একজন বাবা-মা হিসেবে জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া কী? একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা, নিজের একটি ছোট্ট বাড়ি, হয়তো একটি গাড়ি আর সন্তানের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ। বেশিরভাগ মানুষের স্বপ্ন তো এমনই।
কিন্তু একজন স্পেশাল চাইল্ডের বাবা-মায়ের
কাছে সুখের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের কাছে সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স
নয়, বিলাসবহুল বাড়ি বা দামি গাড়িও নয়। তাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হতে পারে, সন্তানটি একদিন
স্পষ্ট করে মা-বাবা বলে ডাকবে, নিজের হাতে এক চামচ খাবার খেতে পারবে, কারও সাহায্য
ছাড়া কয়েক কদম হাঁটতে পারবে কিংবা অন্য শিশুদের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে হেসে উঠবে। যে
মুহূর্তগুলো অনেক পরিবারের কাছে খুবই সাধারণ, একজন স্পেশাল চাইল্ডের মা-বাবার কাছে
সেগুলোই হয়ে উঠে সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি।
বিশ্বকাপে বল পায়ে মাঠের এক প্রান্ত থেকে
আরেক প্রান্তে দুরন্ত গতিতে ছুটে বেড়ানো স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়াকে নিশ্চয়ই
অনেকে দেখেছেন। ঝাঁকড়া চুল, দুর্দান্ত ডিফেন্স, উচ্ছ্বসিত উদযাপন; সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন
দর্শকদের অন্যতম আকর্ষণ।
এতো যশ, এতো পরিচিতি; কিন্তু স্টেডিয়ামের
আলো নিভে গেলে, করতালির শব্দ থেমে গেলে, সেই মানুষটির নিজ ভূবনেও আছে এমন এক বেদনা,
যা সবকিছুর উল্লাসকে ম্লান করে দেয়। “আমার যদি এক পয়সাও না থাকতো, তবুও আমি তা মেনে
নিতাম। যদি তার বিনিময়ে আমার ছেলে সুস্থ থাকতো’’। নিজের অটিস্টিক ছেলেকে নিয়ে বলা এই
একটি বাক্য যেনো হাজারো শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে। এটি শুধু একজন বিখ্যাত ফুটবলারের
ব্য্যক্তিগত অনুভূতি নয়, যেনো তা পৃথিবীর অসংখ্য
স্পেশাল চাইল্ড বাবা-মায়ের মনের হাহাকার ফুটে উঠেছে।
সন্তান প্রতিটি মা-বাবার জীবনে সৃষ্টিকর্তার
সবচেয়ে সুন্দর আশীর্বাদ। তাকে লালন-পালন করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে
জীবনের সবচেয়ে বড় কঠিন কিন্তু তৃপ্তির দায়িত্বগুলোর একটি। তবে একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন
শিশুর অভিভাবক হওয়ার পথ একেবারেই আলাদা। বলা হয়, একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্মের
সাথে সাথেই একজন বিশেষ বাবা-মায়েরও জন্ম হয়। সেই পথচলায় প্রত্যাশার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতা
বেশি, অভিযোগের চেয়ে ধৈর্য বেশি আর শর্ত ছাড়া নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই বড় হয়ে উঠে।
কোনো বাবা-মা ই চান না যে তাদের সন্তান
অসুস্থ কিংবা স্পেশাল চাইল্ড হোক। এটি এমন কোনো অভিজ্ঞতা নয় যা কেউ আশা করে, বরং এটি
একটি অপরিকল্পিত যাত্রা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান লালন-পালন করা কেবল কঠিনই নয়-
এটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। উদ্বেগ, দুঃখ, অসহায়ত্ব, মানসিক চাপের এক মিশ্র
অনুভুতির সাথে প্রতিনিয়তই লড়াই করেন, যা সন্তানের বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরও তীব্র হতে
থাকে। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামলানো, বাড়তি কাজের চাপ, আর্থিক চিন্তা, সন্তানের স্বাস্থ্য,
অগ্রগতি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সবকিছু নিয়ে এর মানসিক প্রভাব পড়ে সুদূরপ্রসারী।
অনেক বাবা-মা নীরবে সেই মানসিক যন্ত্রণা
ভালোভাবে সামলাতে পারেন না। যা উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা এবং হতাশার আকারে প্রকাশ পায়।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় প্রতি পাঁচজন বাবা-মায়ের মধ্যে
একজনের মধ্যে এমন লক্ষণ দেখা যায় যা তাদের সাময়িকভাবে পিটিএসডি হিসেবে চিহ্নিত করার
জন্য যথেষ্ট।
মানসিক চাপের বাইরেও এটি জটিল স্বাস্থ্যগত
সমস্যা নিয়ে আসে। ক্লান্তি, পেশী ও হাড়ের ব্যথা এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার মতো
শারীরিক সমস্যাগুলো দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। এছাড়াও, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক
চাপ শরীরে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) এবং সিআরপি এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগ, উচ্চ
রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একজন ক্লান্ত মা প্রায়শই
স্বাস্থ্যের এই সতর্ক সংকেতগুলো উপেক্ষা করেন, কারণ তিনি শুধুমাত্র তার সন্তানের চাহিদার
উপরই মনোযোগ দেন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের মায়েদের
অবসাদ নিঃশব্দে এসে ভর করে। অবসাদের লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় হঠাৎ করেই একরাশ অদৃশ্য
শূন্যতা এসে ভর করা, যে কাজগুলো আগে করতে ভালোবাসতেন, সেগুলোতে এখন আর কোন আনন্দ খুঁজে
না পাওয়া, নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আসা, ছোটখাটো বিষয়েও সহজে রেগে বা উত্তেজিত হয়ে পড়া।
এই মানসিক টানাপোড়েন কখনো অসহায় বোধ করায়, আবার কখনো বা চরম হতাশ হয়ে পড়ার মধ্যে দিয়ে
যায়।
বাইরে যাওয়া বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান,
পারিবারিক আয়োজনে অংশ নেওয়া অনেক সময়ই বাবা-মায়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানের
অস্থির আচরণ, সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া বা ভিন্ন আচরণ দেখে অনেকের কৌতুহল দৃষ্টি বা ভুল
ধারণাপ্রসূত মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। এসব মুহূর্ত একজন মা-বাবার জন্য যেমন বিব্রতকর
তেমনি মানসিকভাবে কষ্টদায়কও।
বারবার এসব পরিস্থিতি এড়াতে অনেক পরিবারই
ধীরে ধীরে এসব সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। এতে শুধু সন্তানের সামাজিক মেলামেশার
সুযোগই কমে যায় না, বাবা-মাও তাদের নিজেদের ছোট্ট জগতে গুটিয়ে যান।
তাহলে করণীয় কি?
