লেহেঙ্গার নিচে স্নিকার! বদলে যাচ্ছে কনের জুতার ফ্যাশন

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বলি-অভিনেতা রাজকুমার রাও যখন পত্রলেখাকে হাঁটু গেড়ে আঙটি পরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন নেট দুনিয়ায় সেই মুহূর্তটি যেমন আলোচনায় এসেছিল, তেমনি পত্রলেখার সাদা আউটফিটের সঙ্গে পায়ে থাকা স্নিকারও নজর কেড়েছিল।


আবার ফ্যাশন ডিভা হিসেবে খ্যাত সোনম কাপুরের রিসিপশন পার্টিতে তার বোন রিয়া কাপুর এবং বর আনন্দ আহুজাকেও জাঁকজমক পোশাকের সাথে স্নিকারে দেখা গিয়েছিল।

দেশের দিকে তাকালেও এই ট্রেন্ড-এর উপস্থিতি চোখে পড়ে। গায়ক প্রীতম ও অভিনেত্রী শেহতাজের বিয়েতে শ্রীমঙ্গলের মনোরম পরিবেশে ঝলমলে গোলাপি লেহেঙ্গায় কনের সাজে শেহতাজের পায়েও দেখা গিয়েছিল স্নিকার। অর্থাৎ ব্রাইডাল ফ্যাশন-এ স্নিকার এখন কেবল আন্তর্জাতিক রানওয়ে বা সেলিব্রিটি ওয়েডিং-এর বিষয় নয়; আমাদের দেশেও এর উপস্থিতি আরো আগে থেকেই তৈরি হয়েছে।

একসময় বিয়ের সাজের সঙ্গে স্নিকার; এই সমীকরণটি বেশ অদ্ভুত মনে হলেও বর্তমানে এটি আর ফ্যাশন-বেমানান কোনো বিষয় নয়। বরং ব্রাইডাল ফুটওয়্যার ট্রেন্ড-এ কনের পায়ে জায়গা করে নিচ্ছে স্নিকার। হাই হিলের বদলে আরামদায়ক জুতা বেছে নেওয়ার প্রবণতা এখন শুধু কমফোর্ট এর বিষয় নয়; হয়ে উঠছে কনের নিজস্ব স্টাইল ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। ২০২৬-এ ট্রেডিশনাল হিল এর পাশাপাশি ট্রেইনার বা স্নিকার, ফ্ল্যাট এবং আরও আরামদায়ক ফুটওয়্যার -এর ট্রেন্ড চোখে পড়ার মতো এসেছে।

হিলের বদলে স্নিকার কেন?

বিয়ের দিন শুধু সুন্দর দেখালেই তো হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, মঞ্চে ওঠানামা, অতিথিদের সঙ্গে দেখা করা, ছবি তোলা, এক অনুষ্ঠান থেকে আরেক অনুষ্ঠানে যাওয়া কম ঝক্কি পোহাতে হয় না। এত কিছুর মধ্যে কয়েক ইঞ্চি উঁচু হিল পরে থাকা কনের জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে।

তাছাড়া, আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে ফ্যাশনে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসের প্রাধান্য পাচ্ছে তা হল ‘কমফোর্ট। যেটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ পাওয়া যাচ্ছে তাই ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সাজ-পোশাকের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক এবং মিনিমাল দেখার পাশাপাশি ফুটওয়্যারে লক্ষ্যণীয় এমন পছন্দ, ব্রাইডাল জগতে নিঃসন্দেহে এক নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। বরের সাথে আগে থেকেই স্নিকারের যোগসূত্র থাকলেও, কনের পায়ে এর নতুন সংযোজন দেখা যাচ্ছে।


পায়ে আরাম, হাঁটাচলায় স্বাচ্ছন্দ্যদুটিই মেলে। তাই এখন প্রশ্নটা শুধু, ‘কোন জুতা সবচেয়ে সুন্দর?’ নয়; বরং ‘কোন জুতায় সারাদিন স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা যাবে?’সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু আরাম নয়, স্টাইলও


