ডা. এলসি ইংলিস: ‘বাড়ি গিয়ে বসে থাকুন’— এ কথা শোনেননি যে নারী

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডা. এলসি ইংলিস। ছবি: সংগৃহীত
ডা. এলসি ইংলিস। ছবি: সংগৃহীত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন শুরু হয়েছে। চারদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি। আহত সৈনিকের সংখ্যা বাড়ছে, প্রয়োজন চিকিৎসক ও হাসপাতালের। এমন সময়ে একজন নারী চিকিৎসক যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল—নারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের কাছাকাছি হাসপাতাল গড়ে তুলবেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো না। বরং তাঁকে বলা হয়েছিল, “My good lady, go home and sit still”—বাড়ি গিয়ে চুপচাপ বসে থাকুন।


তিনি কি সত্যিই বাড়ি ফিরে বসে ছিলেন?


না। সেই প্রত্যাখ্যানই যেন তাঁকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল। নিজের উদ্যোগে নারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করে তিনি তৈরি করলেন Scottish Women’s Hospitals for Foreign Service। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে যা পরে নারী চিকিৎসাসেবার এক অনন্য অধ্যায় হয়ে ওঠে।


১৮৬৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের হিমালয় অঞ্চলে জন্ম এলসি ইংলিসের। অল্প বয়সেই পরিবারের সঙ্গে স্কটল্যান্ডে চলে আসেন। এমন এক সময়ে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে শুরু করেন, যখন নারীদের জন্য চিকিৎসাশিক্ষার দরজা পুরুষদের মতো সহজে খোলা ছিল না। তিনি এডিনবার্গ ও গ্লাসগোতে চিকিৎসাশিক্ষা নেন এবং ১৮৯২ সালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন।


নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। বিশেষ করে দরিদ্র নারী ও মায়েদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে তিনি কাজ করেন। এডিনবার্গে তিনি ‘দ্য হসপিস’ নামে একটি মাতৃসদনও প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে নারীদের জন্য চিকিৎসা ও প্রসূতিসেবা দেওয়া হতো। অনেক দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার খরচও তিনি মওকুফ করতেন।


চিকিৎসার পাশাপাশি নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ইংলিস। নারীদের ভোটাধিকার ও সামাজিক-রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পক্ষে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ফলে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় একজন নারী অধিকারকর্মীর পরিচয়ও।


যুদ্ধ শুরু, সামনে নতুন প্রশ্ন


১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইংলিস দ্রুত বুঝতে পারেন—যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিপুলসংখ্যক আহত ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। নারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও এই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।


তিনি ব্রিটিশ War Office-এর কাছে নারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে একটি চিকিৎসা ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ব্রিটিশ সামরিক কর্তৃপক্ষ তখনও মনে করত, যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসাসেবায় নারীদের ভূমিকা সীমিত থাকা উচিত।


ইংলিস অবশ্য সেই ‘না’ মেনে নেননি


তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে ব্রিটেনের মিত্র দেশগুলোর কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান। ফ্রান্স ও সার্বিয়া তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে। নারী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের নিয়ে গড়ে ওঠে Scottish Women’s Hospitals for Foreign Service।


যুদ্ধের ময়দানে নারীদের হাসপাতাল


১৯১৪ সালের শেষ দিকে ফ্রান্সের Royaumont Abbey-তে প্রায় ২০০ শয্যার একটি হাসপাতাল চালু হয়। হাসপাতালটি মূলত নারীদের দ্বারা পরিচালিত ও কর্মরত ছিল। যুদ্ধের পশ্চিম ফ্রন্টে এটি আহত ফরাসি সৈনিকদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


এটি ছিল কেবল শুরু


যুদ্ধের বছরগুলোতে Scottish Women’s Hospitals-এর মোট ১৪টি চিকিৎসা ইউনিট ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সার্বিয়া, গ্রিস, মেসিডোনিয়া, মাল্টা, কর্সিকা, রাশিয়া ও রোমানিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করে। চিকিৎসক, নার্স, চালক, প্রশাসনিক কর্মী—বিভিন্ন দায়িত্বে প্রায় ১,৫০০ নারী এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছিলেন বলে রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস অব এডিনবার্গের সংরক্ষণাগারের তথ্য জানায়।


তাঁদের কাজ শুধু হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধের কাছাকাছি এলাকায় তাঁরা আহত সৈনিক, বেসামরিক মানুষ ও যুদ্ধবন্দীদের চিকিৎসা করেছেন। কখনো তাঁরা এমন জায়গায় কাজ করেছেন যেখানে বোমাবর্ষণের আশঙ্কা, রোগের প্রাদুর্ভাব, খাদ্য ও জ্বালানির সংকট—সবই ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা।


