মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ভুল পাত্রে খাবার গরম করে বিপদ ডেকে আনছেন না তো?

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ব্যস্ত জীবনে খাবার গরম করার সহজ উপায় হিসেবে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ব্যবহার বাড়ছে। ফ্রিজে রাখা আগের দিনের খাবার হোক কিংবা অফিসে নিয়ে যাওয়া দুপুরের খাবার—কয়েক মিনিটেই গরম করে নেওয়া যায়। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন, নিয়মিত ওভেনে খাবার গরম করে খেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় কি না? এতে কি খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়, কিংবা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে?


বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নিয়মে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহার করে খাবার গরম করলে সাধারণত স্বাস্থ্যের জন্য বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি হয় না। মাইক্রোওয়েভের বিকিরণ খাবারকে তেজস্ক্রিয় করে না। তবে খাবার গরম করার পদ্ধতি, ব্যবহৃত পাত্র এবং সংরক্ষণের নিয়ম ঠিক না হলে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।



১. প্লাস্টিকের পাত্রে গরম করলে রাসায়নিকের ঝুঁকি



ওভেনে খাবার গরম করার সময় সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয় পাত্র নির্বাচনে। সব ধরনের প্লাস্টিকের পাত্র মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী নয়। অনুপযুক্ত প্লাস্টিকের পাত্র গরম হলে সেখান থেকে কিছু রাসায়নিক খাবারে মিশে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই মাইক্রোওয়েভ-নিরাপদ লেখা নেই, এমন প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করাই ভালো।



২. খাবারের পুষ্টিগুণ কমে যেতে পারে?


অনেকে মনে করেন, মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করলে সব পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং রান্নার সময়ের দৈর্ঘ্য এবং পানির পরিমাণের ওপর পুষ্টি ধরে রাখার বিষয়টি নির্ভর করে। দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপে রান্না করলে কিছু তাপসংবেদনশীল ভিটামিন, বিশেষ করে ভিটামিন সি ও কিছু বি ভিটামিন কমে যেতে পারে। তবে অল্প সময় ও কম পানিতে মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করলে অনেক ক্ষেত্রে পুষ্টি ভালোভাবেই বজায় থাকে।



৩. খাবার অসমভাবে গরম হলে ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি


মাইক্রোওয়েভে অনেক সময় খাবারের এক অংশ গরম হলেও অন্য অংশ ঠান্ডা থেকে যায়। ফলে খাবারের ভেতরে থাকা ক্ষতিকর জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস নাও হতে পারে। বিশেষ করে মাংস, মাছ, ডিম ও আগের দিনের রান্না করা খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। খাবার গরম করার সময় মাঝখানে নেড়ে দেওয়া এবং সব অংশ সমানভাবে গরম হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



৪. বারবার গরম করা খাবারে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি


রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে দিলে তাতে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। পরে ওভেনে গরম করলেও কিছু ব্যাকটেরিয়ার তৈরি বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট নাও হতে পারে। আবার একই খাবার বারবার ঠান্ডা ও গরম করার ফলে খাবারের নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই যতটুকু খাবার প্রয়োজন, ততটুকুই গরম করা ভালো।



৫. অতিরিক্ত গরম খাবারে মুখ ও গলার ক্ষতি


মাইক্রোওয়েভে খাবারের কিছু অংশ খুব বেশি গরম হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে তরল খাবার, স্যুপ বা দুধ গরম করার পর ভালোভাবে নাড়াচাড়া না করলে কোথাও বেশি তাপ জমে থাকতে পারে। এমন খাবার সরাসরি খেলে মুখ, জিহ্বা ও গলায় পোড়া লাগতে পারে। তাই গরম করার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।



৬. ভুল পাত্রে খাবার গরম করলে বিপদ


ধাতব পাত্র বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল সাধারণ মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে মাইক্রোওয়েভ-নিরাপদ কাচ বা সিরামিকের পাত্র খাবার গরম করার জন্য ভালো বিকল্প।



তাহলে কীভাবে নিরাপদে ওভেনে খাবার গরম করবেন?



- মাইক্রোওয়েভ-নিরাপদ কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।

- খাবার গরম করার সময় ঢাকনা ব্যবহার করুন, তবে বাষ্প বের হওয়ার ব্যবস্থা রাখুন।

- মাঝখানে খাবার নেড়ে দিন, যাতে সব অংশ সমানভাবে গরম হয়।

- ফ্রিজে রাখা খাবার ভালোভাবে গরম করুন। সম্ভব হলে খাবারের ভেতরের তাপমাত্রা ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।

- রান্না করা খাবার দুই ঘণ্টার বেশি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফেলে রাখবেন না। অতিরিক্ত গরম পরিবেশে এই সময়সীমা এক ঘণ্টা।

- খাবার বারবার গরম ও ঠান্ডা করা এড়িয়ে চলুন।



ক্যানসারের ঝুঁকি কি বাড়ে?


মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকে নির্গত মাইক্রোওয়েভ হলো নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ। এটি এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো নয়। সঠিকভাবে কাজ করা ওভেনে নির্ধারিত নিয়ম মেনে খাবার গরম করলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দরজা বা সিলযুক্ত ওভেন ব্যবহার করা উচিত নয়।




মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করলেই তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং ভুল পাত্র ব্যবহার, খাবার যথেষ্ট গরম না করা এবং রান্না করা খাবার ভুলভাবে সংরক্ষণ করাই বড় ঝুঁকি। সচেতনভাবে ওভেন ব্যবহার করলে সহজেই নিরাপদে খাবার গরম করে খাওয়া সম্ভব।



তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

sidebar ad