শিক্ষিত বেকারত্বের পেছনে শুধু চাকরির সংকট নয়; রয়েছে দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষা ও কর্মবাজারের অসামঞ্জস্য এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের স্বল্পতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে হাতে সনদ। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চাকরি নেই। একের পর এক আবেদন, পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার—তারপরও কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ মিলছে না। অন্যদিকে নিয়োগদাতাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পদে উপযুক্ত দক্ষতার কর্মী পাওয়া কঠিন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের এই দক্ষতার অসামঞ্জস্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। অথচ ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, সেটি নয়; প্রশিক্ষণ
বা শিক্ষা শেষ করে কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু তরুণদের দায়ী করা যাবে না।
দক্ষতার ঘাটতি অবশ্যই একটি সমস্যা। কিন্তু শিক্ষিত বেকারত্বের পুরো দায়
তরুণদের ওপর চাপানোও ঠিক হবে না।
কারণ একজন তরুণ প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করলেও সেই দক্ষতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত
চাকরি তৈরি না হলে বেকারত্বের সমস্যা থেকেই যাবে।
আইএলওর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্পর্ক সবসময় শক্তিশালী ছিল না। অর্থাৎ অর্থনীতি বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে
পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই সমাধান খুঁজতে হলে একই সঙ্গে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—
তরুণদের কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন?
সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো চাকরি কোথায় তৈরি হবে?
নিয়োগদাতার চাহিদাও বদলাচ্ছে: ব্যবসা ও শিল্পের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত, ডিজিটাল যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, অনলাইন
বিপণন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি
হচ্ছে।
ফলে চাকরিপ্রার্থীর জন্য এখন শুধু “কোন বিষয়ে পড়েছি” প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—
“আমি কী কাজ করতে পারি?”
এই পরিবর্তনটি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনায়ও প্রতিফলিত হওয়া দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সেতু কোথায়?
শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনে যাওয়ার পথে বড় একটি ঘাটতি হলো বাস্তব কর্মপরিবেশের
সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সীমিত যোগাযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিষয় পড়া আর সেই বিষয়ে বাস্তবে কাজ করা এক নয়।
তাই শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, শিল্পভিত্তিক
প্রকল্প, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
আইএলওও প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা এবং
নিয়োগদাতাদের দক্ষতা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব
দিয়েছে।
কোন দক্ষতাগুলো তরুণদের এগিয়ে দিতে পারে?
সব তরুণকে একই দক্ষতা অর্জন করতে হবে—এমন নয়। নিজের শিক্ষাগত
পটভূমি, আগ্রহ এবং কর্মবাজারের চাহিদা বিবেচনা করে দক্ষতা নির্বাচন করা উচিত।
তবে পেশাভেদে নিচের দক্ষতাগুলোর গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে—
তথ্য বিশ্লেষণ:
ডিজিটাল বিপণন
প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার ব্যবহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজ
হিসাব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা
বিক্রয় ও গ্রাহক ব্যবস্থাপনা
যোগাযোগ ও উপস্থাপনা
সমস্যা সমাধান
দলগত কাজ
পেশাগত ইংরেজি যোগাযোগ
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—দক্ষতা মানেই শুধু
প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়। ভালো যোগাযোগ, সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীলতা, সমস্যা সমাধান
এবং শেখার মানসিকতাও কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কর্মসংস্থান তৈরির দায়িত্ব কার?
শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে হলে শুধু চাকরিপ্রার্থীদের দক্ষ করে তুললেই হবে
না। অর্থনীতিতে নতুন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির পরিবেশও তৈরি করতে হবে।বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের বাইরে উচ্চ উৎপাদনশীল ও জ্ঞাননির্ভর খাতের বিস্তার
প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন, কৃষিপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস,
আর্থিক প্রযুক্তি ও সৃজনশীল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ জন্য বিনিয়োগ, ব্যবসার পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পের বৈচিত্র্য—সবকিছুকে একই সঙ্গে
এগিয়ে নিতে হবে।
আইএমএফের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান শিল্প কাঠামো উচ্চশিক্ষিত
তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত উচ্চমানের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। অর্থনৈতিক কাঠামোর
বৈচিত্র্য ও উচ্চ উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ তাই গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার লক্ষ্য বদলাতে হবে-
একসময় উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে একটি ডিগ্রি অর্জনকে দেখা হতো। এখন
সেই ধারণা বদলানোর সময় এসেছে।
শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার
জন্য নয়, বাস্তব জীবনের কাজের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে জানতে হবে শিল্পের প্রয়োজন কী। শিল্পকে জানতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
কী শেখাচ্ছে। আর সরকারের দায়িত্ব হবে এই দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর সংযোগ ও কর্মসংস্থান
তৈরির পরিবেশ তৈরি করা।
তরুণদেরও প্রস্তুত হতে হবে।
তরুণদের জন্য বার্তাটিও পরিষ্কার।
শুধু ডিগ্রি নিয়ে চাকরির অপেক্ষায় থাকলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন
হবে। নিজের মূল শিক্ষার পাশাপাশি অন্তত একটি ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করা দরকার। একই
সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং নিয়মিত শেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
চাকরির বাজার বদলাচ্ছে। তাই আজ যে দক্ষতার চাহিদা আছে, কয়েক বছর পর তার
ধরন বদলে যেতে পারে।
ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হলো—নতুন কিছু শেখার
সক্ষমতা।
সমাধান শুধু চাকরি নয়, কর্মক্ষমতা
শিক্ষিত বেকারত্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি শ্রমবাজারের সমস্যা নয়; এটি
অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নেরও প্রশ্ন।
একদিকে তরুণরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে তাদের বড় একটি অংশ উপযুক্ত
কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছেন না। এই ব্যবধান যত বাড়বে, শিক্ষার প্রতি আস্থার সংকট
এবং তরুণদের হতাশাও তত বাড়তে পারে।
তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
তরুণকে দক্ষ হতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কর্মবাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
ব্যবসা ও শিল্পকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।
আর রাষ্ট্রকে এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগ ও উৎপাদন
বাড়ার সঙ্গে মানসম্মত চাকরিও বাড়ে।
ডিগ্রি কর্মজীবনের দরজা খুলতে পারে। কিন্তু সেই দরজার ভেতরে টিকে থাকতে
প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং শেখার সক্ষমতা।
আর দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন এমন একটি কর্মবাজার, যেখানে সেই দক্ষতাগুলো
কাজে লাগানোর সুযোগও থাকবে।
তাই প্রশ্নটি শুধু “চাকরি কোথায়?” নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত— “আমাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনীতি কি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে এখনই।
তথ্যসূত্র:
IMF
International Labour Organization
ঢাকা/টিএ