরি একটি অনুভূতি।


আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হলো বিকল্প ব্যাখ্যা খোঁজা। কেউ কথা বলেনি মানেই সে আপনাকে অপছন্দ করে—এমন নয়। সে হয়তো ব্যস্ত, ক্লান্ত কিংবা নিজের কোনো সমস্যায় মনোযোগী।


নিজের সঙ্গে কথা বলার ভাষাটিও গুরুত্বপূর্ণ। “আমি পারব না” বলার বদলে বলা যায়, “কাজটি কঠিন, তবে চেষ্টা করলে আমি শিখতে পারি।” “আমি ব্যর্থ” না বলে বলা যায়, “এই কাজে আমি সফল হইনি; এখান থেকে কিছু শেখার আছে।”


সব চিন্তা বন্ধ করা সম্ভব নয়, আর সেটি প্রয়োজনও নেই। লক্ষ্য হলো—চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা, চিন্তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হওয়া। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা, প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা, নিজের অনুভূতি লিখে রাখা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সাহায্য নেওয়া এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।


সবশেষে মনে রাখা দরকার, মনের ভেতর কোনো কথা জেগে উঠলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। চিন্তা একটি বার্তা মাত্র—রায় নয়। তাই পরেরবার কোনো নেতিবাচক চিন্তা মাথায় এলে একটু থামুন, গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—“এটা কি সত্যি, নাকি আমার মন এখন শুধু ভয় পাচ্ছে?” এই ছোট প্রশ্নটিই অনেক বড় মানসিক ভার থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে।


sidebar ad