সাফল্যের পরেও কেনো এতো ছুটে চলা?

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

জীবন যেন এক রেসিং ট্র্যাক। শুধুই ছুটে চলা। একটি ভালো চাকরি, একটু বেশি আয়, আরও একটি সুযোগ, আরেকটি সাফল্য- এক অর্জনের পর আরেক অর্জনের দিকে ছুটছি আমরা।


পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারপাশের অবাক করা সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। বুকভরে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, এই তো! এতদিনের পরিশ্রম সার্থক। কিন্তু কিছু মুহূর্ত পার হতেই চোখ চলে যায় দূরের আরেকটা উঁচুপাহাড়ে। মনে হয়,  ইশ! ওটাও যদি ছুঁতে পারতাম!


সাফল্যের গল্পটাও অনেকটা এমনই। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর উচ্ছ্বাস মিলিয়ে যেতে না যেতেই মন নতুন কোনো স্বপ্নের পিছু ধাওয়া করতে শুরু করে। মনে হয়, আরও একটু পেলেই বুঝি শান্তি আসবে। আরও একটু স্বীকৃতি, আরও একটু সাফল্যকিন্তু সেই ‘আরও একটু’ যেন কখনো শেষ হয় না।


তবে প্রশ্ন হলো, জীবন কি শুধুই এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছুটে চলার নাম?


কিন্তু জানেন কি, সবসময় আরও অর্জন নয়, বরং কখনো কখনো থেমে যাওয়াও প্রয়োজন। একটু পজ দেওয়ার প্রয়োজন। যে চূড়ায় এত কষ্ট করে পৌঁছেছি, সেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখার, নিজের অর্জনগুলোকে অনুভব করার প্রয়োজন। নিজেকে বলার, ‘হ্যাঁ, আমি অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি।’


মার্কিন অভিনেত্রী, গায়িকা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব কেকে পামার, যিনি শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়জগতে পা রেখে খুব অল্প বয়সেই খ্যাতি ও সাফল্য অর্জন করেন।   "আকিলা অ্যান্ড দ্য বি", "ট্রু জ্যাকসন", "ভিপি",  কিংবা "নোপ" এর মতো কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর  সাফল্যমন্ডিত জীবন যেন বলে একের পর এক সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার গল্প। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালেও ছিল তাঁর অবিরাম ছুটে চলার এক চাপ।


ছোটবেলায় কেকে এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন যেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছিল অনিশ্চিত। শুরুতে অভিনয় করা তাঁর কাছে ছিল নিছক আনন্দের, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর এই প্রতিভা শুধু তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে। আরও ভালো সুযোগের আশায় একসময় তাঁর পরিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যায়।


কেকের কাজ ধীরে ধীরে পরিবারকে এনে দেয় আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা। তিনি সফল হচ্ছিলেন, পরিবারও তাঁর সাফল্যের সুফল পাচ্ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে চাপ তাঁকে এতদূর নিয়ে এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল, সাফল্যের পরও সেই চাপ যেন তাঁকে ছাড়েনি। বরং মনে হতে থাকল, আরও কাজ করতে হবে, আরও ভালো করতে হবে, আরও সুযোগ ধরে রাখতে হবে। কারণ একসময় যে দৌড় ছিল পরিবারের নিরাপত্তার জন্য, সেটিই ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের স্বাভাবিক গতিতে পরিণত হয়েছিল।


পামার এই অবস্থাকে বলেছেন 'সার্ভাইভাল মোড'-  যখন পরিস্থিতি বদলে গেলেও মন এখনো পুরোনো ভয় আর তাড়নার মধ্যেই আটকে থাকে। ফলে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছেও মানুষ থামতে পারে না; মনে হয়, থেমে গেলেই বুঝি আবার সবকিছু হারিয়ে যাবে।


সফল হয়েও কেন মনে হয়, আমি যথেষ্ট নই?


সাফল্যের পরেও আমরা থেমে থাকি না। একটি পদোন্নতি পাওয়ার পর মনে হয়, এবার আরও বড় পদ দরকার। একটি স্বীকৃতি পাওয়ার পর মনে হয়, আরও বড় স্বীকৃতি দরকার। এভাবে সাফল্য আমাদের তৃপ্ত করার বদলে অনেক সময় নতুন অসম্পূর্ণতার অনুভূতি তৈরি করে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন ছুটিয়ে নিয়ে চলি নিজেকে?


আরও একটু’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা


একটি লক্ষ্য পূরণ হলেই মন খুব দ্রুত সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। যে বেতন একসময় স্বপ্ন ছিল, কিছুদিন পর সেটিই সাধারণ মনে হয়। যে বাড়ি একসময় কাঙ্ক্ষিত ছিল, সেখানে অভ্যস্ত হয়ে আবার বড় বাড়ির কথা মনে হয়।


প্রথম ধাপে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের উদ্দেশ্যে সে ছুটে চলে। পরবর্তীতে উদ্দেশ্য ও মোটিভের পরিবর্তন ঘটে। এভাবেই শুরু হয় নতুন লক্ষ্যের দৌড়।


