একজন মা যখন প্রতিদিন সন্তানের যত্ন নেন, তখন তিনি শুধু সন্তানের খাবার, পড়াশোনা বা শারীরিক স্বাস্থ্যের দায়িত্বই নেন না। তাঁকে নিজের আবেগ, ক্লান্তি, ভয়, দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপও সামলাতে হয়।
কিন্তু একজন মানসিকভাবে ক্লান্ত মা কীভাবে সব সময় ধৈর্যশীল থাকবেন?
মায়ের মানসিক চাপ সন্তানের সঙ্গে তাঁর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার একজন শান্ত, নিরাপদ ও মানসিকভাবে সুস্থ মা সন্তানের জন্য নিরাপদ একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারেন।
তাই মায়ের জন্য চাই—
একটু বিশ্রাম
নিজের জন্য কিছু সময়
পরিবারের সহযোগিতা
নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ
পর্যাপ্ত ঘুম
সম্মান ও মানসিক নিরাপত্তা
এসব বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন
মাকে শুধু ভালো মা হওয়ার দায়িত্ব দেবেন না, তাঁকে একজন মানুষ হিসেবেও যত্ন নিন। কারণ একটি শিশুর সুন্দর শৈশব গড়ে উঠতে পারে তখনই, যখন তার চারপাশের মানুষগুলোও যত্ন ও ভালোবাসার মধ্যে থাকে।
মায়ের যত্ন মানেই সন্তানের যত্ন
মনোবিজ্ঞানী ও শিশু-উন্নয়ন গবেষকদের বক্তব্যের সঙ্গে কথাটির ভালো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এর মানে এই নয় যে মা মানসিকভাবে খারাপ থাকলেই সন্তান খারাপ হবে। বরং মায়ের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ তাঁর প্যারেন্টিং ও মা-সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। আর সেটি সন্তানের আবেগগত ও আচরণগত বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণা কী বলছে?
মায়ের মানসিক অবস্থা প্যারেন্টিংয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে
বিষণ্ণতা বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থাকলে মায়ের পক্ষে সন্তানের প্রতি আগের মতো ধৈর্য, সাড়া দেওয়া, প্রশংসা ও ইতিবাচক যোগাযোগ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। গবেষণায় মায়ের বিষণ্ণতার সঙ্গে কম সংবেদনশীল এবং বেশি বিচ্ছিন্ন বা কঠোর প্যারেন্টিংয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সন্তানের আবেগগত ও আচরণগত বিকাশে প্রভাব পড়তে পারে
বিভিন্ন গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণে মায়ের বিষণ্ণতার সঙ্গে সন্তানের জ্ঞানীয়, আবেগগত ও আচরণগত সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
২০২৬ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ৪৭টি র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল এবং ৭ হাজার ৭৪৫ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মায়ের বিষণ্ণতার মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা শুধু মায়ের বিষণ্ণতা কমাতেই সাহায্য করেনি, মা-সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশের গবেষণাতেও একই ধরনের বার্তা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে করা একটি র্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে প্যারেন্টিং ও পুষ্টিবিষয়ক হস্তক্ষেপের পর মায়েদের বিষণ্ণতার উপসর্গ কমেছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।
তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, সন্তানের যত্ন নেওয়ার আগে মায়ের নিজের যত্ন নেওয়াও সন্তানের যত্নেরই অংশ।
একজন মা যদি সারাদিন মানসিক চাপ, অবহেলা, একাকিত্ব বা ক্লান্তির মধ্যে থাকেন, তাহলে তাঁকে শুধু বলা, ‘সন্তানের জন্য শক্ত থাকো’—এটা সমাধান নয়।
তাঁকে প্রশ্ন করা দরকার—
তুমি কেমন আছো?
তোমার একটু বিশ্রাম দরকার কি?
তোমাকে আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি?
কারণ সুস্থ মা মানেই নিখুঁত মা নন। সুস্থ মা হলেন এমন একজন মা, যিনি নিজের অনুভূতি বুঝতে পারেন, প্রয়োজন হলে সাহায্য চান এবং সন্তানের সঙ্গে একটি নিরাপদ ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
তথ্যসূত্র: সাদারল্যান্ড ও সহকর্মীদের গবেষণা, মোরালেস ও সহকর্মীদের সিস্টেমেটিক রিভিউ এবং কাউইপার্স ও সহকর্মীদের মেটা-অ্যানালাইসিস।
ঢাকা/আরএস