স্নিকার বলতেই একসময় মনে হতো জিনস, টি-শার্ট কিংবা casual outfit-এর কথা। কিন্তু ফুটওয়্যার এর দুনিয়ায় সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। তবে বলে রাখা ভালো, কনের স্নিকার মানেই প্রতিদিনের সাধারণ স্পোর্টস শু নয়।

এখন ব্রাইডাল স্নিকারও পেয়েছে নিজস্ব এক ফ্যাশনধারা। সাদা বা আইভরি লেদার স্নিকারে যোগ হচ্ছে পার্ল, ক্রিস্টাল, রাইনস্টোন, স্যাটিন, রিবন কিংবা ডেলিকেট ফ্লোরাল এমবেলিশমেন্ট। ফলে দেখতে স্নিকারের মতো হলেও তাতে থাকছে ব্রাইডাল লুকের সূক্ষ্ম ছোঁয়া।

আর ২০২৬-এর ফ্যাশনে স্যাটিন নিজেই বেশ জোরালো ট্রেন্ড। রানওয়ে ও স্ট্রিট স্টাইলদুই জায়গাতেই স্যাটিন ফুটওয়্যারের উপস্থিতি বেড়েছে, যার মধ্যে স্যাটিন স্নিকারও রয়েছে। ফলে স্যাটিনের নরম, ফেমিনিন সৌন্দর্যের সঙ্গে স্নিকারের ক্যাজুয়াল কমফোর্ট মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একেবারে নতুন ব্রাইডাল লুক।

কোন সাজে কেমন স্নিকার?


ভারী লেহেঙ্গার সঙ্গে সবচেয়ে সহজে মানিয়ে যায় সাদা, আইভরি বা শ্যাম্পেন রঙের সাধারণ নকশার স্নিকার। জুতার ওপর সামান্য পার্ল, ক্রিস্টাল বা সূক্ষ্ম অলংকরণের ছোঁয়া থাকলে তা কনের পুরো সাজের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে যায়।

সাজে একটু ভিন্নতা আনতে চাইলে, বেছে নিতে পারেন মেটালিক সিলভার বা গোল্ড স্নিকার। লেহেঙ্গার এমব্রয়ডারির সঙ্গে জুতার মেটালিক শাইন মিলিয়ে নিলে পুরো সাজে যুক্ত হবে আধুনিকতা ও আভিজাত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।

শাড়ির সঙ্গেও সাধারণ নকশার স্নিকার বেশ মানিয়ে যায়। বিশেষ করে আধুনিক কায়দায় পরা শাড়ি কিংবা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে তৈরি বিয়ের সাজের সঙ্গে স্নিকার যোগ করলে লুকে আসে ভিন্নমাত্রা।

আর সাদা গাউনের সঙ্গে সাদা স্নিকার তো একেবারে এফোর্টলেস কম্বিনেশন। পশ্চিমা বিশ্বে বিয়েতে সাদা গাউনের সাথে পায়ে স্নিকার পরার চল তেমন নতুন কিছু নয়। এমন অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় রয়েছেন যারা তাদের বিশেষ দিনেও বিয়ের সাজ পোশাকের সাথে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্নিকারকেই।

অনেক কনেই বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতায় হিল পরলেও পরে রিসিপশন বা ডান্স ফ্লোরে স্নিকারে বদলে নেন। এতে সাজের সৌন্দর্য যেমন বজায় থাকে, তেমনি দীর্ঘ সময় পায়ে থাকে স্বস্তিও।

এক কথায়, বিয়ের দিনে সাজপোশাকে একটু চকচকে স্প্ল্যাশ যোগ করতে চাইলে বেছে নিতে পারেন গ্লিটারি বা পার্ল ওয়েডিং স্নিকার। ক্ল্যাসি ও ফেমিনিন লুক চাইলে লেস যুক্ত স্নিকার আর একদম ইউনিক কিছু চাইলে, তবে নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কাস্টমাইজ করেও নিতে পারেন। যেখানে নকশার বৈচিত্র্যতার পাশাপাশি নানা রঙের মিশেলও পাবেন।

