৩ থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুরা পরিবারের বিভিন্ন কাজে বাবা মাকে সাহায্য করতে চায়। ঘর মুছতে চাওয়া, রান্না করতে চাওয়া বা নিজের কাপড় ক্লিন করতে চাওয়া। বড়দের সাহায্য করার এই ইচ্ছে প্রমাণ করে আপনার শিশু এখন প্রাকটিক্যাল স্কিল বা দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব কাজ শিখতে মানসিকভাবে প্রস্তুত। আমরা সাইকোলজিস্টরা শিশুর ৩ থেকে ৫ বছর বয়সের সময়টিকে বলি ইনিশিয়েটিভ ভার্সেস গিল্ট বা উদ্যোগী হওয়া বনাম অপরাধবোধ। অর্থাৎ এই সময় শিশুরা নিজে থেকে যে কোন কাজ শুরু করতে চায়। যদি শিশু কাজটি করার সুযোগ না পায় তাহলে শিশুর ভিতরে অপরাধবোধ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন মনোবিজ্ঞানী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি।
যখন শিশুরা প্রাক্টিক্যাল স্কিল শেখে তখন তারা শুধু কাজই শেখে না, তাদের বিভিন্ন বিকাশ হয়-
- সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করে
- মনযোগ বৃদ্ধি পায়
- ফাইন মোটর দক্ষতা বাড়ে
- শিশুর ভিতরে "আমি কাজ করেছি", "পরিবারে ভুমিকা রাখছি" এমন অনুভূতি তৈরি হয়
- কনফিডেন্স বাড়ে
- নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া শিখে
যেভাবে প্রাক্টিক্যাল স্কিল শেখানো শুরু করবেন-
- যে কোন একটি সহজ এক্টিভিটি দিয়ে শুরু করুন। যেমন, টেবিল মোছা, কাপড় ঝুড়িতে রাখা,
- একটি কাজকে ছোট ছোট কয়েকটি ভাগে ভাগ করে শিশুকে শেখাতে পারেন।
- শিশুকে কাজ শেখাতে শিশুর উপযোগী ছোট আকারের উপকরণ ব্যবহার করুন। যেমন ছোট টেবিল ও চেয়ারে বসে স্যান্ডউইচ তৈরি করা বা সালাদ মিক্স করা।
- নির্দিষ্ট ইন্সট্রাকশন বা নির্দেশনা দেয়া। ছোট ও সহজ ভাষায় নির্দেশনা দেয়া। অনেক বেশি কথা না বলে, কাজটি করে দেখানো।
- শিশুকে চেষ্টা করতে দিন।
- শিশুর কাজ নিখুত না হলেও শিশুর প্রচেষ্টার প্রশংসা করুন৷ কতটুকু পারেনি তা বলা হলে শিশু নিজে থেকে কিছু করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
কিছু সহজ প্রাক্টিক্যাল স্কিল যা শিশুকে শেখাতে পারেন-
- ফার্নিচার মোছা,
- গাছে পানি দেয়া,
- বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢালা,
- চামচ বা টং দিয়ে খেলনা/ পমপম এক বাটি থেকে অন্য বাটিতে রাখা (যা পারলে পরবর্তীতে শিশু বাটি থেকে খাবার নেয়া শিখতে পারবে),
- ফল আর সবজি ধোয়া,
- ছোট ঝাড়ু দিয়ে নির্দিষ্ট এরিয়া পরিষ্কার করতে পারা,
- ছোট কাপড় ভাজ করা,
- স্যান্ডউইচ তৈরি (ব্রেডের সাথে মায়োনিজ দেয়া, ডিম বা চিকেন দেয়া),
- সালাদ তৈরি (সব উপকরণ মিক্স করা),
- ময়দা মাখিয়ে রুটির ডো তৈরি করা,
- খেলার পর খেলনা গুছিয়ে রাখা।
শিশুকে এই বয়সে (৩ থেকে ৫ বছর) কিছু করতে না দিলে যা হতে পারে: শুরুতেই বলেছি, শিশু কাজ করতে না পারলে অপরাধবোধে ভোগে আর এই অপরাধবোধ থেকে শিশুর ভিতরে অবচেতন মনে নানাবিধ নেতিবাচক মেসেজ চলে আসে। যার প্রভাব শিশু বড় হওয়ার পরে, এমনকি সারাটি জীবন থাকতে পারে। এই নেতিবাচক মেসেজ গুলোকে আমরা সাইকোলজিস্টরা বলি ইঞ্জাংকশন বা অবচেতন নেতিবাচক বার্তা।
এখন প্রশ্ন হলো কোন কোন ধরনের নেতিবাচক মেসেজ শিশুর ভিতরে স্থায়ী হতে পারে-
১. "কিছু করো না"- শিশু যখন কোন কাজ করতে চায় তাকে বড়রা বাধা দেয়, তখন তার ভিতরে মেসেজ আসে -
" (নিজে থেকে) কোন কিছু করবে না"।
২. "গুরুত্ব পাওয়ার চেষ্টা করো না"- "নিজেকে গুরত্বপূর্ণ মনে করবেনা"। অর্থাৎ শিশু মেসেজ পায় আমি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ কেউ না তাই আমার কোন কাজ করা পরিবারের কাছে মূল্যবান না।
৩. " তুমি যেমন, তেমন থেকো না " - শিশু মেসেজ পায় আমার অথেনটিক অনুভূতি প্রকাশ করা যাবে না। আমি কি করতে চাই তা অন্য কাউকে বুঝতে দেয়া যাবে না।
৪. " কখনোই ভুল করা যাবে না"- শিশুরা নিজে থেকে কোন কাজ করার চেষ্টা করে যদি ভুল করে, বড়রা শিশুদের বকা দেয় বা মারধোর করে। এতে শিশু শিখে - " আমি যদি কোন ধরনের ভুল করি, আমার ভুল কেউ মেনে নিবে না, আমাকে কেউ ভালোবাসবেনা"।
শিশুকে যখন আপনি কাজ করতে দিবেন, শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। কাজ করতে না দিলে শিশুর কনফিডেন্স বাড়বে না, শিশু নিজেকে নিয়ে দ্বিধায় থাকবে।
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত শিশুর প্রতীকী ছবি ও মনোবিজ্ঞানী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি
এস এন