সার্বিয়ায় মৃত্যুর মুখোমুখি


এলসি ইংলিস নিজেও যুদ্ধক্ষেত্রে যান। সার্বিয়ায় তাঁর কাজ ছিল সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯১৫ সালে সার্বিয়ায় যুদ্ধ ও রোগের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা হাসপাতাল চালিয়ে যান। টাইফাসের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। খাবার ও জ্বালানির সংকটও ছিল তীব্র। তবু তাঁরা রোগীদের ফেলে চলে যাননি।


পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সার্বিয়ায় কর্মরত Scottish Women’s Hospitals-এর একটি দলের সদস্যরা শত্রুপক্ষের হাতে বন্দী হন। ইংলিসও বন্দী হন এবং পরে ১৯১৬ সালে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু বন্দিত্ব বা যুদ্ধের ভয় তাঁকে থামাতে পারেনি।


দেশে ফিরে তিনি আবার অর্থ সংগ্রহ ও নতুন চিকিৎসা মিশন সংগঠনের কাজে নেমে পড়েন। এবার গন্তব্য রাশিয়া।


শেষ পর্যন্ত রাশিয়াতেও


১৯১৬ সালে Scottish Women’s Hospitals-এর একটি দল রাশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। ইংলিস নিজেও সেখানে যান এবং আহত সার্বিয়ান ও রুশ সৈনিকদের চিকিৎসায় কাজ করেন। যুদ্ধের কঠিন পরিবেশ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং শারীরিক অসুস্থতা তাঁর শরীরকে ভেঙে দিচ্ছিল।


এরই মধ্যে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সময়ও বিষয়টি তিনি অনেকের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন বলে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনীতে উল্লেখ আছে। ১৯১৭ সালে রাশিয়া থেকে ফেরার পথে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায়। যুক্তরাজ্যে ফেরার পরদিন, ২৬ নভেম্বর ১৯১৭ সালে ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।


যুদ্ধ তাঁকে সম্মানও দিয়েছে


যে ব্রিটিশ সামরিক কর্তৃপক্ষ একসময় নারী চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় মনে করেনি, যুদ্ধের অন্য প্রান্তে সার্বিয়া তাঁদের কাজের মূল্য বুঝেছিল।


১৯১৬ সালে এলসি ইংলিসকে Order of the White Eagle সম্মানে ভূষিত করে সার্বিয়া। তিনি ছিলেন এই সম্মান পাওয়া প্রথম নারী।


তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নারী হাসপাতালগুলো যুদ্ধের সময় হাজারো মানুষের চিকিৎসা করেছে। তাঁদের কাজ প্রমাণ করেছিল—চিকিৎসা, সার্জারি, হাসপাতাল পরিচালনা কিংবা যুদ্ধকালীন জরুরি সেবার মতো কঠিন দায়িত্ব পালনে নারীরা সক্ষম।


তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও এখানে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নারী চিকিৎসকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও, গবেষণায় দেখা যায় যে যুদ্ধ শেষে নারী চিকিৎসকদের সামগ্রিক পেশাগত অবস্থানে সেই অগ্রগতির প্রভাব প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত ছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের সময়ে নারীরা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করলেও সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা পুরোপুরি ভাঙেনি।


‘বাড়ি গিয়ে বসে থাকুন’ থেকে ইতিহাসের পাতায়


এলসি ইংলিসের গল্প আসলে কেবল একজন নারী চিকিৎসকের গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন নারীর সক্ষমতা নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ।


তাঁকে বলা হয়েছিল—বসে থাকতে। তিনি যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল—নারীরা যুদ্ধের চিকিৎসাসেবার জন্য উপযুক্ত নন। তিনি নারী চিকিৎসকদের একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।


তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—কোনো দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলে সবসময় সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না; কখনো কখনো নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়।


এলসি ইংলিস সেই পথ তৈরি করেছিলেন চিকিৎসা, সাহস ও মানবিকতার মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছে যুদ্ধ মানে শুধু সৈনিকের জীবন বাঁচানো নয়; একজন অসুস্থ মানুষ, একজন আহত মানুষ, একজন বিপন্ন মানুষ—তার পাশে দাঁড়ানো।


১৯১৭ সালে তাঁর জীবন থেমে যায়। কিন্তু তাঁর তৈরি Scottish Women’s Hospitals-এর ইতিহাস থেমে থাকেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাসে তাঁর নাম থেকে গেছে একজন চিকিৎসক হিসেবে, আর নারী ইতিহাসে—‘বাড়ি গিয়ে বসে থাকুন’ কথাটিকে অগ্রাহ্য করে সামনে এগিয়ে যাওয়া এক সাহসী নারী হিসেবে।

sidebar ad