আপনি আপনার সন্তানকে নিয়ে শপিংমলের করিডোর ধরে হাঁটছেন। হঠাৎ পাশের টয় শপের কাচের দরজার ওপাশে চোখ আটকে গেল তার। রঙিন একটা খেলনা, যেটা সে অনেক দিন ধরেই চাইছে। মুহূর্তেই আপনার হাতটা শক্ত করে ধরে সে এটা চেয়ে বসলো।
আপনি শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু
সে শুনবে কেন! চোখেমুখে বিরক্তি, তারপর কান্না, এরপর যথারীতি মাটিতে বসে পড়া। চারপাশের
মানুষও তাকাতে শুরু করেছে।
ঠিক এই অবস্থায় আপনার কি করনীয় বলে মনে করেন?
খেলনাটা কিনে দেবেন?
নাকি শক্ত করে বলবেন, “না মানে না!”
নাকি তার অনুভূতিটা বুঝিয়ে, কিন্তু নিজের
সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন?
একসময় বলা হতো, “বাচ্চা বেশি কথা বলছে, শাসন
করো।” এরপর প্যারেন্টিং- এর ক্ষেত্রে এলো নতুন ধারণা। সেখানে বলা হলো, “বাচ্চার অনুভূতি
বুঝতে হবে, ইমোশন বুঝতে হবে। তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ”
কিন্তু যদি পথটা এই দুইয়ের মাঝখানে হয়?
সন্তান কাঁদলে তাকে বলা হবে, “আমি বুঝতে
পারছি তুমি এটা খুব চাইছ।” কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বলা হবে, “তবু আজ আমরা খেলনাটা কিনব
না।”
শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, অথচ প্রতিটি আবদারের কাছে নতি স্বীকার না করা; এই ভারসাম্যের প্যারেন্টিং- ই এখন আলোচনায় আসছে, যা ‘হাইব্রিড প্যারেন্টিং’ নামে অভিহিত।
হাইব্রিড প্যারেন্টিং কি?
২০২৬ সালে সন্তান লালন-পালনের পদ্ধতি আলোচনায়
হাইব্রিড প্যারেন্টিং শব্দটি নতুন করে নজর কাড়ছে। বিশেষ করে জেন্টেল প্যারেন্টিং নিয়ে অনেক বাবা-মায়ের ক্লান্তি ও বিভ্রান্তির
পর এই ধারণাটি লাইম লাইটে এসেছে। হাইব্রিড প্যারেন্টিং- এর সত্যিকার অর্থে তেমন সর্বজনস্বীকৃত
সংজ্ঞা বা নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ফ্রেমওয়ার্ক নেই। বরং বিভিন্ন প্যারেন্টিং ফিলোসোফি থেকে প্রয়োজনীয় দিকগুলো নিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী
প্রয়োগ করার একটি ধারণা হিসেবে শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সহজভাবে, হাইব্রিড প্যারেন্টিং কে সন্তান
পালনের ঐতিহ্যগত ধারা ও আধুনিক ধারার মাঝামাঝি একটি পথ বলে অভিহিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ,
হাইব্রিড প্যারেন্টিং হলো এমন একটি নমনীয় পদ্ধতি, যা জেন্টেল প্যারেন্টিং এর আবেগঘন
উষ্ণতার সঙ্গে দৃঢ় সীমারেখা ও অভিভাবকীয় নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটায়।
অর্থাৎ, সন্তানকে ভালোবাসবেন বন্ধুর মতো,
তার অনুভূতি, ইমোশন সহানুভূতির সঙ্গে বুঝবেন; কিন্তু প্রয়োজনের জায়গায় ‘না’ বলার স্পেসটাও
রাখবেন অভিভাবকের মতো।
এই ব্যবস্থায় শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া
হবে, কিন্তু তার প্রতিটি চাহিদাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে না।
একটা উদাহরণ দেয়া যাক-
ধরুন, বাচ্চা রাতে মোবাইল নিয়ে খেলার জন্য
বায়না ধরেছে। কঠোর শাসনের ধারায় হয়তো বলা হতে পারে, “এখনই
মোবাইল দাও না হলে মার দেব!”
আবার জেন্টেল প্যারেন্টিংয়ের ভুল প্রয়োগে হয়তো অভিভাবক বারবার শিশুর অনুরোধের সঙ্গে আপস করতে পারেন।
কিন্তু হাইব্রিড প্যারেন্টিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি
হতে পারে— “আমি জানি তুমি আরও খেলতে চাও। খেলাটা মজার।
কিন্তু আমাদের স্ক্রিন টাইম শেষ। এখন মোবাইল বন্ধ হবে। তুমি চাইলে ঘুমানোর আগে একটা
গল্প শুনতে পারো।”
একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন, এখানে কিন্তু একসাথে
তিনটি জিনিস হচ্ছে— অনুভূতির স্বীকৃতি + নির্দিষ্ট সীমারেখা
+ বিকল্প ব্যবস্থা। আর এটাই এই প্যারেন্টিং- ধারণাটির সবচেয়ে
সুন্দর জায়গা।
এখন হয়তো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, প্যারেন্টিং
এর এই ফর্মুলা কি তবে ৫০% স্ট্রিক্ট এবং ৫০% জেন্টেল এর সমন্বয়?
উত্তর হলো, না। বিষয়টা ঠিক এমন না।
কারণ প্যারেন্টিং কোনো নির্দিষ্ট অনুপাতের
ফর্মুলা নয়; এটি পরিস্থিতি, শিশুর বয়স, স্বভাব এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে যায়। শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে- এই নীতিতে
বিশ্বাসী ঐতিহ্যগত ধারার কড়া অনুশাসন এবং জেন্টেল প্যারেন্টিং এর পাশ কাটিয়ে শিশুর
জন্য কার্যকর, পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযোগী প্যারেন্টিং স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করতে হবে।
অর্থাৎ, কখনো কোমল হতে হবে তো কখনো দৃঢ় হতে
হবে। কখনো শিশুকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে, আবার কখনো বাবা-মাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জেন্টেল প্যারেন্টিং কি তাহলে কাজ করছে না?
বিগত কয়েক বছরে জেন্টেল প্যারেন্টিংয়ের জনপ্রিয়তার
পাশাপাশি এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও উঠছে। মার্কিন শিশু যত্ন সংস্থা কিডি একাডেমির
৬ বছরের কম বয়সী দুই হাজার শিশুর অভিভাবকের উপর করা একটি সমীক্ষা অনুসারে দেখা যায়
যে, জেন জি প্রজন্মের বাবা মায়েরা মানসিকভাবে ক্লান্তিকর এই পন্থা থেকে সরে আসছেন।
আর এর পেছনে কারণ হতে পারে, প্যারেন্টিং এর এই নমনীয় ধরণটির ভূল প্রয়োগ।
জেন্টেল বা পজিটিভ প্যারেন্টিং -এর মূল দর্শন
শিশুর অনুভূতি বোঝা, আবেগের স্বীকৃতি দেয়া, তাকে সম্মান করা, অপমানজনক বা কঠোর শাস্তি
এড়িয়ে চলা এবং একই সঙ্গে উপযুক্ত সীমারেখা তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন এই দর্শনের ভুল
ব্যাখ্যা হয়।
যেমন—
শিশুকে কখনো ‘না’ বলা যাবে না;
সে কাঁদলে কোনোভাবেই তাকে হতাশ করা যাবে
না;
তার সাথে সবকিছু নিয়ে নেগোশিয়েট করতে হবে;
শিশুই সব সিদ্ধান্ত নেবে;
বাবা-মা সীমা নির্ধারণ করলে সেটি ‘খারাপ
প্যারেন্টিং' হয়ে যাবে।
এর দরুন বাবা মায়ের ওপরও দেখা যায় যে, এক
অসহনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। আর সেই জায়গায় হাইব্রিড প্যারেন্টিং বলছে,
শিশুর অনুভূতিকে সম্মান করুন, কিন্তু বাবা মায়ের কর্তৃত্ব হারিয়ে নয়। আর সেখান থেকেই
হয়তো এই ধারণাটির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বাবা-মায়ের নিজের ওপর আস্থাও জরুরি
বর্তমান সময়ে প্যারেন্টিং নিয়ে তথ্যের কোন
অভাব নেই। বই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এক্সপার্ট অপিনিয়ন, পডকাস্ট
কিংবা বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটি —সব জায়গাতেই সন্তান
পালনের রয়েছে নতুন নতুন পরামর্শ।
মনোবিজ্ঞানী ও প্যারেন্টিং এক্সপার্ট ড. ভ্যানেসা ল্যাপয়েন্টও এইসব অতিরিক্ত তথ্য ও
