পর্দার আড়ালে নয়, মানুষের মনে বেঁচে আছেন এটিএম শামসুজ্জামান

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা চলচ্চিত্রে কিছু মুখ সময় পেরিয়েও দর্শকের স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। চরিত্রের বৈচিত্র্য, অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধরন আর সংলাপ উপস্থাপনের নিজস্ব ভঙ্গিতে তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম এ টি এম শামসুজ্জামান। খলনায়ক, কৌতুক অভিনেতা, চরিত্রাভিনেতা কিংবা পার্শ্বচরিত্র—যে ভূমিকাতেই তিনি হাজির হয়েছেন, নিজের অভিনয়গুণে সেটিকে করে তুলেছেন আলাদা। আজ ১০ সেপ্টেম্বর, কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মবার্ষিকী। ১৯৪১ সালের এই দিনে নোয়াখালীর দৌলতপুরে জন্ম নেওয়া এ টি এম শামসুজ্জামান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে অভিনয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।


অভিনয়ে আসার গল্পটাও ছিল অন্যরকম


অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়নি। চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম দিকের কাজ ছিল সহকারী পরিচালক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে অভিনয় তাঁকে এমনভাবে টেনে নেয় যে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৫ সালে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশের পর ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। টেলিভিশনে ‘সংসপ্তক’ নাটকে রমজান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের নজরে আসেন। এরপর চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়জীবনে আসে একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র।



খলনায়ক, অথচ দর্শকের প্রিয়


বাংলা সিনেমায় খলনায়ক মানেই ভয় কিংবা ঘৃণা—এ টি এম শামসুজ্জামানের অভিনয় সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল। তাঁর খলচরিত্রগুলো ছিল শুধু ‘খারাপ মানুষ’-এর সরল উপস্থাপন নয়; সংলাপ, চোখের ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি এবং কণ্ঠের ওঠানামায় তিনি চরিত্রগুলোকে করে তুলতেন জীবন্ত। ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘আসামি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে শক্তিশালী খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশেষ করে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-এর মণ্ডল চরিত্র তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু তিনি যে শুধু খলনায়কেই আটকে ছিলেন, তা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৌতুক, পারিবারিক, সামাজিক ও নানা ধরনের চরিত্রে নিজেকে ভেঙে নতুন করে তৈরি করেছেন।



হাসাতে জানতেন, কাঁদাতেও


এ টি এম শামসুজ্জামানের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন দর্শক তাঁর অভিনয়ে ভয় পেয়েছে, অন্যদিকে তাঁর হাস্যরসাত্মক অভিনয়ে অট্টহাসিও হেসেছে। ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসেনা পড়ার টেবিলে’, ‘চোরাবালি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন—একটি নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে তাঁকে আটকে রাখা যায় না। তাঁর অভিনয়ের স্বাভাবিকতা ও নিজস্ব কমিক এক্সপ্রেশনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।



শুধু অভিনেতা নন, ছিলেন লেখকও


এ টি এম শামসুজ্জামানের প্রতিভার আরেকটি বড় দিক ছিল তাঁর লেখনী। তিনি গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের গল্প বলার ভেতরের কারিগরিতেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘মোল্লা বাড়ির বউ’ চলচ্চিত্রে তিনি গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখার পাশাপাশি অভিনয়ও করেছিলেন। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে অভিনয় করার পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনের সৃজনশীল কাজেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ।



পুরস্কার এসেছে, স্বীকৃতিও এসেছে


অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর ঝুলিতে ছিল শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার মতো সম্মাননা। ২০১৭ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাও পান। শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।



শিল্পের প্রতি নিবেদিত


সহকর্মীদের স্মৃতিতে এ টি এম শামসুজ্জামান শুধু একজন বড় অভিনেতা নন, ছিলেন বিনয়ী, রসিক ও কাজের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত একজন মানুষ। অভিনেত্রী ববিতা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠার কথা বলেছেন—শুটিংয়ে নিজের দৃশ্য না থাকলেও তিনি পুরো গল্প ও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাইতেন। সহকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, তাঁর মতো শিল্পীর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। 



মানুষ চলে যান, চরিত্র থেকে যায়


২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছর বয়সে এ টি এম শামসুজ্জামান চলে যান না-ফেরার দেশে। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত। আজও পুরোনো কোনো সিনেমায় তাঁর মুখ দেখা গেলে দর্শক থমকে যান। কোনো সংলাপ কানে এলে মনে পড়ে যায় তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠ। কোনো চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখলে বোঝা যায়—অভিনয় শুধু সংলাপ বলা নয়, চরিত্রের ভেতরে ঢুকে তাকে নিজের করে নেওয়ার নাম। এ টি এম শামসুজ্জামান তাই শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়; তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর অভিনয়ের চরিত্রগুলো হয়তো সময়ের সঙ্গে পুরোনো হবে, কিন্তু তাঁর অভিনয়ের স্মৃতি পুরোনো হবে না।

sidebar ad