বিয়ের দিন হিল, পরে স্নিকার: 

যারা একেবারে ট্রেডিশনাল ব্রাইডাল লুক থেকে বের হতে চান না, তাদের জন্য এটি হতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী সল্যুশন। বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা, স্টেজ বা ছবি তোলার সময় হিলস পরে থাকা যায়। এরপর রিসিপশন বা দীর্ঘ সময়ের অনুষ্ঠান শুরু হলে স্নিকার-এ বদলে নেওয়া যায়।

ফলে একই ব্রাইডাল লুকে পাওয়া যায় দুটি আলাদা মুড; প্রথমে এলিগেন্ট পরে ফান ও কেয়ার ফ্রি।


আরোও পড়ুন: পুরুষের স্টাইলিশলুকের জন্য ১০ সেরা রঙের কম্বিনেশন


এর আরেকটি সুবিধা হলো, বিয়ের পরেও আপনি এই স্নিকারটি ব্যবহার করতে পারবেন। একটি ভারী কারুকার্য খচিত হিলস হয়তো বিয়ের অ্যালবামে সুন্দর দেখাবে, কিন্তু এরপর সেটি আলমারিতে পড়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সেখানে একটি সুন্দর স্নিকার পরবর্তীতে জিনস, ক্যাজুয়াল ড্রেস, কুর্তি কিংবা ওয়েস্টার্ন যে কোন আউটফিটের সঙ্গেও ক্যারি করতে পারবেন। এই “ওয়্যার ইট এগেইন ভাবনাটিও ২০২৬-এর ওয়েডিং ফ্যাশন -এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।


কেনার আগে মাথায় রাখুন: 


তবে শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হবে না। বিয়ের দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরতে হবে বলে স্নিকার বাছার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

 

- ভারী স্নিকার এড়িয়ে চলুন। অনেক সময় লেহেঙ্গা বা গাউনের নিচে তা অস্বাভাবিক দেখাতে পারে।


- সাধারণ নকশার ডিজাইন বেছে নিন। এতে জুতাটি আউটফিট এর সঙ্গে মিশে থাকবে, আলাদা করে চোখে পড়বে নাযদি না সেটিই আপনার উদ্দেশ্য হয়।


- বিয়ের দিন অনেক হাঁটতে হবে। শুধু সুন্দর বলে শক্ত বা অস্বস্তিকর জুতা বেছে নেওয়া ঠিক নয়। পায়ের গোড়ালিতে যথেষ্ট সাপোর্ট দেয় কি না দেখে নিন।


- বিয়ের দিনেই নতুন স্নিকার পরে বের হওয়া উচিত নয়। কয়েক দিন আগে পরে হাঁটুন, যাতে কোথাও ঘষা লাগে কি না বোঝা যায়।


- লেহেঙ্গার লেন্থ মাথায় রাখুন। স্নিকার পরলে আপনার হাইট হিলস-এর তুলনায় কমে যেতে পারে। তাই ড্রেসের লেন্থ আগে থেকেই জুতার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।


- বিয়ের ভেন্যু ইনডোর নাকি আউটডোর, মেঝে মসৃণ নাকি ঘাস বা মাটিরএসব বিবেচনায় জুতার সোল নির্বাচন করুন।


হিলের আবেদন ব্রাইডাল ফ্যাশনে কখনোই শেষ হয়ে যাবে না। স্টিলেট্টো, স্লিংব্যাক, প্ল্যাটফর্ম কিংবা এমবেলিশড হিলসবই কনের সাজে থাকবে আপন মহিমায়।


তবে পরিবর্তনটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। ফ্যাশন কখনো স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে বদলায় সৌন্দর্যের সংজ্ঞা, বদলায় স্টাইলিশ হওয়ার ধারণাও। আর সেই পরিবর্তনেরই একটি মজার উদাহরণ হতে পারে কনের পায়ে স্নিকার। কারণ বিয়ের দিনটি শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য নয়, সারাদিন নিজের মতো করে আনন্দ করার জন্যও।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad