বয়স বাড়লেই স্বপ্ন যেন হারিয়ে না যায়


বয়স বাড়লেই স্বপ্ন যেন হারিয়ে না যায়

শায়লা জাহান: 

সময় এবং বয়স; কোনোটিই কারো জন্য থমকে থাকেনা। স্বপ্নের একেকটা ঋতু আছে। ইচ্ছেরও মেয়াদ থাকে। বয়স বাড়ে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু স্বপ্ন ফুরিয়ে যায়। পরে করবো বলে মনের কোনে জমিয়ে রাখা ইচ্ছাগুলোর মানে হলো সেগুলোকে চিরতরে হারিয়েই ফেলা।

 

ছোটবেলায় যখন রঙিন ডানা মেলে প্রজাপতি উড়ে বেড়াত, তখন বুক ভরে এক অদ্ভূত ইচ্ছা জাগতো ; আমারো যদি এমন দুটো ডানা থাকতো! আরেকটু যখন বড় হলাম, হাতে এলো রকিব হাসানের “তিন গোয়ান্দা” সিরিজ। বইয়ের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে ডুব দিয়ে কিশোর, মুসা আর রবিনের অ্যাডভেঞ্চার জীবন আমাদের তাড়িয়ে বেড়াত। মনে হতো, এই তো জীবন! বড় হয়ে গ্রিনহিলসের মতো কোনো এক দ্বীপে যাব, রহস্যের জট খুলব, রোমাঞ্চকর এক জীবন কাটাব। ছোটবেলার এইসব নস্টালজিয়ায় কেউ ডুবে যায়নি, এমন মেলা ভার। যত বড় হতে লাগলাম, মনের ইচ্ছার, স্বপ্নের রুপরেখাও যেনো পরিবর্তন হতে লাগলো। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ইচ্ছাগুলোর ডানা ছাঁটা পড়তে লাগল। “এখন পড়াশোনার চাপ, শখ পূরণের সময় কোথায়? পরে দেখা যাবে।’’ “এখন তো ক্যারিয়ার গড়ার বয়স, ঘুরতে যাওয়ার বয়স পরে আসবে।’’  জীবনের এই গুছিয়ে নেয়ার পাকচক্রে মনের ক’টা স্বপ্নই বা পূরণ করতে পেরেছেন আপনি? 


মানুষের মন পরিবর্তনশীল। প্রজাপতির ডানায় ভর করে উড়তে চাওয়া ছোট্ট মনটা যখন বিশ বছর বয়সে গিটার শেখার স্বপ্ন দেখতো, ত্রিশে এসে সংসার, পারিপার্শ্বিকতার চাপে হয়তো সেই গিটার শেখাটাই তার কাছে অবান্তর মনে হয়। আবার পঁচিশে এসে যে হয়তো স্বপ্ন দেখতো কাঁধে ব্যাকপ্যাক নিয়ে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যেতে, পঞ্চাশে এসে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বের হতে তার মনই চায় না। এতেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক নির্মম সত্য; সব স্বপ্ন পূরণের নি্দিষ্ট এক্সপায়ার ডেট থাকে। শৈশবে যা পাওয়ার জন্য আমরা ব্যাকুল থাকতাম, কৈশোরে এসে তা বদলে যায়। আবার তারুণ্যের রঙিন শখগুলো স্থবির হয়ে পড়ে কর্মব্যস্ত যৌবনে। 


কেন সময়ের ইচ্ছা সময়েই পূরণ করা উচিৎ?

একটু চোখ বুজে ভাবুন তো, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়গুলো। ফেলে আসা দিনগুলোতে করা সেইসব দস্যিপনাগুলো। জীবন শেষে মানুষের কাছে যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো স্মৃতি। তরুণ বয়সে শখ পূরনে করা যা ছিলো পাগলামি, তা সারাজীবনের জন্য একটি দারুন গল্প হয়ে থাকে।    

যান্ত্রিকতাময় এই জীবন গুছিয়ে নেয়ার প্রয়াসে আমরা শুধু ছুটেই চলছি। ইঁদুরদৌড়ের এই ট্র্যাকে শখ বা ইচ্ছেগুলো অক্সিজেনের মতো কাজ করে। এগুলো মানুষকে ভেতর থেকে বাঁচিয়ে রাখে। শুধু তাই নয় সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করার জন্য মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পেতে এটি টনিকের মতো কাজ করে এবং পরবর্তীতে বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে। 

