আসক্তিময় আবেগ: ভালোবাসার নামে বন্দিত্ব

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬

আসক্তিময় আবেগ: ভালোবাসার নামে বন্দিত্ব

এডিকশান বা আসক্তি কথাটি বলতেই আমরা বুঝি এমন একটি শব্দ যা মাদক বা অ্যালকোহলের সাথে যুক্ত। এটি খাওয়া, জুয়া এমনকি যৌনতার সাথেও যুক্ত হতে পারে। কিন্তু আরও এক ধরনের আসক্তি আছে যা একেবারেই অভ্যন্তরীণ, আর তা হলো মানসিক আসক্তি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “ইমোশনাল এডিকশান বা আসক্তিময় আবেগ।’’ আমাদের জীবনে আবেগের উত্থান-পতন ঘটে। কিন্তু কখনও কখনও এই আবেগের ঢেউ এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যা জীবনে বিপদরুপে ধরা দেয়। 


আবেগ কি? সত্যিকার অর্থে একে কোন সংজ্ঞায়নে আবদ্ধ করা কঠিন। আবেগকে অনেকে অনুভূতির সমার্থক হিসেবে ধরে নেয়। যদিও অনুভূতির শারীরিক ও মানসিক দু দিকই আছে। আবেগ মূলত মানসিক। মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় আবেগ মানব মস্তিষ্কের একধরনের সংকেত পদ্ধতি। রাগ, ভয়, হিংসা, আনন্দ এসব দিয়ে মনের বিশেষ অবস্থাকে বুঝানোই হল আবেগ। এটি মানব জীবনের এক প্রয়োজনীয় দিক। আবেগ কাজের পিছনে শক্তি যোগায়, আচরণের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই আবেগ যখন আসক্তিতে রুপ নেয় তখনই এর চিত্র ভিন্ন হয়ে যায়। ভালোবাসার ক্ষেত্রে মানুষ যখন কোনো সম্পর্কের প্রতি বা সেই মানুষটির প্রতি চরমভাবে অবসেসড হয়ে পড়ে, সেটার পেছনের মূল কারণটাই হলো এই আসক্তিময় আবেগ। সহজ কথায়, ভালোবাসার অবসেসিভ রুপটি আসক্তিময় আবেগের অন্যতম বড় এবং বাস্তবমুখী একটি উদাহরণ। 


ভালোবাসা সত্য, ভালোবাসা সুন্দর। বিজ্ঞান বলে, প্রেমে পড়লে আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন, অক্সিটোসিন এবং সেরোটোনিনের মতো ভালো হরমোনের বন্যা বয়ে যায়। কোনো সুস্থ সম্পর্কে এই হরমোনগুলোর নিঃসরণ ঘটে স্থিতিশীলভাবে, যা আমাদের মনে শান্তি দেয়। আমরা যখন কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসি তার প্রতি এক অদম্য টান আসাটাই স্বাভাবিক। এই মানুষটাই আমাদের জীবনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে যে, তার একটি বার্তা, একটি ফোনকল কিংবা কিছুটা মনোযোগের উপর নির্ভর করে আমাদের সারাদিনের ভালোলাগা। দূরে থেকেও সে যেনো থাকে সবসময় মনের কাছে। কিন্তু তার প্রতি এই টান, এই শ্যূন্যতা যখন রুপ নেয় তীব্র ব্যাকুলতা, সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখার মানসিকতা আর নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার মতো এক উন্মাদনায়, তখন তাতে আর ভালোবাসা থাকেনা। তা পরিণত হয় এক ধরনের মানসিক আসক্তিতে। আর এই আসক্তিময় ভালোবাসার ক্ষেত্রে প্রেমের নামে মস্তিষ্কের যে রাসায়নিক খেলা ছিলো, তা পুরোপুরি উলটে যায়। এখানে সম্পর্কটা চলে রোলার কোস্টারের মতো। প্রিয় মানুষটা একটু অবহেলা করলে ভয়, রাগ ও কর্টিসল হরমোন তৈরি হয়। আবার সে কাছে আসলে ডোপামিনের জোয়ার আসে। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এই চরম কষ্ট আর আনন্দের জোয়ার-ভাটার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে মানুষটিকে সেই আবেগের ডোজ পেতে ব্যাকুল করে তোলে। 


