সোফি জারমেইন: যে নারী গণিতজ্ঞ নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কখনো কখনো মানুষের সামনে পথ থাকে না—তাকে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। আর সেই পথ যদি হয় এমন এক জগতে, যেখানে আপনার লিঙ্গ, সমাজ আর প্রচলিত ধারণা বারবার বলে দেয়, “এটা তোমার জন্য নয়”, তাহলে সেখানে এগিয়ে যাওয়া শুধু প্রতিভার পরীক্ষা নয়; সাহসেরও পরীক্ষা।


অষ্টাদশ শতকের শেষভাগের প্যারিসে এক তরুণী ঠিক এমনই এক অসম্ভব পথ বেছে নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা তার জন্য খোলা ছিল না। গণিত পড়ার উৎসাহ দেওয়ার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষকও ছিল না। নিজের পরিচয় প্রকাশ করে গণিতজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করাও ছিল কঠিন।


তবু তিনি থামেননি।


রাতের নীরবতায়, পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে, নিজে নিজে বই পড়ে, প্রয়োজনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে, চিঠির মাধ্যমে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের সঙ্গে বিতর্ক করে তিনি ধীরে ধীরে নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন গণিতের জগতে।


এই নারীর নাম সোফি জারমেইন।


আজ তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংখ্যা তত্ত্ব, ফার্মার শেষ উপপাদ্য এবং স্থিতিস্থাপকতার মতো গণিতের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু তাঁর গল্প শুধু গণিতের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি সুযোগের অপেক্ষা না করে নিজের সুযোগ নিজেই তৈরি করেছিলেন।


যে বাড়িতে বইয়েরা কথা বলত


সোফি জারমেইনের জন্ম ১৭৭৬ সালে প্যারিসে। তাঁর পরিবার ছিল সচ্ছল। তাঁর বাবা অ্যামব্রোয়াজ-ফ্রাঁসোয়া জারমেইন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।


শৈশবে সোফি বাবার বাড়িতে চলা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনাগুলো মন দিয়ে শুনতেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠেছিল বাড়ির লাইব্রেরি।


তেরো বছর বয়সে, ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে প্যারিস ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে। বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় সোফি অনেক সময় বাড়িতেই থাকতেন। আর সেই নিঃসঙ্গ সময়েই তিনি বইয়ের জগতে আরও গভীরভাবে ডুবে যান।


লাইব্রেরিতে গণিতের ইতিহাস পড়তে গিয়ে তিনি আর্কিমিডিসের গল্প জানতে পারেন। সিরাকিউস আক্রমণের সময়ও আর্কিমিডিস নাকি তাঁর জ্যামিতিক সমস্যায় এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে নিজের দিকে এগিয়ে আসা সৈন্যদের উপস্থিতিও খেয়াল করেননি।


ঘটনাটি সোফিকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।


একজন মানুষ কীভাবে এমন এক চিন্তার জগতে প্রবেশ করতে পারেন, যেখানে বাইরের পৃথিবীর ভয়, যুদ্ধ কিংবা বিপদও কিছুক্ষণের জন্য তুচ্ছ হয়ে যায়?


সোফি সেই জগতের সন্ধান পেয়েছিলেন গণিতে।


আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর আজীবনের যাত্রা।


লুকিয়ে রাখা একটা স্বপ্ন


কিন্তু গণিতের প্রতি এই ভালোবাসা সহজে গ্রহণ করেনি তাঁর পরিবার।


সেই সময়ে মেয়েদের জন্য গণিত বা বিজ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করা সামাজিকভাবে স্বাভাবিক ছিল না। সোফির বাবা-মাও প্রথমে তাঁর এই আগ্রহকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেন।


কিন্তু সোফি জেদ ধরে পড়তে থাকেন।


রাতে তাঁকে পড়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁর ঘর থেকে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল—এমনকি মোমবাতিও সরিয়ে নেওয়া হয়। তবু তিনি থামেননি।


ঠাণ্ডা ঘরে, অল্প আলোয়, নিজের মতো করে তিনি গণিতের বই পড়ে যেতে থাকেন।


শেষ পর্যন্ত পরিবার বুঝতে বাধ্য হয়—এটি কোনো সাময়িক শখ নয়। গণিতের প্রতি সোফির আকর্ষণ তাঁর ব্যক্তিত্বেরই অংশ হয়ে গেছে।


তিনি শুধু বই পড়েই থামেননি। গণিতের মূল কাজগুলো পড়ার জন্য লাতিন ও গ্রিক ভাষাও শিখেছিলেন।


অর্থাৎ যেখানে অন্যরা বলেছিল, “তুমি পারবে না,” সোফি সেখানে একে একে নতুন দরজা খুলেছিলেন।


মঁসিয়ে ল্য ব্ল্যাঁ নামের আড়ালে


সোফির সময়ে নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা প্রায় বন্ধ ছিল। প্যারিসের École Polytechnique-এও তিনি ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হতে পারেননি।


কিন্তু তিনি সেখানকার শিক্ষার্থীদের লেকচার নোট সংগ্রহ করতেন এবং নিজের মতো করে সেগুলো পড়তেন।


তারপর শুরু হয় আরও সাহসী এক অধ্যায়।


তিনি নিজের সমাধান ও গাণিতিক চিন্তাভাবনা একজন শিক্ষকের কাছে পাঠাতে শুরু করেন “মঁসিয়ে ল্য ব্ল্যাঁ” নাম ব্যবহার করে।


এই ছদ্মনামটি তাঁকে পুরুষ হিসেবে পরিচিত করেছিল। তাঁর কাজ দেখে গণিতজ্ঞ জোসেফ-লুই লাগ্রাঁজ এতটাই মুগ্ধ হন যে তিনি এই অসাধারণ “ছাত্রের” সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।


পরে যখন জানা গেল, ল্য ব্ল্যাঁ আসলে সোফি জারমেইন, তখন লাগ্রাঁজ বিস্মিত হলেও তাঁর প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেন এবং তাঁর পরামর্শদাতাদের একজন হয়ে ওঠেন।


এটাই ছিল সোফির জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।


কারণ এতদিন তিনি গণিতের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।


এবার তিনি দরজার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন—নিজের তৈরি পথ দিয়ে।


গাউস, ল্যজঁদ্র এবং চিঠির বিশ্ববিদ্যালয়


সোফি এরপর চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করেন তৎকালীন ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ কার্ল ফ্রিডরিখ গাউসের সঙ্গে।


প্রথমদিকে তিনিও “মঁসিয়ে ল্য ব্ল্যাঁ” নাম ব্যবহার করেছিলেন।


গাউস তাঁর পরিচয় জানতে পারার পরও সোফির প্রতিভার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। এমনকি পরে গটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৮৩১ সালে সোফির মৃত্যুর কারণে তিনি সেই সম্মান গ্রহণ করতে পারেননি।


অন্যদিকে, সোফির দীর্ঘ যোগাযোগ ছিল আরেক বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ আদ্রিয়ঁ-মারি ল্যজঁদ্রের সঙ্গেও।


এই চিঠিগুলোই যেন ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়।


সেখানে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষ ছিল না, কোনো আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু ছিল প্রশ্ন, যুক্তি, ভুল, সংশোধন এবং নতুন ধারণা।


আর ছিল শেখার অদম্য ইচ্ছা।


সংখ্যা তত্ত্বে এক অসাধারণ পদচিহ্ন


গণিতে সোফি জারমেইনের সবচেয়ে পরিচিত অবদান সংখ্যা তত্ত্বে।


বিশেষ করে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে ফার্মার শেষ উপপাদ্যের সঙ্গে।


এই উপপাদ্য বলে, ২-এর চেয়ে বড় কোনো পূর্ণসংখ্যা (n)-এর জন্য


xⁿ + yⁿ = zⁿ


সমীকরণের কোনো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা সমাধান নেই।


শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি গণিতের অন্যতম বিখ্যাত অমীমাংসিত সমস্যা ছিল।


সোফি এই সমস্যাকে সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেননি। কিন্তু তিনি এমন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছিলেন, যা পরবর্তী গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে।


তিনি একটি বিশেষ ধরনের মৌলিক সংখ্যা এবং একটি সহায়ক মৌলিক সংখ্যার সম্পর্ক ব্যবহার করে ফার্মার উপপাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করেন। তাঁর কাজ থেকে পরবর্তীকালে যে সংখ্যাগুলোর পরিচিতি তৈরি হয়, সেগুলোই আজ Sophie Germain primes নামে পরিচিত—যেমন ১১, কারণ (2\times11+1=23), এবং ২৩-ও মৌলিক।


আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাম্প্রতিক গবেষণায় তাঁর পুরোনো পাণ্ডুলিপি ও চিঠিপত্র নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফার্মার শেষ উপপাদ্য নিয়ে তাঁর চিন্তা আগে যতটা মনে করা হতো, তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর ছিল। তিনি সমস্যাটির একটি বিস্তৃত সমাধান পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন এবং বেশ কিছু উন্নত ধারণা নিয়ে কাজ করেছিলেন।


