মৃত্যুর আগে মানুষ সবচেয়ে বেশি কী নিয়ে আফসোস করে?

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ যদি নিজের পুরো জীবন ফিরে দেখেন, তখন কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?


আরও টাকা আয় করা যেত? আরও বড় বাড়ি করা যেত? আরও পরিচিত হওয়া যেত? কর্মজীবনে আরও ওপরে ওঠা যেত?


অদ্ভুতভাবে, জীবনের শেষ সময় নিয়ে আলোচনায় বারবার সামনে আসে অন্য কিছু—নিজের মতো করে না বাঁচা, প্রিয় মানুষকে সময় না দেওয়া, অনুভূতি প্রকাশ না করা, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক এবং সুখকে বারবার ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া।


মৃত্যুর আগে মানুষের আফসোসের কোনো একক, সর্বজনীন তালিকা নেই। মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, বয়স, সম্পর্ক ও পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে জীবনসায়াহ্নে মানুষের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুখ নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা যে জীবন নিয়ে এত ব্যস্ত, সেই জীবনটা কি সত্যিই বাঁচছি?


নিজের জীবনটা নিজের মতো করে না বাঁচা


অস্ট্রেলীয় প্যালিয়েটিভ কেয়ারকর্মী ব্রনি ওয়্যার জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু সাধারণ আফসোসের কথা লিখেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে বেশি ফিরে এসেছে—অন্যের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবন কাটাতে গিয়ে নিজের চাওয়া জীবনটি না বাঁচতে পারার আক্ষেপ।


এটি কোনো বড় বৈজ্ঞানিক জরিপের ফল নয়; বরং তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা একটি পর্যবেক্ষণ। তবু কথাটি এত মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠার কারণ সম্ভবত আমাদের নিজেদের জীবনেও এর প্রতিফলন আছে।


ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে আসি—কী পড়তে হবে, কোন পেশা ভালো, কখন বিয়ে করা উচিত, কেমন পরিবার হওয়া উচিত, সমাজ কী বলবে।


এই প্রত্যাশার ভেতরে নিজের ইচ্ছার জায়গাটি কখনো কখনো এতটাই ছোট হয়ে যায় যে একসময় মানুষ নিজেই জানে না—সে আসলে কী চেয়েছিল।


বিশেষ করে একজন নারীর জীবনে এই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। মেয়ে, স্ত্রী, মা, পুত্রবধূ কিংবা কর্মজীবী—অসংখ্য ভূমিকার দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের স্বপ্নটি কোথায় রেখে এসেছেন, সেই প্রশ্ন করার সুযোগই হয়তো অনেকের হয় না।


দায়িত্ব পালন আর নিজের জীবন বাঁচা পরস্পরের বিপরীত নয়। প্রশ্ন হলো, দায়িত্বের ভেতরে নিজের অস্তিত্বটুকুও ছিল কি না।


এত কাজ করলাম, কিন্তু সময়টা গেল কোথায়?


কাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেয়, আত্মমর্যাদা গড়ে তোলে, পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু কাজই যখন পুরো জীবন দখল করে নেয়, তখন বিনিময়ে কী হারাচ্ছি, সেটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন।


ব্রনি ওয়্যারের পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত কাজ করে জীবন কাটানোর আফসোসও উঠে এসেছে


তবে বাস্তবতা সহজ নয়। বাংলাদেশের বহু মানুষের জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করা পছন্দের চেয়ে প্রয়োজনের বিষয়। সংসার চালানো, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, ঋণ কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—সবকিছুর জন্যই আয় প্রয়োজন।


তাই শুধু ‘কম কাজ করুন’ বলাটা সবার জন্য বাস্তবসম্মত পরামর্শ নয়


বরং প্রশ্ন হতে পারে—কাজের প্রয়োজনীয়তার মধ্যেও যাদের জন্য এত কাজ করছি, তাদের সঙ্গে আমি সত্যিই আছি তো?


সন্তানের বেড়ে ওঠা, মা-বাবার বয়স বাড়া, বন্ধুর সঙ্গে এক কাপ চা কিংবা পরিবারের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা—এসব মুহূর্ত জমিয়ে রেখে পরে উপভোগ করার সুযোগ নেই।


কারণ টাকা সঞ্চয় করা যায়, সময় নয়


অনুভূতির কথা না বলা


‘তোমাকে ভালোবাসি।’


‘তোমার কথায় আমি কষ্ট পেয়েছিলাম।’


‘আমি তোমাকে মিস করি।’


‘আমার সাহায্য দরকার।’


খুব সাধারণ কয়েকটি বাক্য। অথচ অনেক সময় এগুলোই বলা সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।


সম্পর্ক রক্ষার নামে আমরা অনেক কথা চেপে যাই। কখনো অহংকারে, কখনো প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে, আবার কখনো ভাবি—সে তো বুঝেই।


কিন্তু মানুষ সবসময় বুঝতে পারে না।


জীবনের শেষদিকে হয়তো আফসোস থাকে কথাটি বলা হয়নি বলে নয়; বরং বলার সুযোগটি আর নেই বলে।


অনুভূতি প্রকাশ মানে প্রতিটি আবেগের তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং প্রয়োজনীয় কথাটি সময় থাকতে সম্মান ও সততার সঙ্গে বলা।


বন্ধুদের হারিয়ে ফেলা


একসময় যাদের ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করা যেত না, কয়েক বছর পর তাদের সঙ্গে হয়তো বছরে একবারও কথা হয় না।


