আশির দশকের ফ্যাশন ছিল অনেকটাই ‘মোর ইজ মোর’। চুল একটু বেশি বড়, পোশাক একটু বেশি রঙিন, কানের দুল একটু বেশি বড়, মেকআপ একটু বেশি স্পষ্ট—সবকিছুতেই ছিল দৃশ্যমানতার একটা আনন্দ।
আজকের ঝকঝকে, মিনিমাল ও ‘ক্লিন’ ফ্যাশনের বিপরীতে ৮০-এর দশকের ফ্যাশন ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত, সাহসী এবং চোখে পড়ার মতো। পোশাকে ছিল উজ্জ্বল রং, চুলে ভলিউম, কাঁধে বাড়তি জোর, আর সাজে ছিল নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার প্রবণতা। বাংলা সিনেমা থেকে বলিউড—তারকারা এই ট্রেন্ডকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।
চুলে যত বেশি ভলিউম, তত বেশি স্টাইল
৮০-এর দশকের ফ্যাশনের কথা উঠলে প্রথমেই মনে পড়ে বড় ও ঘন চুল। মেয়েদের চুলে ছিল ফোলা ফোলা ভলিউম, কার্ল বা ঢেউ খেলানো স্টাইল। ছেলেদের মধ্যেও তুলনামূলক লম্বা চুল এবং ঘন সাইডবার্ন ছিল বেশ জনপ্রিয়।
সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের চুলের স্টাইল অনেক সময় দর্শকের কাছে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হয়ে উঠত। পর্দায় প্রিয় তারকার মতো চুল কাটানো বা সাজ নেওয়া ছিল সেই সময়ের তরুণদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
শাড়িতে ঐতিহ্য, সাজে গ্ল্যামার
বাংলা সিনেমার নায়িকাদের সাজে শাড়ির উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শাড়ি পরার ধরন ছিল আজকের মতো সবসময় সাদামাটা নয়। কনট্রাস্ট ব্লাউজ, পাড়ওয়ালা শাড়ি, বড় কানের দুল, চুড়ি এবং চোখে গাঢ় কাজ—সব মিলিয়ে তৈরি হতো পরিপূর্ণ সাজ।বিশেষ করে সাদা, লাল, নীল, সবুজ, হলুদ কিংবা গাঢ় গোলাপির মতো রঙের শাড়ি পর্দায় বেশ নজর কাড়ত। সঙ্গে থাকত বড় টিপ, খোঁপা বা খোলা চুল। অনেক ক্ষেত্রেই নায়িকার সাজের সঙ্গে মিলিয়ে গয়না ও ব্লাউজের নকশাও হয়ে উঠত দর্শকের আলোচনার বিষয়।
বলিউডে ‘বোল্ড’ ফ্যাশন
৮০-এর দশকের বলিউডেও পোশাকে ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ। জিনস, জ্যাকেট, স্কার্ফ, বেল্ট, বড় সানগ্লাস, উজ্জ্বল রঙের শার্ট—নায়কদের ফ্যাশনে এসব ছিল বেশ পরিচিত উপাদান। নায়িকাদের পোশাকে শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ, স্কার্ট, ওয়েস্টার্ন পোশাক ও ঝলমলে পার্টি ড্রেসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। সিনেমার গানের দৃশ্যগুলো বিশেষভাবে ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরিতে ভূমিকা রাখত। একটি জনপ্রিয় গান বা সিনেমার পোশাক মুহূর্তেই দর্শকের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারত।
নায়কদের ফ্যাশনে জিনস, জ্যাকেট আর ‘হিরো’ লুক
৮০-এর দশকের নায়ক মানেই যেন একটু আলাদা ধরনের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। শার্টের ওপর জ্যাকেট, ডেনিম, বেল্ট, সানগ্লাস কিংবা গলায় চেইন—এসব উপাদান নায়কোচিত লুককে আরও শক্তিশালী করত। শার্টের কলারও তখন ছিল বেশ বড়। অনেক সময় শার্টের কয়েকটি বোতাম খোলা রেখে পর্দায় হাজির হতেন নায়করা। সেই সঙ্গে গলায় চেইন বা হাতে ঘড়ি—সাদামাটা পোশাকেও তৈরি হতো ‘স্টার’ ইমেজ।
বাংলা সিনেমার ফ্যাশনে ছিলো নিজস্ব ধারা
বাংলাদেশে আশির দশক ছিল চলচ্চিত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইলিয়াস কাঞ্চন, জাফর ইকবাল, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, জসিমদের মতো নায়করা ছিলেন তরুণদের স্টাইল আইকন। অন্যদিকে দিতি, চম্পা, ববিতা, রোজিনা, শাবানা—নায়িকাদের সাজ-পোশাকও দর্শকের কাছে ছিল আলোচনার বিষয়। সমকালীন এক ফ্যাশন-স্মৃতিচারণে ইলিয়াস কাঞ্চন, জাফর ইকবাল, আলমগীর ও সোহেল রানাকে আশির দশকের জনপ্রিয় ফ্যাশন-অনুপ্রেরণার মুখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তখন একটি সিনেমার জনপ্রিয়তা শুধু গল্প বা গানের ওপর নির্ভর করত না; অনেক সময় নায়ক-নায়িকার একটি নির্দিষ্ট পোশাকও হয়ে উঠত দর্শকের কাছে আলাদা আকর্ষণ।
বাংলা সিনেমার ৮০-এর দশকের ফ্যাশন বলিউডের প্রভাব থেকে পুরোপুরি আলাদা ছিল না, তবে এর নিজস্ব একটা ধারা ছিল। শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের পোশাক, শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট এবং সাধারণ সাজসজ্জার সঙ্গে তারকাদের পর্দার গ্ল্যামার মিশে তৈরি হতো আলাদা একটি নান্দনিকতা।
বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও কলকাতার বাংলা সিনেমার তারকারা ছিলেন ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি ঢাকাই সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের পোশাক ও চুলের স্টাইলও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল। সিনেমার পোস্টার, ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ কিংবা ফিল্মি পত্রিকার ছবিই ছিল তখনকার ফ্যাশন অনুপ্রেরণার অন্যতম মাধ্যম।
মেকআপেও ছিল ‘স্টেটমেন্ট’
আজকের ‘নো মেকআপ’ মেকআপ কিংবা মিনিমাল লুকের তুলনায় ৮০-এর দশকের সাজ ছিল অনেক বেশি দৃশ্যমান। চোখে গাঢ় কাজ, আইলাইনার, উজ্জ্বল লিপস্টিক, ব্লাশ এবং মুখের মেকআপে স্পষ্টতা—সবই ছিল সেই সময়ের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। ভ্রু ছিল তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, চোখকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা ছিল বেশি। বড় টিপ, কপালে বিন্দি কিংবা চোখে গাঢ় কাজ পুরো সাজকে আরও নাটকীয় করে তুলত।
গয়নাতেও ছিল বাড়তি আয়োজন
ছোট ও মিনিমাল গয়নার বদলে ৮০-এর দশকে বড় কানের দুল, চুড়ি, নেকলেস ও স্টেটমেন্ট জুয়েলারির ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে সিনেমায় নায়িকাদের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বড় গয়না ব্যবহার করা হতো। আজকের ফ্যাশনেও সেই ধারার ফিরে আসা দেখা যাচ্ছে। বড় হুপ, চাঙ্কি নেকলেস, স্টেটমেন্ট কানের দুল কিংবা একসঙ্গে কয়েকটি চুড়ি—এসবকে নতুন প্রজন্ম পুরোনো দিনের অনুপ্রেরণায় নতুনভাবে গ্রহণ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন পুরোনো দিনের সিনেমা ও তারকাদের ছবি সহজেই নতুন প্রজন্মের সামনে চলে আসছে। ফলে যারা ৮০-এর দশক দেখেননি, তারাও সেই সময়ের ফ্যাশনকে নতুন চোখে আবিষ্কার করছেন। কেউ পুরোনো পারিবারিক অ্যালবামের ছবি শেয়ার করছেন, কেউ সিনেমার পোস্টার, আবার কেউ তারকাদের পুরোনো লুক নিয়ে তৈরি করছেন নতুন পোস্ট। মন্তব্যের ঘরে শুরু হচ্ছে স্মৃতিচারণ—‘আমাদের সময় এমনই ছিল’, ‘এই চুলের স্টাইলটাই তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল’, কিংবা ‘মায়ের পুরোনো শাড়িটা আবার বের করতে হবে’—এমন নানা কথায় জমে উঠছে আলোচনা।
পুরোনো ফ্যাশন, নতুন প্রজন্ম
ফেসবুকে এখন ৮০-এর দশকের ফ্যাশন নিয়ে যে মাতামাতি, সেটি কেবল পুরোনো দিনের ছবি দেখে আবেগপ্রবণ হওয়া নয়। বরং কয়েক দশক পেরিয়ে সেই সময়ের ফ্যাশন আবার নতুন প্রজন্মের কাছে নিজের জায়গা করে নেওয়ার গল্প।