অর্থাৎ সোফির অবদান শুধু একটি “Sophie Germain prime” সংজ্ঞা দিয়ে শেষ হয় না।


তিনি ছিলেন সেইসব গণিতবিদদের একজন, যাঁরা ফার্মার শেষ উপপাদ্যের দীর্ঘ সমাধান-যাত্রায় প্রথম বড় অগ্রগতিগুলোর একটি এনে দিয়েছিলেন।


অবশেষে ১৯৯৪ সালে অ্যান্ড্রু ওয়াইলস উপপাদ্যটির পূর্ণ প্রমাণ সম্পন্ন করেন। কিন্তু সেই চূড়ান্ত সাফল্যের বহু আগে সোফি জারমেইন সমস্যাটির অন্ধকার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলো জ্বেলে দিয়েছিলেন।


শুধু সংখ্যা নয়—স্থিতিস্থাপকতারও গবেষক


সোফির প্রতিভা শুধু সংখ্যা তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না।


তিনি স্থিতিস্থাপকতা বা elasticity theory নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। বিশেষ করে কম্পনশীল ধাতব পাতের গাণিতিক ব্যাখ্যা নিয়ে তিনি কাজ করেছিলেন।


এই গবেষণার জন্য ১৮১৬ সালে তিনি প্যারিসের Académie des Sciences-এর গণিতবিষয়ক পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন এই ধরনের সম্মান পাওয়া প্রথম নারী।


তবে এখানেও বাধা পুরোপুরি শেষ হয়নি। পুরস্কার পাওয়ার পরও একাডেমির কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণের ওপর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ছিল।


অর্থাৎ পুরস্কার পাওয়া ছিল একটি বিজয়, কিন্তু সমতার দরজা তখনও পুরোপুরি খোলেনি।


শেষ অধ্যায়


১৮২৯ সালে সোফি জারমেইনের স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ চালিয়ে যান।


১৮৩১ সালের ২৭ জুন, প্যারিসে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।


মৃত্যুর আগে গটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেই সম্মান গ্রহণ করার সুযোগ তাঁর হয়নি।


তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর কাজ ধীরে ধীরে নতুন করে মূল্যায়িত হতে থাকে।


আজ তাঁর নামে প্যারিসে রাস্তা ও বিদ্যালয় রয়েছে। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে Sophie Germain Prize-ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ২০০৩ সাল থেকে ফরাসি গণিত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রদান করা হচ্ছে।


যে নারী নিজের দরজা নিজেই খুলেছিলেন


সোফি জারমেইনের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো তাঁর কোনো উপপাদ্য নয়।


শিক্ষা হলো—সব দরজা আপনার জন্য খোলা থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।


কখনো প্রতিষ্ঠান আপনাকে সুযোগ দেবে না।


কখনো সমাজ বলবে, এই বিষয়টি আপনার জন্য নয়।


কখনো আপনার পরিচয় আপনার প্রতিভার আগে বিচার করা হবে।


কখনো আপনার কাজের স্বীকৃতি পেতে আপনার সময়ের চেয়েও বেশি সময় লাগবে।


কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আপনাকে থেমে যেতে হবে।


সোফি জারমেইনের হাতে কোনো আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ ছিল না। ছিল না গবেষণাগারের নিশ্চয়তা, ছিল না সামাজিক স্বীকৃতির সহজ রাস্তা।


ছিল একটি বই।


ছিল কৌতূহল।


ছিল প্রশ্ন করার সাহস।


আর ছিল না-থামার এক অদ্ভুত ক্ষমতা।


তিনি অপেক্ষা করেননি কেউ এসে তাঁকে গণিতের জগতে জায়গা করে দেবে।


তিনি নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করেছিলেন


তাই সোফি জারমেইনের গল্প আমাদের শুধু গণিত শেখায় না। এটি শেখায়—প্রতিভার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা কখনো কখনো কঠিন কোনো সমস্যা নয়; বরং সেই বিশ্বাস, “আমি পারব না।” আর সেই বিশ্বাসকে যদি ভেঙে ফেলা যায়, তাহলে বন্ধ দরজার মধ্যেও একটি পথ তৈরি হয়।


সোফি জারমেইন সেই পথ তৈরি করেছিলেন। নিজের জন্য।এবং তাঁর তৈরি সেই পথ দিয়ে আজও অসংখ্য নারী বিজ্ঞান ও গণিতের জগতে এগিয়ে চলেছেন।


সূত্র: ইউনেস্কো

sidebar ad