শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য প্রত্যেকেরই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা দরকার। ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল শরীরচর্চা করলেই হবে না, এর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসেও আনতে হবে ব্যাপক পরিবর্তন। এ জন্য অনেকেই ডায়েটিংয়ের পথ বেছে নেন। এর মধ্যে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অন্যতম। যদিও এই ধরনের ডায়েট নতুন নয়, বহু বছর ধরেই এটি প্রচলিত। দ্রুত ওজন কমাতে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ফাস্টিং কী? এর উত্তর আমরা সবাই জানি। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো ক্যালরি গ্রহণ না করা, অর্থাৎ খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকাই ফাস্টিং। উন্নত অন্ত্রের স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে ওজন কমানো—ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য সুবিধাগুলো বেশ আকর্ষণীয়। কারণ, এটি কম ক্যালরি গ্রহণ নিশ্চিত করে। ২০১৯ সালে ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি খোঁজা শব্দগুলোর মধ্যে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ছিল অন্যতম। এই পদ্ধতিতে খাবারের ধরন নিয়ে তেমন কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও খাবার গ্রহণের সময়সীমার ওপর সীমাবদ্ধতা থাকে। বিরতিহীন উপবাস, বিশেষ করে ৫:২ বা ১৬:৮ পদ্ধতি, এখন বেশ জনপ্রিয়। ১৬:৮ পদ্ধতিতে ৮ ঘণ্টার মধ্যে খাবার খেয়ে নিতে হয়। বাকি ১৬ ঘণ্টা উপবাসে থাকতে হয়। আর ৫:২ পদ্ধতিতে সপ্তাহে দুই দিন সীমিত পরিমাণ খাবার খাওয়া যায়। ওজন কমানোর পাশাপাশি হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এ পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে।
শরীরের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে?
মানবস্বাস্থ্যের ওপর ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো—
অটোফ্যাজি
ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি হলো, এটি অটোফ্যাজি নামের একটি প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে পারে। এটি কোষের জন্য এক ধরনের মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। অটোফ্যাজি শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও পুরোনো কোষের অংশ ভেঙে পুনর্ব্যবহার করতে সাহায্য করে, যাতে কোষগুলো আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে। গবেষকেরা সম্ভাব্য রোগ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় অটোফ্যাজির ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং মত দিয়েছেন, ফাস্টিং অটোফ্যাজি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত উপবাস শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং কোষীয় বর্জ্য পরিষ্কার করে আরও দক্ষভাবে কাজ করতে সহায়তা করতে পারে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি
খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন, যেমন ফাস্টিং, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন আনতে পারে। গবেষকদের মতে, কিছু ধরনের উপবাস অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের জন্য উপকারী হতে পারে। এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি, ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস, হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানো এবং স্থূলতা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
সুস্থ হৃদ্যন্ত্র ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ
উপবাস হরমোন ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকলে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে পারে। এ ছাড়া এটি হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে। বিরতিহীন উপবাস নিম্ন ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন (এলডিএল) বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ওজন কমানো
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের জনপ্রিয়তার মূল কারণ এর ওজন কমানোর সম্ভাবনা। এটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিরতিহীন উপবাসে অংশগ্রহণকারীদের শরীরের প্রাথমিক ওজনের ০.৮ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমেছে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
এই ধরনের ফাস্টিং সবার জন্য উপযোগী নয়। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও কিছু সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন অলসতা, খিটখিটে মেজাজ ও মাথাব্যথা।
যাঁদের এই ধরনের ফাস্টিং থেকে বিরত থাকা উচিত—
ফাস্টিং শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সবার জন্য উপযোগী নয়। তাই অন্যকে অনুসরণ না করে, বিশেষ করে যাঁদের শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের যেকোনো ধরনের ডায়েট অনুসরণ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আগামী দিনের সুস্থ জীবনের জন্য সুস্বাস্থ্য অপরিহার্য। সুস্থ পরিবার, সচেতন জীবন—এই বার্তাই রোদসীর অঙ্গীকার।
*শায়লা জাহান
ঢাকা/আরএস