আনিকা জান্নাত
ভরা কোভিডের ভয়াল সময়। চারপাশে কেবল মৃত্যুর খবর, ভয়ের গুঞ্জন, নিঃশ্বাসে স্যানিটাইজারের গন্ধ। এমন দুঃসহ সময়ে আমি গর্ভবতী ছিলাম। একজন মা হওয়ার পথে হাঁটছি ঠিকই, কিন্তু সেই পথে ছিল না কোনো উল্লাস, কিংবা নিশ্চিন্ত একটা মায়ের বুক—ছিল কেবল আতঙ্ক, একাকীত্ব আর চুপচাপ কাঁটার মতো সময়।
চিকিৎসকদের মাস্কের আড়ালে মুখ দেখা যেত না, হাসপাতালের নীরবতা ভীষণ কষ্টদায়ক ছিল। অসুস্থ শরীর আর গর্ভকালীন ক্লান্তি—সব মিলিয়ে জীবনটা তখন একধরনের দমবন্ধ অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছিল।
তার মাঝেই একদিন আল্লাহর রহমতে আমার কোলে এল রওজামনি। সে এক অপার্থিব মুহূর্ত—আমি কাঁপছিলাম, ও কান্না করছিল। আমি হাসছিলাম, ও আমার বুকের গন্ধ খুঁজছিল। ওর জন্মের দিনটা যেন আমার জীবনের নতুন সূর্যোদয়।
রওজা হওয়ার এক সপ্তাহ আগে আমার ছোট বোন আসে। তারপর রওজামনি জন্মের পর ও আমাদের সঙ্গে ছিল দুই মাস দশ দিন। ওর উপস্থিতি আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছিল। ওই সময়টায় আমি রওজার সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে পেরেছিলাম—সেটাই আমার জীবনের এক অমূল্য উপহার। এজন্য আমি সারাজীবন ছোট বোনের কাছে কৃতজ্ঞ।
রওজাকে বুকের কাছে নিয়ে শুয়ে থাকতাম। আমি ওকে বই পড়ে শোনাতাম—রাজকুমারীর গল্প, বৃষ্টির গান, চাঁদের কথা। ও ঘুমিয়ে পড়লে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম নিঃশব্দে। ক্লান্ত আমি তখনও কেঁদে ফেলতাম। কেন জানি না, ওর চোখের পাপড়ি, নিঃশ্বাস, নড়াচড়া—সবকিছু এত মায়াবি লাগত যে মনে হতো, এ যেন কোনো স্বর্গীয় বন্ধন।
রওজার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। কারণ, আমার নিজের ছোটবেলার খুব বেশি স্মৃতি নেই। নেই বিশেষ মুহূর্তের কোনো ছবিও। মা-বাবার আদরে বড় হলেও প্রযুক্তির সেই অভাবী দিনে মুহূর্তগুলো ধরে রাখার উপায় ছিল না। এখনো মনে হয়—‘ইশ! আমার যদি ছোটবেলার একটা ঘুমন্ত ছবি থাকত মায়ের কোলে!’ হয়তো আজও তাকিয়ে থাকতাম, ভালোবাসতাম সেই ছবিকে।
এই না-পাওয়া থেকেই আমার এক অদম্য ইচ্ছা জন্ম নিয়েছে—রওজামনির প্রতিটি হাসি, প্রতিটি কান্না, ওর প্রথম হাঁটা, প্রথম শব্দ, এমনকি ওর চুলে সূর্যরশ্মি পড়া বিকেলটাও যেন আমি ধরে রাখতে পারি।
আমি চাই, ও যখন বড় হবে, ওকে দেখাতে পারি—‘দেখো মা, এই ছিল তোমার প্রথম ঈদ, এই ছিল প্রথম কেক কাটা, এই ছিল সেই রাত, যখন তুমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলে, আর আমি তোমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছিলাম।’
আমি ওর জন্য শুধু একজন মা নই—আমি ওর গল্পকার, চিত্রগ্রাহক, চোখের গভীর ভালোবাসা। রওজামনি শুধু আমার মেয়ে নয়, সে আমার বেঁচে থাকার মানে। আমার মা হয়ে ওঠা কষ্টের ছিল, কিন্তু রওজার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি সেই কষ্ট ভুলে যাই।
এই ছোট্ট প্রাণটাই আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা শিখিয়েছে—ভালোবাসা নিঃশর্ত হলে, ত্যাগে কষ্ট হয় না।
রওজামনি, তুমি আমার কবিতা, তুমি আমার গান,
তুমি আমার প্রতিটি শ্বাসে লেখা এক জীবনের নাম।
রওজামনি, তুমিই আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর গল্প।
ভালোবাসি, সীমাহীনভাবে।
মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহুম্মা বারিক লাহা ফি হায়াতি।
(রোদসীর ‘নারীর ডায়েরি বিভাগে আপনি লিখতে পারেন আপনার জীবনের গল্প।)