সবার প্রথমেই যেটা খুবই প্রয়োজন তা হলো,
নিজের সাথে বোঝাপড়া করা। আমি নিজে কেমন অনুভব করছি, তার উপরই কিন্তু নির্ভর করছে শিশুটির
সাথে আমার আচরণ কেমন হবে। শিশুরা মূলত আমাদের আবেগ বা অনুভূতি সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল
হয়। আমরা যদি খুশি থাকি তবে তার প্রভাব তাদের ওপর পড়ে, আর আমরা যদি মানসিকভাবে চাপের
মধ্যে থাকি, তবে সেই চাপ তাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।
“আমার সন্তান কেন অন্যদের চেয়ে আলাদা”,
“কেন আমার সাথেই এমন হলো”- এমন তুলনা করে অনেক সময় নিজেকেই দোষারোপ করা হয়। কিন্তু
সত্যিকার অর্থে এই থেকে কোন উত্তর পাওয়া যায়না। বরং এতে নিজের এবং সন্তানের দুজনেরই
ক্ষতি হয়। নিজেকে গ্রহণ করতে শিখলে, সন্তানকেও তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভালোবাসতে
শিখলে তবেই পথচলা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
মানসিক অবসাদের মুল কারণ হলো নিজেদেরকে
অগ্রাধিকার তালিকায় একেবারে শেষে রাখা। অনেক বাবা-মা মনে করেন আত্ম-যত্ন মানেই স্বার্থপরতা, কিন্তু এই ধারণাটি
একেবারেই ভূল। আপনার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের যথাযথ যত্ন নেওয়ার জন্য আপনাকে নিজের যত্ন নিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে বাবা-মায়ের
মানসিক অবস্থা এবং তাদের সন্তানদের বিকাশের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। তাই
নিজের যত্ন নেওয়ার এই সময়গুলোকে
আপনার সন্তানের থেরাপি সেশনের মতোই সমান গুরুত্ব দিন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ,
যদিও তা পাওয়া প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বাদাম, ফল এবং দইয়ের মতো স্বাস্থ্যকর
খাবার হাতের কাছে রাখুন। পর্যাপ্ত পানি পান আপনার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের
ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের
অভিভাবকদের সাথে সংযোগ স্থাপন করুন। আপনার সন্তানের অবস্থার জন্য নির্দিষ্ট ফেসবুক
সাপোর্ট গ্রুপ, কমিউনিটি গ্রুপে যোগ দিন। তাদের বাস্তবসম্মত সমাধান এবং মানসিক সমর্থন
একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করে।
আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার সম্পর্ককে আরও
শক্তিশালী করুন। সন্তান পালনের সমস্যাগুলো যাতে দাম্পত্য কলহে পরিণত না হয়, সেজন্য
সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর বাবা-মা হওয়া
কোনো সাধারণ অভিজ্ঞতা নয়। এটি সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এক বিশেষ দায়িত্ব, এক অনন্য পরীক্ষা।
প্রতিটি দিন যেন ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার এক যাত্রা। তাদের ছোট্ট অগ্রগতি, একটু হাসি কিংবা
কোন নতুন দক্ষতা আবার নতুন করে পথ চলার শক্তি দেয়। অসংখ্য নির্ঘুম রাত, মানসিক চাপ
আর অনিশ্চয়তার মাঝেও তারা উঠে দাঁড়ান, নিজেকে শক্ত রাখেন, ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।
সুপারহিরো দেখতে চাইলে কল্পনার কোন চরিত্রের
দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। চারপাশে তাকান। সেই বাবা-মায়েদের দেখুন, যারা প্রতিদিন নিরবে
নিজের সব ক্লান্তি আড়াল করে সন্তানের মুখে একটি হাসি ফোটানোর জন্য লড়ে যাচ্ছেন। তারাই সত্যিকারের নীরব যোদ্ধা, তারাই আমাদের সময়ের
প্রকৃত সুপারহিরো।
লেখা- শায়লা জাহান
ঢাকা/টিএ