ধর্মের পরিচয় আমাদের আলাদা করতে পারে, কিন্তু মানবিকতার পরিচয় একসঙ্গে বাঁচতে শেখায়: শাবানা আজমী

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ধর্ম মানুষের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই পরিচয়ই যখন মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—ধর্মের আগে কি আমরা মানুষকে দেখতে ভুলে যাচ্ছি?


সম্প্রতি জুমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী শাবানা আজমী নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। তাঁর কথায়, সব ধর্মের উগ্রপন্থীরাই তাঁকে ও তাঁর স্বামী, লেখক-গীতিকার জাভেদ আখতারকে সহ্য করতে পারেন না।


কারণটা কী?


সম্ভবত তাঁরা কোনো একটি ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে নিজেদের আটকে রাখেননি। বরং যুক্তি, মানবিকতা ও স্বাধীন চিন্তার জায়গা থেকে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছেন। আর সেখানেই আপত্তি উগ্রতার।



শাবানা আজমীর বক্তব্য অনুযায়ী, কখনো তাঁদের সন্ত্রাসবাদী বলা হয়েছে, আবার কখনো তাঁদের কাছে ফতোয়া পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ ভিন্নমত প্রকাশের মূল্য হিসেবে তাঁদের নানা ধরনের আক্রমণ ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে।



কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা তাঁদের নিজেদের অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।এখানেই হয়তো তাঁদের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি লুকিয়ে আছে। উগ্রতা কোনো একটি ধর্মের একক সমস্যা নয়। যখন ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে অসহিষ্ণুতা মিশে যায়, তখন ‘আমরা’ আর ‘ওরা’র বিভাজন তৈরি হয়। অন্যের বিশ্বাস, মত কিংবা জীবনযাপনকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা কমতে থাকে। আর ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে শুরু হয় আক্রমণ, অপবাদ কিংবা ভয় দেখানোর চেষ্টা।


শাবানা আজমীর অভিজ্ঞতা তাই শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি বৃহত্তর সমাজের জন্যও একটি আয়না আমরা প্রায়ই একজন মানুষকে তাঁর ধর্ম, জাতি, রাজনৈতিক মত কিংবা সামাজিক পরিচয় দিয়ে বিচার করি। তাঁর চিন্তা, মানবিকতা কিংবা কাজকে দেখার আগে পরিচয়ের ছক তৈরি করে নিই। অথচ একজন মানুষকে বুঝতে হলে তাঁর পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর বিবেক, মূল্যবোধ ও আচরণকেও দেখতে হয়।



শাবানা আজমীর আহ্বান যেন সেখানেই—ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করা। ভিন্ন ধর্মের মানুষ মানেই ভিন্ন শত্রু নয়। ভিন্ন মতের মানুষ মানেই ভুল মানুষ নয়। আর নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকা মানেই অন্যের বিশ্বাসকে অসম্মান করা নয়।



একটি বহুত্ববাদী সমাজে সহাবস্থানের সবচেয়ে বড় শর্তই হলো ভিন্নতাকে মেনে নেওয়া। আপনি যে ধর্মে বিশ্বাস করেন, অন্য একজন হয়তো অন্য ধর্মে বিশ্বাস করেন—কিংবা কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করেন না। তবু দুজনেরই মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।



উগ্রতার সবচেয়ে বড় বিপরীত শক্তি হয়তো যুক্তি নয়, মানবিকতা। কারণ মানবিকতা মানুষকে পরিচয়ের খাঁচা থেকে বের করে অন্য মানুষের কষ্ট, ভয়, আনন্দ ও স্বপ্নকে বুঝতে শেখায়।



শাবানা আজমী ও জাভেদ আখতার তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হয়তো সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেন—কাউকে তাঁর ধর্ম দিয়ে নয়, আগে তাঁর মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেখুন।



কারণ শেষ পর্যন্ত ধর্মের পরিচয় আমাদের আলাদা করতে পারে, কিন্তু মানবিকতার পরিচয়ই আমাদের একসঙ্গে বাঁচতে শেখায়।

sidebar ad