সে খোঁজ নেয় না, তবু কেন বারবার তাঁর কাছেই ফিরি?

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬

সে খোঁজ নেয় না, তবু কেন বারবার তাঁর কাছেই ফিরি?

কথা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দিন যায়, সপ্তাহ যায়। নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখেন। মনে মনে ঠিক করেন—এবার আর যোগাযোগ করবেন না। অপেক্ষাও করবেন না। জীবনকে নিজের মতো করে এগিয়ে নেবেন।


তারপর কোনো একদিন হঠাৎ খুব জানতে ইচ্ছে করে, মানুষটি কেমন আছে। হয়তো কোনো গান শুনে, পরিচিত কোনো জায়গায় গিয়ে, পুরোনো কোনো কথা মনে পড়ে কিংবা একেবারেই কোনো কারণ ছাড়াই তাঁর কথা মনে পড়ে যায়। একটি ছোট্ট বার্তা পাঠিয়ে দেন। উত্তর এলে ভালো লাগে। কিছুক্ষণ কথা হয়। মনে হয়, দূরত্বটা বুঝি একটু কমল। তারপর আবার নীরবতা। আবার অপেক্ষা।


মনের এমন টানাপোড়েন অনেক মানুষের জীবনেই আসে। সম্পর্কটি প্রেমের হতে পারে, বন্ধুত্বের হতে পারে, আবার এমন কোনো সম্পর্কও হতে পারে, যার কোনো স্পষ্ট নাম নেই। একজন হয়তো সম্পর্কটিকে হৃদয়ের খুব কাছে অনুভব করেন, অন্যজন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কিছুটা দূরত্বে।


তখন প্রশ্ন আসে—যখন বুঝতেই পারছি, মানুষটি আমার মতো করে সম্পর্কটি চাইছেন না, তখনও মন কেন বারবার তাঁর কাছেই ফিরে যায়?


অনুভূতির সমীকরণ সব সময় সমান হয় না


দুজন মানুষের মধ্যে ভালো লাগা থাকতে পারে, সম্মান থাকতে পারে, দীর্ঘ সময় কথা হতে পারে, একে অপরের সঙ্গ ভালোও লাগতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, দুজনের অনুভূতির গভীরতা কিংবা সম্পর্কের প্রত্যাশা সমান হবে।


একজন হয়তো নিয়মিত কথা বলতে চান, জানতে চান অন্যজন কেমন আছেন, দিনের ছোটখাটো ঘটনাও ভাগ করে নিতে চান। অন্যজন হয়তো কথা বলতে আপত্তি করেন না, কিন্তু নিজে থেকে যোগাযোগের প্রয়োজন অনুভব করেন না।


মনোবিজ্ঞানে এমন অবস্থাকে কাছে টানা ও দূরে সরে যাওয়ার সম্পর্কগত প্রবণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। একজন যত বেশি ঘনিষ্ঠতা, যোগাযোগ ও নিশ্চয়তা চান, অন্যজন হয়তো ততটাই নিজের দূরত্ব বজায় রাখতে চান। ফলে একজনের কাছে যাওয়ার চেষ্টা এবং অন্যজনের দূরে থাকার প্রবণতা পরস্পরকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।


এখানে কাউকে দোষী করার প্রয়োজন নেই। একজনের অনুভূতি গভীর হওয়া যেমন অপরাধ নয়, অন্যজনের একই অনুভূতি না থাকাও অপরাধ নয়। সমস্যাটি তৈরি হয়, যখন একজনের প্রত্যাশা এবং অন্যজনের অংশগ্রহণের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকে।


সে নিজে খোঁজ নেয় না, কিন্তু আমি যোগাযোগ করলে কথা বলে


এই জায়গাটিই অনেক সম্পর্ককে দীর্ঘদিন অস্পষ্ট করে রাখে।


মানুষটি হয়তো নিজে থেকে ফোন করেন না, বার্তা পাঠান না। কিন্তু আপনি যোগাযোগ করলে উত্তর দেন। কখনো দীর্ঘ সময় কথা বলেন, হাসেন, আন্তরিকতা দেখান। তখন মনে প্রশ্ন আসে—তাহলে কি তাঁরও আমার প্রতি অনুভূতি আছে?


থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। শুধু কিছু সুন্দর কথোপকথনের ভিত্তিতে অন্য মানুষের অনুভূতির গভীরতা নিশ্চিতভাবে বোঝা সম্ভব নয়।


আচরণবিজ্ঞানে অনিয়মিত ইতিবাচক সাড়া বলে একটি ধারণা রয়েছে। কোনো আচরণের পর সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে মাঝেমধ্যে তা পাওয়া গেলে মানুষ কখনো সেই আচরণ আরও বেশি ধরে রাখতে পারে। কারণ, সে জানে না পরেরবার কী হবে।


সম্পর্কেও এমন হতে পারে। দীর্ঘ নীরবতার পর একটি আন্তরিক উত্তর, হঠাৎ পাওয়া মনোযোগ কিংবা কয়েকটি সুন্দর কথা মনে নতুন করে আশা তৈরি করে। মনে হয়—হয়তো সম্পর্কটি বদলাচ্ছে। অথচ সামগ্রিক আচরণে হয়তো কোনো পরিবর্তনই ঘটেনি।


এই অনিশ্চয়তাই কখনো নিশ্চিত প্রত্যাখ্যানের চেয়েও বেশি সময় মানুষকে অপেক্ষায় রাখে।


জানি কষ্ট হবে, তবু বার্তা পাঠাই কেন?