অভ্যাসের দাসত্ব


আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি লক্ষ্যের পেছনে দৌড়াতে। সাফল্য এসেছে, কিন্তু মন বলেই, এবার আরও কিছু করি। এখানে সাফল্য যেন এক মাইলফলক, গন্তব্য নয়। এই চিরন্তন ‘আরও একটু চাই’ মানসিকতার সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণার বেশ মিল আছে, 'হেডোনিক ট্রেডমিল’।  কোনো সাফল্য বা আনন্দ আমাদের সুখের মাত্রা সাময়িকভাবে বাড়ালেও সময়ের সঙ্গে আমরা সেই নতুন বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে যাই। ফলে আগের আনন্দটা আর আগের মতো অনুভূত হয় না। মানুষের মন চাওয়া-পাওয়ার এই সমীকরণকে নতুন করে রিডাইরেক্ট করে। পুরোনো অর্জনকে পেছনে ফেলে নতুন কিছু পাওয়ার এই অদম্য বাসনাই আমাদের সামনের দিকে ঠেলে দেয়।


আত্মউন্নয়ন ও সীমানা ভাঙার ইচ্ছা


মানসিক পরিপক্কতার সাথে সাথে মানুষের কাছে জাগতিক অর্জনের চেয়ে  নিজের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে স্পর্শ করাটা বড় হয়ে ওঠে। সে কেবল সফল হতে চায় না, বরং প্রতিনিয়ত নিজের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে নিজেকে অতিক্রম করতে চায়। নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদে এক ধাপ পার হলে মানুষ পরের বড় ধাপটি দেখতে চায়। নতুন লক্ষ্যের সন্ধান করে।


শৈশবের অভ্যাস ও নিরাপত্তাহীনতা


যাদের জীবনে কোনো সময় অর্থনৈতিক বা সামাজিক অনিশ্চয়তা ছিল, তাদের মধ্যে অনেক সময় ‘আরও অর্জন করতে হবে’ ধরনের তাড়না দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে গেলেও মনের ভেতরকার পুরোনো ভয় সহজে সরে যায় না। কেকে পামার এর বক্তব্যের সঙ্গে এই জায়গাটিই বিশেষভাবে সম্পর্কিত।


থমকে যাওয়ার ভয়


কখনো আমরা সাফল্যের জন্য যতটা কাজ করি, তার চেয়েও বেশি কাজ করি সাফল্য হারানোর ভয়ে। অনেকের জন্য স্থির হয়ে যাওয়া মানে পিছিয়ে পড়া।


বাইরে থেকে একজন মানুষকে দেখে মনে হতে পারে; সে খুব অ্যাম্বিশাস,  হার্ডওয়ার্কিং, কোন সুযোগ হাতছাড়া করে না। প্রকৃতপক্ষে সে কি সত্যিই অ্যাম্বিশান-এর কারণে এত দৌড়াচ্ছে, নাকি নিরাপত্তাহীনতার ভয় থেকে?


কারণ কখনো কখনো আমাদের “আরও চাই” আসলে অ্যাম্বিশান নয়, বরং “যদি থেমে যাই, তাহলে সবকিছু হারিয়ে ফেলব, এই ভয়টাই কাজ করে।


একটু ব্রেক চাই


এই বিষয়টি নিয়ে কেকে পামারের উপলব্ধিটা বেশ গভীর। তাঁর মনে হয়েছে, অভিনয়ের জন্য যেমন তিনি বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তেমনি বাস্তব জীবনেও নিজের জন্য একটা নির্দিষ্ট চরিত্র তৈরি করে নিয়েছিলেন। যে চরিত্রটি সবসময় হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, দক্ষ, সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারে, প্রয়োজনে সবাইকে সাহায্য করতে পারে এবং যেকোনো পরিস্থিতি সামলে নিতে পারে।


কাজের জগতে এগিয়ে যেতে, মানুষকে স্বস্তি দিতে, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে; চরিত্রটি তাঁকে অনেক সাহায্য করেছে। কিন্তু একটা সময় এসে তিনি বুঝতে পারেন, চরিত্রটি এতটাই সফল হয়ে গেছে যে তার আড়ালে থাকা আসল মানুষটিই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে তিনি হাসছেন, কাজ করছেন, সব সামলাচ্ছেন; কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। এজন্য তিনি শুধু কাজের চাপ থেকে মুক্ত হতে চাননি; নিজের তৈরি সেই সার্ভাইভাল চক্র থেকেও একটু দূরে সরে আসতে চেয়েছেন।


আমাদের অনেকের জীবনেও এমন একটি চরিত্র আছে। যে সবসময় বলে, ‘আমি পারব’, ‘আমি সামলে নেব’, ‘আমার কোনো সমস্যা নেই।’ অথচ সত্যিটা হলো, সবসময় শক্ত থাকারও একটা ক্লান্তি আছে।


সবসময় আমাদের আরও কিছু অর্জন করার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটু থামার, একটু শ্বাস নেওয়ার, নিজের অর্জনগুলোকে উপভোগ করার।


এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা খারাপ নয়। স্বপ্ন থাকা, পরিশ্রম করা, নিজের অবস্থার উন্নতি চাওয়া; সবই জীবনের স্বাভাবিক অংশ।


কিন্তু প্রশ্ন হলোএই দৌড়ের মাঝখানে আপনি কি নিজের জন্য, প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে থাকার জন্য সময় রেখেছেন? নাকি পরবর্তী লক্ষ্য পূরণের চিন্তায় বর্তমান মুহূর্তটিকেই হারিয়ে ফেলছেন?


ঢাকা/টিএ

sidebar ad