সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা; একসময় ক্যারিয়ারের নিরাপদ সংজ্ঞা ছিল এটাই। একটি ভালো চাকরি, মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন, বছরে বেতন বৃদ্ধি, একসময় পদোন্নতি, তারপর নির্ধারিত সময়ে অবসর—এই ছকেই গড়ে উঠত জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার মূল পরিকল্পনা।
কিন্তু সেই ধারণা বদলে যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে কর্মজগতের চেনা সমীকরণটি
আর আগের মতো নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর
পুনর্গঠন, একের পর এক লে-অফের খবর; সব মিলিয়ে চাকরির বাজার যেন প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের
মুখোমুখি হচ্ছে।
আজ অনেকের কাছে একটি চাকরি মানেই পুরো ক্যারিয়ার নয়। অতিরিক্ত আয়ের উৎস
অবশ্য নতুন কোনো ধারণা নয়। তবে বর্তমানের অনিশ্চিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগের চেয়ে অনেক
বেশি মানুষ মূল চাকরির পাশাপাশি বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। আর ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্বজুড়ে
তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে "সাইড হাসল" ধারণাটি।
৯টা-৫টার চাকরির পাশাপাশি নিজের দক্ষতা, প্যাশন আর অবসরের সময়কে কাজে
লাগিয়ে অতিরিক্ত আয়ের পথ তৈরি করাই হলো সাইড হাসল। ফ্রিল্যান্সিং থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েশন,
অনলাইন বিজনেস থেকে কনসাল্টিং —বদলে যাচ্ছে বাড়তি আয়ের ধরনও।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাইড হাসল কি নিছক বাড়তি কিছু টাকা উপার্জনের একটি
সাময়িক ট্রেন্ড, নাকি এটি হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের আর্থিক ও ক্যারিয়ার নিরাপত্তার একটি
কার্যকর কৌশল?
সাইড হাসল কেন এত আলোচনায়?
মূল চাকরির বাইরে নিজের উদ্যোগে কোনো কাজ করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করা,
বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তবে গত কয়েক বছরে এটি যে গুরুত্ব পেয়েছে, তার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তির
বড় পরিবর্তন। একটি ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং স্কিল; এ দিয়েই ঘরে বসেই বিশ্বজুড়ে
কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আপওয়ার্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (Upwork Research Institute) এর ২০২৬ সালের
ফিউচার ওয়ার্কফোর্স ইনডেক্স (Future Workforce Index) অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের
skilled knowledge workers-এর মধ্যে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা গত বছরের ২৮% থেকে এক লাফে ৩৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ, এখন প্রতি
৩ জন দক্ষ কর্মীর মধ্যে ১ জনেরও বেশি ফ্রিল্যান্সিং করছেন। বর্তমানে ৫৮% ফুল-টাইম চাকুরিজীবী ফ্রিল্যান্সিং করার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন,
যা আগের বছর ছিল মাত্র ৩৬%।
কেনো এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে- এই প্রসংগে প্রথমেই আসবে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা
ও বাড়তি আয়ের কথা। জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা অনেকের ক্ষেত্রেই একক চাকরি
বা নির্দিষ্ট বেতন দিয়ে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। আর একটি মাত্র চাকরির ওপর নির্ভরতা
ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে সাইড হাসল আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এছাড়াও, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা তো রয়েছেই। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
যেমন আপওয়ার্ক, ফাইবার, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম এর মতো প্ল্যাটফর্মের কারণে ঘরে বসেই
বিশ্বজুড়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কাজের নমনীয়তা। নিজের সুবিধাজনক সময়ে, যেকোন
জায়গায় বসে কাজগুলো করা সম্ভব। তাই সারসংক্ষেপে বলা যায়- অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন, আয়ের উৎস বাড়ানো
এবং নিজের ভালো লাগার কাজকে পেশায় রূপান্তর করার সুযোগের কারণে এটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
চাকরির পাশাপাশি আরেকটি ক্যারিয়ার কেন?