এর পেছনে থাকতে পারে কাছে যাওয়ার ইচ্ছা ও দূরে থাকার প্রয়োজনের দ্বন্দ্ব।


মনের একটি অংশ বলে, ‘কথা বলতে চাই।’


অন্য অংশ মনে করিয়ে দেয়, ‘আবার কষ্ট পাবে।’


তখন মানুষ কিছুদিন দূরে থাকে। নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখে। সিদ্ধান্ত নেয়, আর যোগাযোগ করবে না। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলেই অনুভূতি শেষ হয়ে যায় না।


কারণ মন শুধু যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয় না। স্মৃতি, অভ্যাস, প্রত্যাশা, ভালো লাগা এবং কোনো মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া আবেগের সংযোগও আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে।


ফলে তৈরি হতে পারে একটি চক্র—


মনে পড়ে → যোগাযোগ করতে ইচ্ছে করে → বার্তা পাঠানো হয় → উত্তর পেয়ে সাময়িক ভালো লাগে → প্রত্যাশা তৈরি হয় → আবার নীরবতা → কষ্ট → দূরে থাকার সিদ্ধান্ত → আবার মনে পড়ে।


সমস্যা হলো, প্রতিবার যোগাযোগের পর পাওয়া সাময়িক স্বস্তি মানুষকে আবার একই পথে ফিরিয়ে নিতে পারে।


‘সে আমাকে ভালোবাসে না’—এ সিদ্ধান্তও কি এত সহজ?


সব সময় নয়।


কেউ নিজে থেকে যোগাযোগ করছেন না—এটি তাঁর আচরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু তাঁর মনের ভেতরে ঠিক কী চলছে, বাইরে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়।


হয়তো তিনি সম্পর্কটিকে অন্যভাবে দেখেন। হয়তো তাঁর অনুভূতির গভীরতা আলাদা। হয়তো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চান না। হয়তো জীবনে অন্য অগ্রাধিকার রয়েছে।


তাই কারও নীরবতাকে নিজের মতো করে অর্থ দেওয়ার আগে তাঁর ধারাবাহিক আচরণ দেখা জরুরি।


কে নিয়মিত খোঁজ নেন? কে সময় দেন? কে কথোপকথন শুরু করেন? আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মনে রাখেন কে? সম্পর্কটি ধরে রাখার চেষ্টা কি দুজনের, নাকি শুধু একজনের?


কেউ কী অনুভব করেন, সেটি অনুমান করা যায়। কিন্তু পারস্পরিকতা আচরণে অনেক বেশি স্পষ্ট।


সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝতে তাই বিচ্ছিন্ন কিছু সুন্দর মুহূর্তের চেয়ে দীর্ঘ সময়ের আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


যোগাযোগ বন্ধ করলেই কি মন থেকে চলে যাবে?


না, সব সময় নয়।


কারণ যোগাযোগ বন্ধ করা একটি সিদ্ধান্ত; অনুভূতি একটি মানসিক প্রক্রিয়া।


আজ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব—‘আমি আর তাঁকে বার্তা পাঠাব না।’ কিন্তু আগামীকাল থেকে তাঁর কথা আর মনে পড়বে না—এমন নির্দেশ মনকে দেওয়া যায় না।


তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত জোর করে মানুষটিকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করার পাশাপাশি বাস্তবতাকে দেখতে শেখা।


এখানে একটি পার্থক্য খুব গুরুত্বপূর্ণ—


‘আমি তাঁকে চাই’ এবং ‘তিনি আমার সঙ্গে সেই সম্পর্কটি চান’—দুটি এক সত্য নয়।


কাউকে ভালো লাগা আমার অনুভূতি। কিন্তু সেই মানুষটিও একই সম্পর্ক চান কি না, সেটি তাঁর স্বাধীন অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত।


এই দুই সত্যকে আলাদা করতে পারা মানসিকভাবে মুক্ত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।


কখনো মানুষটির চেয়ে সম্ভাবনাটিকেই বেশি আঁকড়ে ধরি


অসম সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল জায়গাগুলোর একটি হলো আশা।


বর্তমানে মানুষটি যতটা কাছে আছেন, তার চেয়ে আমরা কখনো বেশি ভাবি—একদিন হয়তো তিনি বুঝবেন, একদিন হয়তো নিজে থেকে খোঁজ নেবেন, একদিন হয়তো সম্পর্কটি বদলে যাবে।


তখন আমরা শুধু বর্তমানের মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখি না; মনে মনে তাঁর একটি ভবিষ্যৎ রূপও তৈরি করি।


এই সম্ভাবনা ছেড়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, মানুষটিকে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি তখন একটি কল্পিত ভবিষ্যৎকেও ছেড়ে দিতে হয়।


নিজেকে তাই প্রশ্ন করা যেতে পারে—


আমি কি মানুষটির বর্তমান আচরণকে গ্রহণ করছি, নাকি তিনি একদিন আমার প্রত্যাশামতো হয়ে উঠবেন—এই আশাটিকে ধরে আছি?


