আমি খুব একা। রাত বাড়লেই আমার মনে হয়, এই ঘরটা যেন আরও ছোট হয়ে আসছে। একই বিছানা। একই ছাদ। একই সংসার। অথচ আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে যেন কয়েক হাজার মাইল দূরত্ব।আমাদের বিয়ের বয়স প্রায় আট বছর। বিয়ের প্রথম দিকে ভাবতাম, সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অভিমান কমবে, দূরত্ব কমবে। একদিন হয়তো সে নিজে থেকেই আমার দিকে ফিরে তাকাবে।
কিন্তু সেই ‘একদিন’ আর আসেনি।
এখন আমাদের মধ্যে কথা হয় শুধু প্রয়োজনের।
“খাবার টেবিলে রেখেছি।”
“ছেলের স্কুলে কাল মিটিং।”
“বিদ্যুৎ বিলটা দিয়েছ?”
এর বাইরে যেন আমাদের আর কোনো ভাষা নেই।
আমাদের মধ্যে মানসিক সম্পর্ক নেই। ভালোবাসার স্পর্শ নেই। শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও নেই। অথচ বাইরের পৃথিবীর কাছে আমরা ‘সুখী দম্পতি’। পারিবারিক অনুষ্ঠানে পাশাপাশি বসে ছবি তুলতে হয়। আত্মীয়রা হাসতে হাসতে বলে,
“তোমাদের তো বেশ চলছে!”
আমিও হাসি।
কারণ সত্যিটা বলার সাহস আমার নেই।
কাকে বলব?
মাকে বললে হয়তো বলবেন, “সংসারে এমন একটু-আধটু হয়। মেয়েদের এত কিছু ভাবলে সংসার টেকে না।”
বোনকে বললে হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, “তুমি এতদিন কাউকে বলোনি?” বন্ধুকে বলার কথা বহুবার ভেবেছি। কিন্তু কীভাবে বলব—একজন মানুষের পাশে থেকেও আমি কতটা একা?
সবচেয়ে বেশি ভয় হয় সমাজকে। মানুষ প্রশ্ন করবে—
“স্বামীর সঙ্গে সমস্যা কেন?”
“তোমারই কি কোনো দোষ আছে?”
“সংসার ভাঙার কথা ভাবছ নাকি?”
“এত বছর পর এসব বলার কী দরকার?”
এই প্রশ্নগুলোর ভয়ে আমি চুপ করে গেছি।
চুপ করতে করতে একসময় নিজের কাছেও নিজেকে অপরিচিত মনে হতে শুরু করেছে।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি জানালার পাশে বসে থাকি। পাশের ঘর থেকে স্বামীর নাক ডাকার শব্দ আসে। অথচ আমার বুকের ভেতর জমে থাকে এমন এক নীরবতা, যার কোনো শব্দ নেই। এক রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, “আমি কি সত্যিই সংসার করছি, নাকি শুধু একটা সম্পর্কের অভিনয় করে যাচ্ছি?”
চোখ দিয়ে পানি নেমে এল। সেদিন প্রথমবার বুঝলাম—একাকিত্ব মানে সবসময় একা ঘরে থাকা নয়।কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ংকর একাকিত্ব হলো, প্রিয় একজন মানুষের পাশে থেকেও নিজেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য মনে হওয়া।
আমি জানি না, এই অনুভূতির নাম কী। জানি না, আমার মতো আর কত নারী প্রতিদিন একই বিছানায় ঘুমিয়ে থেকেও ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যাচ্ছেন।
আমি শুধু জানি, আমার ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে কিছু একটা নিভে যাচ্ছে। একদিন অনেক সাহস করে আমার পুরোনো বান্ধবী মিতাকে ফোন করলাম।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর শুধু বললাম, “মিতা, আমি খুব একা।”
ওপাশ থেকে কোনো বিচার এল না।
মিতা শুধু বলল,
“তুই কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাস?”
এই একটি প্রশ্নেই আমার বুকটা হালকা হয়ে গেল।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
“হ্যাঁ।”
সেদিন অনেক বছর পর আমি নিজের কথা বলেছিলাম।
বুঝেছিলাম, সব সমস্যার সমাধান হয়তো একদিনে হয় না। কিন্তু নিজের কষ্টটাকে স্বীকার করা, বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে কথা বলা—সেখান থেকেই হয়তো বদলের শুরু হতে পারে।
যদি আপনিও এমন কোনো সম্পর্কের মধ্যে থেকে নিজেকে খুব একা মনে করেন, তাহলে চুপ করে সবকিছু সহ্য করে যাবেন না। প্রথমে নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষকে বিষয়টি জানান। প্রয়োজন হলে কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নিন। আর সম্পর্কে অবহেলা, অপমান, নিয়ন্ত্রণ বা নির্যাতন থাকলে নিজের নিরাপত্তাকে সবার আগে রাখুন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
(এই লেখাটি পড়ে আপনার মনে হলে, এমন পরিস্থিতিতে থাকা একজন মানুষকে কী ছোট্ট পরামর্শ দেওয়া যায়, কমেন্টে জানাতে পারেন। আপনার একটি সহানুভূতিশীল কথা হয়তো কারও জন্য অনেক বড় সাহস হয়ে উঠতে পারে। আপনার গল্পও লিখতে পারেন রোদসীর নারীর ডায়েরিতে।)