ভালোবাসার এই আসক্তিময় আবেগের দিকটি প্রায়শই আমরা উপেক্ষা করে থাকি। এটা ভেবেই নেয়া হয় যে, প্রিয় মানুষটার প্রতি এই মনোভাব থাকা তো ভালোই। এটাই বুঝি প্রকৃত প্রেম। কিন্তু এর ভয়াবহ দিক আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। এটি নিঃশব্দে আমাদের আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব এবং মানসিক শান্তিকে ক্ষয় করে তোলে। যেখানে ভালোবাসা আপনাকে মুক্তি দেয়, সেখানে এই আসক্তি আপনাকে এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দী করে। প্রিয় মানুষটির সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চাইতে তাকে হারানোর ভয় গ্রাস করে ফেলে। অথচ শুরুতে দুটোর অনুভূতি একরকম লাগে যে, পার্থক্যটা বুঝতে বুঝতে অনেকটাই দেরী হয়ে যায়।  


আসক্তিময় আবেগের কিছু লক্ষণ-


সঙ্গীর কথা চিন্তা করা, তাকে নিয়ে ভাবা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু চিন্তার এই পরিধি যখন আপনার সবকিছুকে প্রভাবিত করে তখনই তা সমস্যা শুরু করে। সে কার সাথে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে, কি করছে- তা জানার জন্য ছটফট লাগে। বারবার ফোন, মেসেজ বা অনলাইনে তাকে চেক করা শুরু হয়ে যায়। সাধারন একটা ভাবনা থেকেই এটা পরবর্তীতে এক ধরনের মানসিক নেশায় পরিণত হয়। যা না করলে তীব্র অস্বস্তি হয়। 

নিজের প্রয়োজন, স্বপ্ন, শখ সবকিছুই হারিয়ে যায়। এমনকি নিজের স্বকীয়তাও নষ্ট হয়ে যায়। ভয়, উদ্বেগ, রাগ নিজের সবটুকু জুড়ে থাকে। “ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না’’, “ও চলে গেলে আমার জীবন শেষ’’- এই ধরনের চিন্তাই তখন নিজেকে গ্রাস করে ফেলে।

সঙ্গী অবহেলা করছে, কষ্ট দিচ্ছে তা বুঝতে পেরেও সম্পর্ক থেকে বের হতে না পারে। কারণ অবচেতন মন এই কষ্ট পাওয়ার মানসিকতার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। 


সমাধানের উপায়: মানসিক আসক্তি ভঙ্গার উপায় হলো নিজ আবেগ সম্পর্কে সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রন তৈরি করা। আর এরজন্য প্রথম পদক্ষেপই হলো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে হবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখা, ইচ্ছার প্রাধান্য দিতে হবে। এতে বেশি আবেপ্রবণ হওয়ার মাত্রা কমে আসবে। 


নিজ সংবেদনশীল অভ্যাস গুলো সণাক্ত করতে হবে। দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো সময়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সবকিছুর উপর নিজের রিয়্যাকশনের প্যাটার্ণগুলো দেখতে হবে। একবার যদি কারণগুলো সণাক্ত করা যায়, তবে খুব সহজেই তা নিয়ন্ত্রণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে। 


মাথায় নেগেটিভিটি না রেখে ইতিবাচক চিন্তা রাখা উচিৎ। এর জন্য যেকোন ইতিবাচক কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজে্কে ব্যস্ত রাখতে হবে। এটা হতে পারে টিভি দেখা, গান শোনা, ব্যায়াম করা। 


আসক্তিময় আবেগের শিকড় অনেক সময় আমাদের ছোটবেলার কোন মানসিক আঘাত বা একাকীত্বের সাথে যুক্ত থাকে। তাই প্রয়োজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। 


আসক্তিময় আবেগ শুধু সম্পর্ককে নয়, মানুষকেও ক্লান্ত করে দেয়। যে মানুষটি ভালোলাগার, ভালোবাসার কেন্দ্রে থাকে, তাকেই একসময় দমবন্ধ লাগে। ভালোবাসার সুন্দর রুপ হলো যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটে, কিন্তু কেউই নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে না। 


লেখা- শায়লা জাহান

sidebar ad