প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু উত্তরটি সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করতে পারে।


নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন করুন


এমন সম্পর্কে আটকে গেলে নিজের সঙ্গে একটি সৎ কথোপকথন প্রয়োজন।


এই যোগাযোগ আমাকে শান্তি দিচ্ছে, নাকি অপেক্ষায় রাখছে?


আমি যোগাযোগ না করলে সম্পর্কটি কি সম্পূর্ণ থেমে যায়?


আমি কি তাঁর বর্তমান আচরণকে গ্রহণ করতে পারছি, নাকি পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছি?


আমি কি সত্যিই শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে পারব, নাকি বন্ধুত্বের আড়ালে আরও কিছু পাওয়ার আশা থাকবে?


তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর আমি শান্ত হই, নাকি আরও বেশি প্রত্যাশা তৈরি হয়?


আমি কি তাঁর কাছ থেকে পাওয়া অল্প কিছু মনোযোগের জন্য দীর্ঘ সময়ের নীরবতাকে উপেক্ষা করছি?


এই সম্পর্কে আমার অনুভূতি, সময় ও আত্মসম্মান—তিনটিই কি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে?


সব উত্তরের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়। কিন্তু নিজের অবস্থান পরিষ্কার না হলে একই আবেগের চক্র বারবার ফিরে আসতে পারে।


দূরে থাকা মানেই শাস্তি দেওয়া নয়


কারও সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া সব সময় রাগ, অভিমান কিংবা তাঁকে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা নয়।


কখনো দূরত্ব প্রয়োজন হয় নিজের আবেগকে স্থির হওয়ার সময় দেওয়ার জন্য।


বিশেষ করে যখন একটি সম্পর্ক নিয়ে দুই মানুষের প্রত্যাশা ভিন্ন, তখন নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা আত্মসম্মানের অংশ। আবেগের মুহূর্তে সঙ্গে সঙ্গে বার্তা না পাঠানো, নিজের কাজ ও সামাজিক জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া, কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করা—এসব ধীরে ধীরে একটি সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।


তবে দূরত্ব যেন অন্য মানুষটিকে পরীক্ষা করার কৌশল না হয়—‘দেখি, আমি কথা না বললে তিনি আমাকে খোঁজেন কি না।’ তাহলে যোগাযোগ বন্ধ থাকলেও মন অপেক্ষাতেই থেকে যায়।


দূরত্বের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজের ভেতরে ফিরে আসা।


সব ভালোবাসার পরিণতি সম্পর্ক নয়


জীবনের সব গভীর অনুভূতি সম্পর্কের পূর্ণতা পায় না।


কখনো আমরা এমন কাউকে অনুভব করি, যিনি আমাদের একইভাবে অনুভব করেন না। কখনো দুজনের মধ্যেই ভালো লাগা থাকে, কিন্তু চাওয়া আলাদা। কখনো সময়, দূরত্ব কিংবা জীবনের বাস্তবতা দুই মানুষকে দুই জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়।


তাতে অনুভূতিটি মিথ্যা হয়ে যায় না


কিন্তু নিজের অনুভূতিকে সম্মান করার অর্থ অন্য মানুষটির কাছ থেকে একই অনুভূতি আদায় করা নয়। কাউকে ভালোবাসা যেমন একটি অনুভূতি, সম্পর্ক তেমন একটি পারস্পরিক সিদ্ধান্ত।


মানসিক পরিণতিবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তাই হলো—অন্য মানুষের সীমারেখাকে সম্মান করা এবং একই সঙ্গে নিজের হৃদয়ের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা।


কারও কথা মনে পড়তেই পারে। তাঁকে দেখতে ইচ্ছে করতেই পারে। কথা বলতে মন চাইতেই পারে। পুরোনো কোনো স্মৃতিতে বুকের ভেতর হঠাৎ শূন্যতাও তৈরি হতে পারে।


মনে পড়া মানেই ফিরে যেতে হবে না


কখনো কাউকে ছেড়ে দেওয়া মানে তাঁকে আর অনুভব না করা নয়। বরং এমন একটি সত্য মেনে নেওয়া—অনুভূতি আমার হতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক তৈরি হয় দুজনের ইচ্ছা, উদ্যোগ ও পারস্পরিকতায়।


ছবি: সিএনএন থেকে নেওয়া


*রোদসী ডেস্ক


ঢাকা/এসই/আরএস


sidebar ad