উচ্চশিক্ষার পরের ধাপ: ক্যারিয়ার পরিকল্পনা

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চশিক্ষার পরের ধাপ: ক্যারিয়ার পরিকল্পনা

ডিগ্রি হাতে পেলেই কি ক্যারিয়ার তৈরি হয়?


একসময় মনে করা হতো, ভালো ফলাফল, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এবং একটি চাকরি পেলেই ক্যারিয়ার গুছিয়ে যায়।


কিন্তু সময় বদলেছে।


এখন উচ্চশিক্ষা শেষ করা ক্যারিয়ারের শেষ ধাপ নয়, বরং সেখান থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সেমিস্টারে এসে অনেক তরুণ-তরুণীর মনে প্রশ্ন জাগে চাকরি করব, নাকি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাব?


সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেব, নাকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা অর্জন করব?


নিজের ব্যবসা শুরু করব, নাকি ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট ক্যারিয়ারের দিকে যাব?


এই প্রশ্নগুলোর একটিমাত্র সঠিক উত্তর নেই।


কারণ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা আসলে নিজের যোগ্যতা, আগ্রহ, আর্থিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করার নাম।


শুধু ‘কী হতে চাই’ নয়, ‘কীভাবে সেখানে পৌঁছাব’ সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।


অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই নির্দিষ্ট পেশার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার পর সেই পেশায় যেতে হলে কী কী দক্ষতা প্রয়োজন, কোন পরীক্ষায় বসতে হবে, কোথায় ইন্টার্নশিপ করতে হবে কিংবা কী ধরনের অভিজ্ঞতা দরকার এসব নিয়ে পরিকল্পনা থাকে না।



তাই ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় প্রথমেই প্রয়োজন ক্যারিয়ার রোড ম্যাপ (Career Roadmap)।


অর্থাৎ পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাই এবং সেখানে পৌঁছাতে আগামী এক বছর, তিন বছর ও পাঁচ বছরে কী করতে হবে তার একটি বাস্তবসম্মত নকশা।


বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘ডিগ্রি একা যথেষ্ট নয় বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করছেন।


ফলে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরির বাজারে আলাদা হয়ে ওঠা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।


একই বিষয়ে অনেক প্রার্থী থাকলেও যার যোগাযোগ দক্ষতা ভালো, ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ, সমস্যা সমাধান করতে পারে, দলগতভাবে কাজ করতে পারে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে নিয়োগের ক্ষেত্রে সে এগিয়ে যেতে পারে।


তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্ট, স্বেচ্ছাসেবী কাজ, পোর্টফোলিও, প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা এখন ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


প্রথম চাকরি  স্বপ্নের চাকরি না হলেও সমস্যা নেই

ক্যারিয়ারের শুরুতেই কাঙ্ক্ষিত পদ বা বড় বেতন না পাওয়া ব্যর্থতা নয়।


বরং প্রথম চাকরি হতে পারে শেখার জায়গা।


একজন তরুণ যদি প্রথম কয়েক বছরকে শুধু বেতনের হিসাব না করে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক এবং পেশাগত পরিচিতি তৈরির সময় হিসেবে ব্যবহার করে, পরবর্তী সময়ে তার সুযোগ অনেক বাড়তে পারে।


তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো চাকরিতে বছরের পর বছর আটকে থাকতে হবে। নিয়মিত নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে দেখতে হবে এই কাজটি কি আমাকে নতুন কিছু শেখাচ্ছে?


আমার বাজারমূল্য বাড়াচ্ছে?


ভবিষ্যতের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিচ্ছে?


উচ্চশিক্ষা নাকি কর্মজীবন সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত উদ্দেশ্যভিত্তিক


শুধু সবাই বিদেশে যাচ্ছে বলে বিদেশে পড়তে যাওয়া, কিংবা বন্ধুরা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে একই পথে হাঁটা ক্যারিয়ার পরিকল্পনা হতে পারে না।


মাস্টার্স, এমবিএ, পিএইচডি বা অন্য কোনো উচ্চশিক্ষা তখনই অর্থবহ, যখন সেটি নির্দিষ্ট ক্যারিয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত।


অন্যদিকে কোনো ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা উচ্চশিক্ষার চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে।


অর্থাৎ প্রশ্ন হওয়া উচিত


আরও একটি ডিগ্রি আমার ভবিষ্যৎকে কীভাবে এগিয়ে দেবে?


শুধু “আরও পড়াশোনা করব কি না?” নয়।


ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘Plan B’ থাকা জরুরি: 


ক্যারিয়ার সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। চাকরি হারানো, অর্থনৈতিক সংকট, পেশা বদল, প্রযুক্তির পরিবর্তন কিংবা ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যেকোনো কিছু পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে।


তাই একটি নির্দিষ্ট পেশার ওপর পুরো ভবিষ্যৎ নির্ভর না করে ট্রান্সফার এবং স্কিল( Transferable Skills) তৈরি করা জরুরি যেমন যোগাযোগ, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার, বিশ্লেষণ, লেখালেখি, সমস্যা সমাধান ও দ্রুত নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা।


এই দক্ষতাগুলো একটি পেশা থেকে অন্য পেশায় যাওয়ার পথও সহজ করে।


ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সম্পদ নিজেকে আপডেট রাখার ক্ষমতা।


আজ যে দক্ষতার চাহিদা আছে, পাঁচ বছর পর তার চেহারা বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের কারণে অনেক পেশার কাজের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।


তাই উচ্চশিক্ষা শেষ করে শেখা বন্ধ করে দিলে চলবে না। বরং কর্মজীবনের পাশাপাশি নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি, নতুন দক্ষতা ও নিজের ক্ষেত্রের পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে হবে।


শেষ কথা


ক্যারিয়ার পরিকল্পনা কোনো একদিন বসে তৈরি করা একটি কাগজ নয় এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া।


উচ্চশিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে কীভাবে দক্ষতায় পরিণত করা হবে, কীভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা হবে এবং নিজের জন্য উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা হবে সেটিই শেষ পর্যন্ত ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেয়।


তাই সন্তানের হাতে শুধু একটি ভালো ডিগ্রি তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সে চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজের যোগ্যতা দিয়ে সুযোগ তৈরি করতে পারে।


কারণ ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো আর থাকবে না “তুমি কী পড়েছ?”


বরং প্রশ্ন হবে “তুমি কী করতে পারো"।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad