ফ্রিজে রাখা খাবার কী সত্যিই কিডনি নষ্ট করে? জানুন বিজ্ঞান কী বলছে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ফ্রিজে রাখা আগের দিনের খাবার খেলেই কিডনি নষ্ট হয়ে যায়—এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। কেউ বলেন, ঠান্ডা খাবার কিডনির ক্ষতি করে, কেউ আবার মনে করেন, বারবার গরম করা খাবার শরীরে বিষ তৈরি করে। কিন্তু এসব ধারণার কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? কিডনির সুস্থতা রক্ষায় আসলে কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ?


আধুনিক জীবনে ফ্রিজ যেন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। ব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে বেশি খাবার রান্না করে রাখা, আগের দিনের তরকারি খাওয়া কিংবা ফ্রিজে সংরক্ষিত খাবার গরম করে পরিবেশন করা—এসবই পরিচিত অভ্যাস। অথচ ফ্রিজে রাখা খাবার নিয়ে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।


এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাবার ফ্রিজে রাখা এবং খাবার অনিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা এক বিষয় নয়। শুধু ফ্রিজে রাখার কারণে খাবার কিডনির জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়, এমন প্রমাণ নেই। তবে সংরক্ষণের ভুল পদ্ধতি, খাবারে অতিরিক্ত লবণ এবং দূষিত খাবার গ্রহণের মতো বিষয় স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।


ফ্রিজে রাখা খাবার কি কিডনির ক্ষতি করে?- এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো, সাধারণভাবে না।


যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের সবচেয়ে পরিচিত দুটি কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। এসব অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে কিডনির রক্তনালি ও রক্ত পরিশোধনকারী সূক্ষ্ম কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


এ ছাড়া কিছু রোগ, সংক্রমণ, বংশগত সমস্যা এবং কিডনির জন্য ক্ষতিকর কিছু ওষুধও কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।


কিন্তু ফ্রিজে সংরক্ষিত খাবার খাওয়াকে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের স্বীকৃত প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, খাবারটি যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকলে শুধু আগের দিনের বলে সেটিকে কিডনির জন্য ক্ষতিকর ভাবার কারণ নেই।


তাহলে সংরক্ষিত খাবার নিয়ে উদ্বেগ কেন?


উদ্বেগের কারণ ফ্রিজ নিজে নয়; বরং খাবারের নিরাপত্তা, সংরক্ষণের সময়সীমা এবং খাবারের পুষ্টিগুণ। রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফেলে রাখলে তাতে ক্ষতিকর জীবাণু বৃদ্ধি পেতে পারে। পরে ফ্রিজে রাখলেও আগে তৈরি হওয়া সব ধরনের জীবাণু বা তাদের উৎপন্ন বিষ দূর হয়ে যায় না। ফলে ভুলভাবে সংরক্ষিত খাবার খেলে খাদ্যবাহিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।


মারাত্মক বমি ও ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে গেলে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। গুরুতর পানিশূন্যতা কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে আকস্মিক কিডনি আঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ফ্রিজে রাখা খাবার খেলেই এমন ক্ষতি হবে।


যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিদর্শন বিভাগ রান্না করা খাবার দ্রুত ঠান্ডা করে নিরাপদ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।


অতিরিক্ত লবণই হতে পারে বড় উদ্বেগের কারণ


কিডনির স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে খাবারে লবণের পরিমাণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনির রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফ্রিজে রাখা খাবার মানেই বেশি লবণযুক্ত খাবার নয়। ঘরে রান্না করা ডাল, সবজি, মাছ বা মাংস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করলে সেগুলোও সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে।


অন্যদিকে, কিছু প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে। তাই খাবারটি ফ্রিজে রাখা হয়েছে কি না, তার চেয়ে খাবারে কতটা লবণ রয়েছে এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কেমন—এসব বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।


বারবার গরম করা খাবার কি ক্ষতিকর?


খাবার বারবার গরম করা নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে—খাবার গরম করার সংখ্যা এবং খাবারটি কতটা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা এক বিষয় নয়।


সঠিকভাবে রান্না করা খাবার দ্রুত ফ্রিজে রেখে প্রয়োজনমতো ভালোভাবে গরম করে খাওয়া সাধারণত নিরাপদ। কিন্তু রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে দেওয়া, বারবার ঠান্ডা-গরমের মধ্যে রাখা কিংবা খাবারের সব অংশ যথেষ্ট গরম না করা জীবাণুজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


USDA-FSIS-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, রান্না করা অবশিষ্ট খাবার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা উচিত। সাধারণভাবে অবশিষ্ট খাবার তিন থেকে চার দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলা নিরাপদ পদ্ধতি। আবার গরম করার সময় খাবারের ভেতরের তাপমাত্রা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানো উচিত।


খাবারের গন্ধ বা চেহারা স্বাভাবিক থাকলেই সেটি নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা নেই। সংরক্ষণের সময়সীমা অতিক্রম করলে বা নিরাপদভাবে রাখা হয়েছে কি না সন্দেহ থাকলে খাবারটি ফেলে দেওয়াই ভালো।


কিডনি সুস্থ রাখতে কী করবেন?


কিডনি ভালো রাখার জন্য ফ্রিজে রাখা খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি কার্যকর।


রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ।


ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন: রক্তে দীর্ঘদিন শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


লবণ কম খান: অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এড়িয়ে চলুন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের লেবেল দেখুন।


খাবার নিরাপদে সংরক্ষণ করুন: রান্না করা খাবার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখুন। পরিবেশের তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে এক ঘণ্টার মধ্যেই সংরক্ষণ করুন।


প্রয়োজনমতো পানি পান করুন: শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করুন। তবে কিডনি রোগে তরল গ্রহণ সীমিত করার নির্দেশ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।


নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না: কিছু ব্যথানাশক ওষুধ অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। নিয়মিত ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


ফ্রিজে রাখা খাবার নিয়ে ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। খাবার ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করা খাদ্যনিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে সংরক্ষণের নিয়ম না মানলে খাবার অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, অতিরিক্ত লবণ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত ঝুঁকি।


তাই ‘ফ্রিজে রাখা খাবার খেলেই কিডনি নষ্ট হয়’—এমন প্রচারণায় আতঙ্কিত না হয়ে খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন, সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। কিডনির সুস্থতা রক্ষার জন্য ভয়ভিত্তিক ধারণা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান ভরসা।

sidebar ad