মোটা দাগে এর উত্তর হল, চাকরির অনিশ্চয়তা।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (World Economic Forum)-এর Future of Jobs
Report 2025 বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের
ফলে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, আবার একই সময়ে অটোমেশন এবং এআই-এর কারণে
৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলোপ এর মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ একই সময়ে নতুন সুযোগও তৈরি হবে,
আবার অনেক প্রচলিত কাজের ধরনও বদলে যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ফোরাম এর হিসাবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে
কর্মরত কর্মীদের প্রায় ৩৯.৪% (বা প্রায় ৪০%) মূল কর্মদক্ষতা বা core skills বদলে যাবে,
যা অত্যন্ত উদ্বেগের ও একই সাথে প্রস্তুতির
বিষয়ও।
তাই সাইড হাসল -এর মূল উদ্দেশ্য শুধু অতিরিক্ত টাকা নয়। বরং এটি হতে পারে
নিজেকে স্কিল করার একটি বাস্তব পরীক্ষাগার।
ফ্রিল্যান্সিং: অফিসের বাইরে আরেকটি আয়ের পথ।
সাইড হাসল এর সবচেয়ে পরিচিত পথগুলোর একটি হলো ফ্রিল্যান্সিং।
কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল
মার্কেটিং, ডাটা এন্ট্রি- এমন অসংখ্য স্কিল এর জন্য এখন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ পাওয়া
যায়।
ফ্রিল্যান্সিং -এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একজন চাকরিজীবীকে নিজের স্কিল
এর বাজারমূল্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, এটি তার অফিসের জব টাইটেল এর
বাইরে আরেকটি প্রফেশনাল আইডেন্টিটিও তৈরি করে।
কনটেন্ট ক্রিয়েশন: সম্ভাবনাময় নতুন ক্যারিয়ার পথ
সোশ্যাল মিডিয়া একসময় ছিল মূলত যোগাযোগ ও বিনোদনের জায়গা। এখন এটি ব্যবসা, মার্কেটিং এবং ব্যাক্তিগত ব্র্যান্ডিং-এরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা পডকাস্ট; সবখানেই নিশ ভিত্তিক অডিয়েন্স তৈরি করে আয়ের বিভিন্ন পথ তৈরি হয়েছে। আগে একজন ভালো রাঁধুনি তার এলাকার কয়েকজন ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারতেন। এখন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম -এর মাধ্যমে তিনি হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন।
আবার একজন শিক্ষক নিজের দদক্ষতা দিয়ে অনলাইন অডিয়েন্স তৈরি করতে পারেন।
একজন আর্টিস্ট তার চিত্রকর্ম বিক্রি করতে পারেন বিশ্বের অন্য প্রান্তের ক্রেতার কাছেও।
এখানেই বদলে গেছে মূল সমীকরণ— আগে চাকরি খুঁজতে হতো প্রতিষ্ঠানের কাছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা
নিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।
অনলাইন বিজনেস: ছোট উদ্যোগ থেকে বড় সম্ভাবনা-
বিজনেস করতে চান? দোকান ভাড়া, অগ্রিম পরিশোধ এবং ডেকোরেশনের কারণে প্রচুর
পুঁজির প্রয়োজন হয়। আর কাস্টমার সাধারণত নির্দিষ্ট
এলাকা বা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অনলাইন বিজনেসে সাথে এখানেই বড় পরিবর্তন দেখা
যায়। অনলাইন বিজনেস করতে কি কি লাগে? ভালো পরিকল্পনা, সঠিক পণ্য নির্বাচন এবং মৌলিক
কিছু ডিজিটাল মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। একটি
ফেসবুক পেইজ বা ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট দিয়েই পোশাক, খাবার, জুয়েলারি, হোম ডেকোর সহ বিভিন্ন
সার্ভিস -এর ব্যবসা শুরু করা সম্ভব।
তবে শুরুটা সহজ হলেও, সফল হওয়া কিন্তু অত সহজ নয়। প্রতিযোগিতা বেশি, ক্রেতাকেও
ধরে রাখা কঠিন।
সাইড হাসল কি সত্যিই নিরাপদ?
এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতা।
সাইড হাসল মানেই যে পুরোপুরি আর্থিক নিরাপত্তা—এমনটা ভাবা ভুল।
ফ্রিল্যান্সিং-এর আয় অনিয়মিত হতে পারে। কনটেন্ট ক্রিয়েশন এর আয় প্ল্যাটফর্মের এলগরিদম
ও অডিয়েন্স এর ওপর নির্ভর করতে পারে। অনলাইন বিজনেসে বাজার, প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতার
চাহিদার ভিত্তিতে বদলে যেতে পারে।
এটি মূলত একটি বিকল্প তৈরি করে, নতুন একটি ঝুঁকির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল
হয়ে যাওয়া নয়।
এরও আছে বার্নআউট এর ঝুঁকি। ৯টা-৫টা অফিসের পর সন্ধ্যায় ফ্রিল্যান্সিং,
রাতে কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ছুটির দিনে অনলাইন বিজনেস। শুনতে এক্সাইটিং মনে হলেও, বাস্তব
ততটাই কঠিন।
সবসময় সবকিছুই ফলপ্রসূ করার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে বিশ্রাম, পরিবার এবং
ব্যক্তিগত সময় হারিয়ে ফেলেন। তাই সফল সাইড হাসল এর জন্য শুধু সময় ব্যবস্থাপনাই নয়,
বাউন্ডারি তৈরি করাও জরুরি।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে সাইড হাসল
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পড়াশোনা বা চাকরির পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের জন্য
সাইড হাসল এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (BDOSN)-এর সহযোগিতায়
বাইটসফরঅল বাংলাদেশ (Bytesforall Bangladesh) দেশের নারী ফ্রিল্যান্সারদের অধিকার,
সুযোগ, অবদান ও চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার জন্য একটি বিশেষ সমীক্ষা পরিচালনা করে। নভেম্বর
২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত চলা এই সমীক্ষায় ১০১ জন নারী ফ্রিল্যান্সার অংশ নেন।
সমীক্ষা অনুযায়ী, সাইড হাসল বা ফ্রিল্যান্সিং এখন নারীদের শুধু হাতখরচের
মাধ্যম নয়, বরং পারিবারিক আয় বৃদ্ধির বড় উৎস।
দেশের শিক্ষিত নারীদের একটি বড় অংশ (প্রায় ৬৬.৪%) এখন ঘরে বসে আয়ের জন্য
সাইড হাসলকে বেছে নিচ্ছেন। নিজেদের দক্ষ করতে তারা প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশনের
(প্রায় ৭৪%) পেছনে বিনিয়োগ করছেন, যা প্রমাণ করে সাইড হাসলকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের
সাথে দেখছেন।
তবে, সমীক্ষার সার্বিক ফলাফলে উঠে এসেছে যে বাংলাদেশের নারী ফ্রিল্যান্সারদের
কাজের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি নীতিমালার
অভাব এবং পেমেন্ট সিকিউরিটির সংকটের কারণে তাদের পেশাগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কীভাবে শুরু করবেন?
- নিজের স্কিল ও প্যাশন চিহ্নিত করুন
- কী চাহিদা আছে তার জন্য বাজার গবেষণা করুন
- ছোট করে শুরু করুন, পারফেক্ট হওয়ার অপেক্ষা করবেন না
- প্রতিদিন কিছু সময় বরাদ্দ করুন (১-২ ঘণ্টা)
- অনলাইন কোর্স বা ইউটিউব থেকে তথ্য কালেক্ট করুন
- প্রয়োজনীয় টুলস ও সেটআপ রেডি করুন
- নেটওয়ার্কিং করুন, ক্লায়েন্ট বা অডিয়েন্স গড়ুন
- ইনকামের একটা অংশ নতুন স্কিল শেখায় ইনভেস্ট করুন
সাইড হাসল আর শুধু বাড়তি আয়ের পথ নয়, এটা এখন ক্যারিয়ার সিকিউরিটির
নতুন মডেল। শুধু চাকরির পাশাপাশি আরেকটি কাজ করলেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়ে যাবে, এমন ধারণা
ভুল। তবে যদি সাইড হাসল থেকে—
১. একটি নতুন স্কিল তৈরি হয়।
২. একটি প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
৩. অডিয়েন্স তৈরি হয়।
৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাকরির বাইরে নিজের আয় করার সক্ষমতা তৈরি হয়।
তথ্যসূত্র :
১. আপওয়ার্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
২. ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)।
৩. বাইটস ফর অল বাংলাদেশ।
৪. বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)।
ঢাকা/টিএ