পরামর্শের চাপে বাবা-মায়ের নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে বাবা-মায়েদের ওপর প্যারেন্টিং নিয়ে অতিরিক্ত তথ্য ও পরামর্শের
চাপ তৈরি হয়েছে। কীভাবে আরও ভালো বাবা-মা হওয়া যায়—এ নিয়ে প্রতিনিয়ত
নতুন নতুন পরামর্শ আসছে। ফলে কোনটা অনুসরণ করবেন, আর কোনটা করবেন না; তা নিয়েও অনেক
সময় বাবা-মায়েরা দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছেন।
আমরা যত বেশি তথ্যের স্রোতে ডুবে যাচ্ছি,
তত বেশি নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা হারাচ্ছি। অন্যদের পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে
করতে একসময় বাবা-মা হিসেবে নিজের অনুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টির কথাই শুনতে ভুলে যাচ্ছি।
হাইব্রিড প্যারেন্টিং- এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো-
- কোনো কঠোর নিয়ম নেই। অভিভাবকরা শুধু একটি
পদ্ধতি অনুসরণ না করে, শিশুর বয়স, স্বভাব, প্রয়োজন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পদ্ধতি বদলানোর
সুযোগ থাকে।
- আবেগের স্বীকৃতি দেয়া। শিশুর যেকোনো আবেগ
রাগ, অভিমান, ভয় বা দুঃখকে ‘এগুলো কিছু না’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হবে না। প্রথমে তা বোঝার
চেষ্টা করা হয়।
তবে অনুভূতি স্বাভাবিক হলেও সেই অনুভূতির
কারণে করা প্রতিটি আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
- পজিটিভ প্যারেন্টিং নিয়ে অনেক বাবা-মায়ের
একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, শিশুকে “না” বলা যাবে না। সেখানে হাইব্রিড প্যারেন্টিং এ
বলে, প্রয়োজন হলে স্পষ্ট ‘না’ বলুন। তবে চিৎকার, অপমান বা ভয় দেখিয়ে নয়। নমনীয়তা কিন্তু
দৃঢ়তার সাথে তা করতে হবে।
- সবকিছুর মাঝে একটা অদৃশ্য সীমারেখা থাকবে।
যেমন, ঘুমের একটা নির্দিষ্ট সময় থাকা, স্ক্রিন টাইমের সীমা থাকা, বয়স অনুযায়ী ছোট ছোট
দায়িত্ব নেওয়া ইত্যাদি। তবে বাউন্ডারি থাকলেও, তাতে ভয় থাকবেনা। আর নিয়ম ভাঙলেই শিশুকে
খারাপ বাচ্চা বলে চিহ্নিত করা হবে না।
- শিশুর প্রতিটি ইমোশন সামলাতে গিয়ে বাবা-মা নিজেরাই যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত, অপরাধবোধে ভোগা কিংবা মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যান, সেটিও স্বাস্থ্যকর প্যারেন্টিং নয়। কেবল বাচ্চার মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে অভিভাবকরা নিজেরা যেন 'প্যারেন্টিং বার্নআউট'-এ না ভোগেন, সেদিকে খেয়াল রাখাও জরুরি।
তবে হাইব্রিড প্যারেন্টিং কি সবার জন্য একই
রকম?
একেবারেই নয়।
একটি তিন বছরের শিশুর সঙ্গে যে ধরনের বাউন্ডারি প্রয়োজন, তা কিশোর সন্তানের ক্ষেত্রে একই হবে না।
আবার একেক শিশুর আবেগ, অনুভূতি, ম্যাচুরিটি লেভেল এবং পারিবারিক পরিস্থিতিও একেক রকম।
তাই হাইব্রিড প্যারেন্টিং -এর সবচেয়ে বড়
পজিটিভ দিক সম্ভবত এর নমনীয়তাভাব।
এটি বাবা-মাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে আটকে না রেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়।
কখনো শিশুকে জড়িয়ে ধরতে হবে।
কখনো তার কথা চুপচাপ শুনতে হবে।
কখনো তাকে নিজের মতো করে চেষ্টা করতে দিতে
হবে।
আবার কখনো দৃঢ়ভাবে তাকে কোনকিছু করা থেকে
বিরত রাখতে হবে।
সন্তানকে ভালোবাসা মানেই তার প্রতিটি ইচ্ছা
পূরণ করা নয়। আর শাসন করা মানেই কঠোর হয়ে ওঠাও নয়।
সুস্থ প্যারেন্টিং হয়তো এই দুইয়ের মাঝখানেই—যেখানে ভালোবাসায়
কোমলতা আছে, আবার প্রয়োজনের জায়গায় সীমারেখাও আছে।
ঢাকা/টিএ