কেউ অন্য শহরে চলে গেছে। কেউ সংসারে ব্যস্ত। কেউ কর্মজীবনে।


তারপর একদিন মনে হয়—অনেক দিন কথা হয়নি।


কিন্তু ফোনটি আর করা হয় না।


দীর্ঘমেয়াদি মানবজীবন নিয়ে হার্ভার্ডের একটি বিখ্যাত গবেষণা এই জায়গাটিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেয়। কয়েক দশক ধরে মানুষের জীবন অনুসরণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ভালো ও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক মানুষের সুখ ও সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।


অর্থ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পেশাগত সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু মানুষের ভালো থাকার গল্পে সম্পর্কের ভূমিকা অসাধারণ।


তাই বন্ধুত্বকে শুধু অবসরের বিনোদন ভাবার সুযোগ নেই। সম্পর্কও যত্ন চায়।


সুখকে সবসময় আগামীকালের জন্য রেখে দেওয়া।


‘এই কাজটা শেষ হলে একটু নিজের মতো থাকব।’


‘বাচ্চারা বড় হলে ঘুরব।’


‘ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেলে সময় পাব।’


‘অবসর নিলে জীবনটা উপভোগ করব।’


আমরা প্রায়ই সুখের সঙ্গে একটি শর্ত জুড়ে দিই।


সমস্যা হলো, একটি শর্ত পূরণ হলে আরেকটি এসে দাঁড়ায়।


জীবনের বড় লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাও জরুরি। কিন্তু বর্তমানকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে ভবিষ্যতে সুখী হওয়ার পরিকল্পনা করলে সেই ভবিষ্যৎ আসতে আসতে জীবনের বড় একটি অংশ পেরিয়ে যেতে পারে।


সুখ মানে প্রতিদিন আনন্দে থাকা নয়। মানুষের জীবনে দুঃখ, চাপ, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা থাকবেই।


বরং সুখের জায়গা হতে পারে খুব সাধারণ—প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, বিকেলের আলো উপভোগ করা, নিজের পছন্দের কাজ করা, পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া, পুরোনো বন্ধুকে ফোন করা কিংবা কিছুক্ষণ নির্ভার হয়ে থাকা।


সম্পর্কের মূল্য আমরা কি দেরিতে বুঝি?


হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট ১৯৩৮ সালে শুরু হয়েছিল। কয়েক প্রজন্ম ধরে চলা এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—ভালো সম্পর্ক শুধু মানসিক আনন্দের বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার সঙ্গেও এর শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।


জীবনের শেষ সময়ের আফসোস নিয়ে প্রচলিত পর্যবেক্ষণ আর দীর্ঘমেয়াদি সুখের গবেষণা যেন একটি জায়গায় এসে মিলিত হয়—মানুষের জীবনের মূল্য শুধু সে কী অর্জন করেছে, তা দিয়ে মাপা যায় না; কাদের সঙ্গে এবং কীভাবে জীবনটি কাটিয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


তাহলে আজই কী বদলানো যায়?


মৃত্যুর কথা মনে করে বিষণ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্নটি জীবনের জন্য ব্যবহার করা যায়।


আজ যদি নিজের জীবনটাকে একটু দূর থেকে দেখেন, তাহলে কাকে ফোন করতে ইচ্ছে করবে? কোন কথাটি অনেক দিন ধরে বলা হয়নি? কোন স্বপ্নটি শুধু মানুষের কথার ভয়ে সরিয়ে রেখেছেন? কোন সম্পর্কটি যত্ন চাইছে? আর নিজের জন্য শেষ কবে একটু সময় রেখেছিলেন?


সবকিছু একদিনে বদলাতে হবে না।


হয়তো আজ একটি ফোন করা যায়।


একটি ‘ধন্যবাদ’ বলা যায়।


একটি ‘দুঃখিত’ বলা যায়।


কিংবা বহুদিন পর নিজেকেই প্রশ্ন করা যায়—আমি যে জীবন কাটাচ্ছি, এটি কি আমার চাওয়া জীবন?


শেষ পর্যন্ত মানুষ কী সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়?


জীবনের শেষ মুহূর্তে কে কী ভাববেন, তার উত্তর আমরা আগে থেকে জানি না। তাই ‘সব মানুষ মৃত্যুর আগে একই পাঁচটি বিষয়ে আফসোস করেন’—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।


তবে জীবনসায়াহ্নের মানুষের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুখের গবেষণা অন্তত একটি শিক্ষা দেয়—সম্পর্ক, সময়, নিজের মূল্যবোধ এবং অর্থপূর্ণ জীবনকে অবহেলা করার মূল্য অনেক সময় খুব দেরিতে বোঝা যায়।


জীবনের দৈর্ঘ্য সবসময় আমাদের হাতে থাকে না


কিন্তু যতটুকু জীবন আমাদের হাতে আছে, তার মধ্যে কাকে সময় দেব, কোন সম্পর্কের যত্ন নেব, কোন কথাটি বলব এবং কতটা নিজের মূল্যবোধ অনুযায়ী বাঁচব—সেই সিদ্ধান্তের একটি বড় অংশ আজও আমাদের হাতেই।


পরিশেষে,  জীবনের শেষে যেন বলতে না হয়—‘ইশ, যদি আরেকটু নিজের মতো করে বাঁচতাম।’


সময় থাকতে মানুষকে ভালোবাসুন। প্রয়োজনীয় কথাটি বলে ফেলুন। সম্পর্কের যত্ন নিন। আর নিজের জীবনেও নিজের জন্য একটি জায়গা রাখুন।


কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু কত দূর এগিয়েছেন, তা নয়; বরং কতটা অর্থপূর্ণভাবে বেঁচেছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।

sidebar ad