শুধু কি তাই? মনের এই ছোট ছোট ইচ্ছা বা স্বপ্নগুলো পূরনে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি ও রিফ্রেশমেন্ট পাওয়া যায়। যা আপনাকে এনে দিবে এক অনুতাপহীন জীবন। পূর্বেই বলেছি সবকিছুরই একটা সঠিক সময় আছে। প্রতিটি দিন অজান্তেই আমাদের থেকে কিছু না কিছু হারিয়ে যাচ্ছে- পঁয়ত্রিশে গিটার শেখার সেই শখ, পঞ্চাশে পাহাড় ডিঙ্গানোর শক্তি, সত্তরে নতুন কিছু শেখার স্ম্রৃতিশক্তি। আর তাই ইচ্ছেগুলো বাস্তবায়নের সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে এখন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে যেনো এই আফসোস করতে না হয়, “ইশ! তখন যদি এই কাজটি করে ফেলতাম!’’ অসমাপ্ত ইচ্ছের চেয়ে বড় বোঝা আর কিছু নেই। 


তাহলে সমাধান কি? 

ইচ্ছে পূরণের মানে এই নয় যে সব দায়িত্ব ফেলে শুধু নিজের মনের খোরাক পূরনের পেছনে ছোটা। বরং এর মানে হলো ব্যস্তময় জীবনের মাঝেও নিজের জন্য সামান্য জায়গা রাখা, নিজের ভালোলাগা গুলোকে কিছুটা প্রাধান্য দেয়া। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা শুধু দায়িত্বের মানুষ নই, স্বপ্নেরও মানুষ। আর এর যাত্রাটা শুরু করতে একটি ডায়েরি নিন, আর লিখে ফেলুন মনের গভীরে থাকা সব ইচ্ছেগুলো। সব একসাথে সম্ভব না হলেও ছোট ছোট স্বপ্ন দিয়েই শুরু করুন। 

পারফেকশনের খোঁজে সময় নষ্ট করবেন না। শুরুতেই আপনি সবকিছুতে পারফেক্ট ও নিখুঁত হবেন, এমন ভাবাটাই অবান্তর। ছবি আঁকতে ভালোবাসেন? মাস্টারপিস বানাতে হবেনা, রঙ তুলি নিয়ে বসে পড়ুন। গিটার বাজানো শিখতে চান? টুংটাং শব্দ দিয়েই না হয় শুরু করে দিন। মোট কথা, মনের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিন, তা বাস্তবায়নের জন্য জটিল পথ না ধরে সহজ ভাবে দেখুন। সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একটা দিন রাখুন শুধুমাত্র নিজের ভালোলাগাগুলো দেখভাল করার জন্য। 

 “পরে করবো’’ বা  “কাল করবো’’ এই বাক্যটাই হল সবচেয়ে বড় মিথ্যা। কারণ সব ইচ্ছে পূরণ হওয়ার জন্য সময় এবং মানুষের মন কখনো একই থাকেনা। অর্থ উপার্জন, ক্যারিয়ার, সামাজিক প্রতিষ্ঠা হয়তো জীবনের কোন এক বয়সে এসে অর্জন করতে পারবেন, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় ও মনের সেই উদ্যমতা কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই বেতনের কিছু অংশ জমিয়ে ওই একদিনের ট্রিপ হোক কিংবা সপ্তাহে দুঘন্টা গানের ক্লাস হোক- আজই পদক্ষেপ নিন। 


জীবন একটাই। দীর্ঘায়ু পাওয়ার আশায়, একটু ভালো থাকার আশায় আমরা জীবনের বর্তমান মুহূর্তগুলোকে, ছোট ছোট শখগুলোকে অবহেলা করি। শত বছর বেঁচে থেকেও যদি মনের শখগুলো মরে যায়, তবে সেই লম্বা জীবনের চেয়ে ছোট কিন্তু তৃপ্তিময় জীবন অনেক বেশি সুন্দর। যে ইচ্ছেগুলোকে পরে করবো বলে জমিয়ে রাখছি, একটা সময় আমরাও থাকব না, ইচ্ছেগুলোও থাকবে না। তাই হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা  “ডেড পয়েটস সোসাইটি’’ এর সেই শিক্ষক জন কিটিংয়ের মতো আমাদের নিজেদের বলা উচিৎ “কার্পে ডাইম’’।  অর্থাৎ আজকেই বাঁচুন, বর্তমানকে আঁকড়ে ধরুন।  


ছবি: এআই

sidebar ad